Home / মনের জানালা / মুক্তিযুদ্ধের ছোটগল্প: রক্তস্নাত চিতই পিঠা

মুক্তিযুদ্ধের ছোটগল্প: রক্তস্নাত চিতই পিঠা

Bangladesh-genocideউৎসর্গ: ৭১ এর সকল মুক্তিযোদ্ধাদের মায়েদের যারা সূর্যসন্তান জন্ম দিয়েছেন।

দুপুর বেলার ফিকে রোদ। আকাশ জুড়ে ঘন কালো মেঘ। মেঘের ফাকেঁ এক চিলতে অচেনা সূর্য যেন আবছায়া কালো পর্দা সরিয়ে রহস্যময় চোখে পৃথিবীর উপহাস দেখছে। ক্ষনে ক্ষনে মেঘের গুড়ঁ গুড়ঁ শব্দ। দুরের কোন এক বুনো গাছ থেকে একটি ঘুঘু পাখির ডাক শুনা যাচ্ছে। ঘুঘুর ডাকটি অচেনা ভয়ধরানো আর্তচিৎকারের মত মনে হচ্ছে নরেনের মায়ের কাছে। সব ভালোলাগার উপাদানগুলোই এখন বিষাদের পিচ্ছিল ছায়ায় ঢেকে যায় তার কাছে। যুদ্ধের দামামায় পুরুষশূন্য এই গ্রামে নরকের ক্লিষ্টতা ভোগ করছে এখন সে প্রতিটা মুহূর্ত।

নরেনের বাপ চার মাস আগেই উত্তরপাড়ার কমান্ডো মুক্তিবাহিনীর সাথে যুদ্ধে গেছে। ক’সপ্তাহ আগে একমাত্র ছেলেটাও মাকে লুকিয়ে বন্ধুদের সাথে চলে গিযেছে মুক্তিযুদ্ধে। পরে গবীনবাবুর ছেলে নাগেশকে দিয়ে তার যাওয়ার খবর পাঠিয়েছে নরেন। যে ছেলে রাতের বেলা শেয়ালের করুন সুর শুনলে ভয়ে কুকড়েঁ উঠত সেও তার বুকটি ফাকাঁ করে মুক্তিযুদ্ধে চলে গিয়েছে। প্রবল ইচ্ছা শক্তির কাছে সকল ভয় পরাজিত হয়। নরেনের মায়ের চোখ ভিজে আসে। চারপাশ ঝাপসা দেখে সে। মাথা ঝিমঝিম করে। ছেলেটি যাবার কিছুদিন আগে টিউশানির জমানো টাকা থেকে একটি টকটকে লাল শাড়ি কিনে দিয়েছিল তাকে। নরেনের মা এখন এই শাড়িই পড়ে থাকেন সারাক্ষন। ছেলে যখন বাড়ি ফিরবে তখন তার দাগ লাগানো শাড়ি দেখে মন খারাপ করতে পারে ভেবে সে খুব যত্ন করে ব্যবহার করে এই শাড়ি।

একটা খুব ভাল কাজ করেছে নরেনের মা। লালপাড়ার মাষ্টারমশাইয়ের কথামতো তার সদ্য বেড়ে উঠা মেয়েটিকে মধুবাবুর পরিবারের সাথে বর্ডারের দিকে পাঠিয়ে দিয়েছে। যার জন্য এখন চিন্তামুক্ত থাকতে পারছে। মেয়েটি এখন কেমন আছে কে জানে? ঘরে শুধু সে আর বুড়িমা। বুড়ি কানে প্রায় শুনেই না, চোখেও আবছা দেখে এখন। সবসময় লাঠি ভর দিতে হাটতে হয় তাকে।

বুড়ি স্বরভগ্ন গলায় চেচাঁতে লাগল, “কই গো নরেনের মা, আইজ পিঠা খামু, চিতই পিঠা বানা, বড্ড খেতে ইচ্ছে করতাছে চিতই পিঠা, অনেকদিন খাইনা।”

নরেনের মা জানে, বুড়ির খুব প্রিয় খাবার এই চিতই পিঠা। নরেনের বাপ বাড়িতে থাকতে প্রায়ই চিতই পিঠা বানাতে বলত তাকে। নিজে খেত না, মাকে খাওয়ানোর জন্য বানাতে বলত।

বুড়ি সকাল থেকেই যেভাবে চেচাঁনো আরম্ভ করেছে তাতে আজ আর নিস্তার নেই। নরেনের মা চুলা বসাতে লাগল। ঘরের চালে অনেকক্ষন থেকে একটি কালো শকুন ঘাপটি মেরে বসে আছে। কয়েকবার তাড়ানোর চেষ্টা করেও পারেনি নরেনের মা। যুদ্ধে মৃত লাশের গন্ধে সব শকুনেরা মানুষপাড়ায় ভীড় জমিয়েছে বোধ হয়, ফেলনা উচ্ছিষ্ট খাবারের লোভে। মিলিটারীর ভয়ে বাজারেও যেতে পারছে না কয়েকদিন ধরে নরেনের মা। ঘরের খাবারও প্রায় শেষ হওয়ার পথে সব।

বুড়ি চেঁচাতে চেঁচাতে ক্লান্ত হয়ে বারান্দায় বিছানো পাটিতে খালি পেটেই শুয়ে পড়েছে কখন কে জানে! নরেনের মা পিঠা বানানো শেষ করে নিয়ে এসেছে প্রায়। হঠাৎ শক্ত বুটের শব্দে তার বুকটা কেঁপে উঠতে লাগল।

“চাচী কি বাড়ি আছ? চাচী”

নরেনের মা তাকিয়ে দেখল মাওলানা বাড়ির ছেলে ছালিক মোল্লা, সাথে কয়েকজন মিলিটারি। ছালিক মোল্লা নরেনের ছোটবেলার খেলার সাথী। একবার বর্ষাকালে খেলতে গিয়ে পা ভেঙ্গে ফেলায় নরেন তাকে কোলে করে নিয়ে আনার পর সে কলমী গাছের পাতা দিয়ে রস বানিয়ে পায়ের কাটাক্ষতে লাগিয়ে দিয়েছিল। সেই কাটা দাগটি এখনও দেখতে পাচ্ছে নরেনের মা।

“নরেন কোথায়, চাচী?”
“জানিনা বাবা, কি দরকার তাকে?”
“না, কিছু কাজ ছিল, সে শুনলাম নবীনদের কমিটিতে নাম লিখিয়েছে? শিউলি কোথায়, ঘরে?”

“জানিনা, বাবা। – শিউলি তো কয়েকদিন হল ওর দাদারবাড়ি গেল।”

তখন মিলিটারির কমান্ডার ভাঙ্গা বাংলায় কর্কশ গলায় বলল, “আপকা ছাওয়ালকে জিন্দা পেতে চাইলে বলে দে, ও কোথায়?” ছালিকও গলা মিলিয়ে বলল, “চাচী বলে দাও, সে কোথায় এখন? বলে দিলে ওরা কিছু করবে না”

নরেনের মা গম্ভীর হয়ে থাকল কিছুক্ষন। তার শিরদাঁড়া দিয়ে বেয়ে নামা ভয়ের শীতল স্রোতটি এখন তীব্র ক্রোধের অগ্নিশিখায় রুপান্তরিত হয়েছে। সে ছালিকের চোখের দিকে অগ্নিঝরা দুষ্টিতে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষন। তীব্র ঘৃনায় জমা একদলা থুথু সজোরে ছুড়ে ফেলল সে ছালিকের মুখের দিকে লক্ষ্য করে। নরেনের মায়ের গা থরথর করে কাপঁতে লাগল তখন ক্রোধের আগুনে। ছালিক মোল্লা হাত দিয়ে থুথু মুছে রক্তিম চোখে কমান্ডারকে কিছু ইশারা করল। কমান্ডার তখন মধ্যবয়স্কা নরেনের মাকে টেনে হিচঁড়ে ঘরে নিয়ে দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে দিল। ভেতর থেকে নরেনের মায়ের আর্তচিৎকার আর কমান্ডারের শিৎকার একাকার হয়ে গেল। ছেলের দেয়া শাড়িটা টেনে হিচড়ে ছিড়ে ফেলা হল। দুরের কোন এক গাছ থেকে ভেসে আসা আবারও একটি ঘুঘু পাখির আর্তচিৎকার শুনা গেল। কোন এক অগ্যাত কারনে অচেনা সুরে একনাগাড়ে ডেকে যাচ্ছে পাখিটি।

ভেতর থেকে নরেনের মায়ের চিৎকার শুনে বুড়ির ঘুম ভাঙ্গল। বুড়িমা হাতড়িয়ে হাতড়িয়ে চশমাটি পড়ে হাতের লাটিটি খুঁজতে লাগল।
“ও, নরেনের মা, নরেনের মা, পিঠা হয়েছে নাকি গো? দাও দেখিনি, খিদা লেগেছে জব্বর।”

নরেনের মায়ের কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে বুড়িমা খুড়িয়ে খুড়িয়ে নিজেই চুলার দিকে যেতে লাগল। পরে নিজেই চুলার উনুনে রাখা পিঠাগুলো ছোট থালায় তুলে নিল। হঠাৎ ঘরের ভেতর থেকে গুলির শব্দে এক ঝাঁক কাক আকাশের পানে উড়ে গেল।

শব্দ শুনে চারিদিকে তাকাতে গিয়ে ছালিককে চোখে পড়ল বুড়িমার।

“কে? ছালিক বাছা, বল দেখিনি কিসের শব্দ হল ক্ষন?”
“না, বুড়িমা, ও কিছু না, শান্তিবাবুর ঘরের চালে ডাব পড়েছে মনে হয়”
“ও, নে বাবা, কয়েকটা পিঠা মুখে দে। অনেকদিন পর আইলি তুই।”

বুড়ি খুড়িয়ে খুড়িয়ে হেটে গিয়ে একটি ভাঙ্গা চেয়ার নিয়ে আসল ছালিককে বসানোর জন্য। এমন সময় ঘর্মাক্ত কমান্ডার ঘরের দরজা খুলে শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে বের হতে লাগল। বুড়ি তখন মিলিটারিকে দেখার পর ঘটনা কিছুটা আঁচ করতে পেরে তীব্র স্বরে চেঁচিয়ে উঠল। পরক্ষনে দূর্বল হাতের নরম লাটিটি দিয়ে মিলিটারিকে মারতে উদ্যত হল বুড়ি। তখন কমান্ডার একজন মিলিটারির কাছ থেকে একটি বন্দুক নিয়ে ছালিকের হাতে দিয়ে কিছু ইশারা করে ছালিককে বলল, “আপকা প্রশিক্ষন জরুরত হেয়।”

ছালিক মোল্লা তখন ইশারাটা আন্দাজ করতে পেরে বন্দুকটি হতের মুঠিতে শক্ত করে ধরে রাখল কিছুক্ষন। বুড়ি যখন কমান্ডারের গায়ে লাটিটি দিয়ে অনবরত আঘাত করতে শুরু করল, ছালিক মোল্লা তখন হাতের বন্দুকটির বেয়নেট দিয়ে বুড়িমার পিঠে সজোরে প্রবেশ করিয়ে দিল। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে পড়তে লাগল বুড়ির কোচকানো অশীতিপর পিঠ থেকে। বুড়ির দেহ কমান্ডারের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ল। ধাক্কা লেগে ভাঙ্গা চেয়ারের উপরে থাকা পিঠার থালাটি উপচে পড়ল বুড়িমার মুখের উপর। বুড়িমার রক্তস্নাত দেহের উপর পড়ে থাকল কয়েকটি সাদা চিতই পিঠার টুকরো। ধীরে ধীরে বুড়ির দেহ নিস্তেজ হয়ে পড়ল। আকাশ তখন কালো মেঘে ছেয়ে গেছে। অন্ধকার হয়ে এসেছে চারিদিক প্রায়। আচমকা ঝুম বৃষ্টি আসল। গোধুলির ম্লান আলোয় চকচক করছে বুষ্টির ফোটা। আকাশ যেন তার তার তীব্র ক্রোধের বহ্নিচ্ছটা বৃষ্টির পানির মধ্য দিয়ে উগড়ে ফেলছে। বৃষ্টির করুনধারার জলে রক্তস্নাত মাটি যেন আকাশের দিকে টকটকে লালচে চোখ দিয়ে প্রবল আক্রোশ নিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

ঘরের চালে অনেকক্ষন ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকা কালো শকুনটি সুযোগ পেয়ে ছোঁ মেরে রক্তলাল একটি চিতই নিয়ে উড়ে চলে গেল আকাশের দুর সীমানায়। পিছনে পড়ে থাকল শুধূ কিছু নীরেট হাহাকার ও রক্তস্নাত বেদনা।(রিপন কুমার দে)

About nilpori

Check Also

ভাত, কাপড়, ভালবাসা

( ভুমিকায় বলে নেই, গল্পের বক্তা চরিত্রটির মত আমিও নারীবাদি নই।আমি মানি নিয়তি নারী পুরুষ …