Home / মনের জানালা / ভাত, কাপড়, ভালবাসা

ভাত, কাপড়, ভালবাসা

Love-paintings( ভুমিকায় বলে নেই, গল্পের বক্তা চরিত্রটির মত আমিও নারীবাদি নই।আমি মানি নিয়তি নারী পুরুষ সবাইকে নিয়ে খেলে।তবে সবল দূর্বলকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে পদদলিত করছে এবং করে এটা কিন্তু সত্য।এখানে গল্পের এবং চরিত্রের প্রয়োজনে কিছু কথা হয়ত এসে থাকবে তা  পুরুষ জাতিকে হাইলাইট করতে নয়। 😀 ।আর বানানের জন্য আগেই মাফ চাই।সময় খুব কম ছিল আসলেই, এটা পোষ্ট না করে আর একটা ধরতে পারছি না বলে বানান নজরে না নিলে কৃতজ্ঞ থাকব।)
কতদিন পর একসাথে বসে চা খাচ্ছি রে!তোর মনে আছে? কলেজের ছোট ছোট কাপগুলোর চা কত দ্রুত শেষ হয়ে যেত। আমরা লাষ্ট ড্রপটাও ইনজয় করতাম।

-হুম। প্রায় তিন বছর। উফ তুই দেখি এখনো শব্দ করে চা খাস! গড়্গড় শব্দ করছিস শালী তুই চ্যাঞ্জ হলি না।

-আরে ধুর!চ্যাঞ্জ হইনি কে বলল? কিছু অভ্যাস কিছু পুরোনো মানুষের সামনেই ঘর ফিরতি পাখির মত ফিরে আসে মাঝে মাঝে।

-লেখিকা নাকি আমি? আমি অবাক হয়ে তাকালাম ডালিয়ার দিকে

ডালিয়া কাধ ঝাকিয়ে বলল,

-দোস্ত আমিও লেখিকা তবে কাগজে কলমে না মন লেখিকা। ভাবনাগুলো মাঝে মাঝে খুব সুন্দর শব্দে আসে রে। লিখতে পারি না তবে এডমায়ারদের সাথে থুক্কু ফ্রেন্ডদের সাথে শেয়ার করি।

-আরে! ভালো কথা মনে করিয়ে দিলি। তোর সাথে এই ব্যাপারে বিরাট প্যাচাল আছে। তোর নামে কি সব কানে আসে।প্যাচালটা শুরু করব কিনা?শুরু করলে সন্ধ্যে হয়ে যাবে।

আমি আকাশের দিকে তাকালাম। নীল রঙ্গটার জ়োড় একটু কমে গেছে তার সাথে ধুসর রঙ মিশে যাচ্ছে। ডালিয়ে আমার হাত থেকে কাপটা নিয়ে তাতে আবার চা দিল। সে মুচকি মুচকি হেসে বলল,

-কি কানে আসে? আর সন্ধ্যা হচ্ছে তো কি? তুই গাড়ি নিয়ে এসেছিস না? নাকি ভদ্রলোক রাত করা, বান্ধবীদের সাথে গপানো লাইক করেন না।

আমি হাসলাম কিছু বললাম না। চৈত্র মাসের প্রথম দিকের বিকেল, বাতাসে পাগলাটে ভাব প্রবল। লেকের কিছু কাছে হওয়ায় হয়ত বাতাসটা একটু বেশি আরামের লাগছে। এমন দিনকে বলে বাতাসের দিন। এমন দিনে বারান্দায় হাতে চায়ের কাপ পাশে পুরোনো বন্ধু চমৎকার অনুভূতি খেলা করল মনে। কবি রুদ্রের দু লাইন মুখ দিয়ে আপনা আপনি বেড়িয়ে এল,

“পাগলা ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসেছে বাতাস, এমন বিকেল আহা!”

-হুম।এমনি বাতাস আজ। পিউ তোর আগের সেই হাসিটা আছে রে।

-দুই বছরকেই এভাবে আগের খেতাব দিয়ে দিচ্ছিস কেন রে!ওহ বেবী তুই মনে হয় আফটার মেরেজ মিন করছিস। সে ক্ষেত্রে হাসিটাকে আরো মডারেট করেছি আর আমি এর একটা নাম ও দিয়েছি।

-যেমন?ডালিয়ার চোখে কৌতুহল,কৌতুক ঝিকমিক করছে।

-এর নাম হল ভারচুয়াল হাসি। এক দুই বছর ধরে খেয়াল করলাম আমার হাসিটায় আমি যা বোঝাতে চাই তা নেট স্মাইলিতে অলরেডি আছে। কোলন ব্রাকেট ক্লোজ, মানে নরমাল স্মাইলিটা বুচ্ছিস? এই হাসি দেখে দেখে আমি আমার হাসিটা আরো মডারেট করেছি। বিয়ের পর এখন এই হাসিটা অনেক কাজে দিচ্ছে রে। শশুরবাড়ির মানুষের সাথে বলতে না চাওয়া ব্যাপারগুলোতে শুধু একটা হাসি দিয়ে কাজ সেরে ফেলি, যে যেভাবে নেয়। আন্ড ইট ওয়ার্ক্স গুড টু।

ডালিয়া আমার পিঠে হাল্কা চাপড় দিয়ে উচ্চস্বরে হেসে উঠল।

-আফা আন্নের গরে ফুন বাজে।

বুয়ার কথায় ডালিয়া উঠে ভেতরে গেল। কতদিন পর ডালিয়াকে দেখছি। মাষ্টার্স শেষ করার আগেই শ্যামলকে ডালিয়া বিয়ে করে ফেলল। কলেজে অনিয়মিত হয়ে গেল। বিয়ের সাথেসাথে বাচ্চা চলে আসায় ও ব্যস্ত হয়ে যায় পরীক্ষাটা আর দিতে পারে না। পরীক্ষার এক বছর পর আমার বিয়ে ঠিক হয়। ফোনে আসব বলেও ও আসে না। আমি অনেকটা রাগ করেই যোগাযোগ করি কম। তারপর প্রায় বছর দেড়েক ফোনের যোগাযোগটাও হারিয়ে যায়। হঠাৎ কিছুদিন আগে ফেসবুকে আবার কথা হয়, বন্ধুত্ব্বের উত্তাপে জলন্ত মোমের মত গলে যায় আমার সব রাগ।পরে আরো অবাক হলাম এই জেনে যে আমরা একি শহরে আছি।

তিনটি বছর আর কতগুলো গুরুত্বপূর্ন ঘটনা মাঝখানে ঘটে গেলো কিন্তু এখন মনে হচ্ছে মাঝখানে কেটে যাওয়া আমাদের জীবনের এই তিনটি বছর বিন্দুর মত ক্ষুদ্র যেন কিছু মূহুর্ত।কলেজে আমাকে বন্ধুরা খুব বেশি ভালবাসত বলেই বোধ হয় কখনোই অভাবটা বুঝিনি তখন বরং বার বার একলা হতে চেয়েছি। কিন্তু বিয়ের পর এই সংসারী চোখে আজ অনেকদিন পর একজন বন্ধুকে কাছে পেয়ে একটা স্বার্থহীন নির্মল সম্পর্ক আবার অন্য আলোতে দেখলাম যেন। এই বিশুদ্ধ সম্পর্কটা যে কত দুর্মূল্য তা সংসার নামক মোহময় কৃষ্ঞগহ্বরের বাসিন্দা মাত্রই ভালো জানেন ।

২।

ডালিয়া বারান্দায় ফিরতে ফিরতেই আমি তাকে আবার দেখি।হাল্কা মুটিয়ে গেছে তবে ভালোই লাগছে।ওর নামে এখন বাতাসে অনেক কথা ভাসে, ব্যাপারটা আমার বিশ্বাস হয়না।এই ব্যাপারে কথা বলব বলে এসেও কিছু বলতে পারছি না। ঝামেলার কথাগুলো এড়িয়ে চলা আমার স্বভাব হয়ে গেছে ইদানিং। ডালিয়া যেন আমার মন পড়তে পারে,

-কিরে?কি দেখছিস?আমি মোটা হয়ে গেছি?

-হুম।বাট লুকিং গুড। ছুটা প্রেম করিস না তো আবার?

-ছুটা বুয়া শব্দটা জানি। ছুটা প্রেম আবার কি রে হারামজাদী।

-আই মিন পরকীয়া।

-পরকীয়া শব্দটার অর্থ ব্যাপক। ক্ষুদ্রার্থে ধরতে পারিস। সফট্ ড্রিংকস টাইপ।হা। হা!

ওর পানসে স্বীকারোক্তিতেই আমি শিউরে উঠি । নষ্ট মনের পোড়া কটু গন্ধ পাই। কোনপ্রকারেই আমার রাগ হয় না খুব মায়া লাগে খুব কাছের এই বান্ধবীটির জন্য। তবে কথার আর চেহারার অভিব্যক্তিতে আমি যথাসম্ভভ সহজ থাকার চেষ্টা করি।

-দোস্ত যাস না। তোর ল্যাম্বটাকে কল কর, বল লেট করবি তোকে না হয় পিক করে নিয়ে যাবে। ডালিয়া অনুরোধের স্বরে বলে।

-অন্যেরটাকে ল্যাম্বই মনে হয় রে। টাইগারের দেশে ল্যাম্ব আছে নাকি? আসলে কেউ ল্যাম্ব নয়। আমি আইয়ুব বাচ্চুর আসলে কেউ সুখি নয় গানটির সুরে গেয়ে উঠলাম। ডালিয়া শরীর দুলিয়ে হাসছে।

-হা! হা! খুব ঠিক কথা।লেখালেখি কেমন চলছে?

-ভালো। ব্যস্ত ,বড় চাকুরে, সেলফ মেড ম্যান টাঈপ স্বামী লেখিকাদের জন্য বিশেষ ভালো। তারা গ্যাদারিং কম করে, ফালতু ইমোশান ঝগড়াঝাটির মধ্যে নেই। আর আমাদের জন্য মন খারাপ টুকটাক হলে তা আরো ডেলিসাছ ঐ সময় ভালো লেখা আসে বুচ্ছিস। লুক আই এম ফিলিং লাকি।

ডালিয়া আমার দিকে বেশ অর্থপূর্ন ভাবে তাকাল। আমি দাঁত দেখিয়ে একটা বিরাট সাইজের হাসি দিলাম। হাল্কা ভাবে বললাম,

-সি আই এম শোইং ইউ কোলন ক্যাপ্সলক ডি। এভাবে তাকানোর কিছু নেই। আই এম হ্যাপি ম্যান।

ডালিয়া তার তাকানোর ভঙ্গী পাল্টাল।আমি মনে মনে বললাম ‘এইতো গুড গার্ল’।

-তুই প্লিজ খেয়ে যাবি। তোর সাথে কথা আছে। তোর হাসবেন্ড কখন আসবে?

-দশটা সাড়ে দশটা।

-তবে তাকে এখানেই আসতে বল তোকে নিয়ে যাবে। আমি রান্না করছি।

-আরে নাহ! আজ ওদের অফিসিয়াল ডিনার আছে আমাকেও বলছে যেতে। আমি যাব না যা, গাড়ী ছেড়ে দিচ্ছি, মাজহারকে বলব ফেরার পথে আমাকে নিয়ে যাবে।

-ওহ দোস্ত ! তোর কথাটারে লাইক মারলাম।

ডালিয়া চোখ টিপে দুষ্টুমি ভরা কন্ঠে বলল। আমি আবার ভারচুয়াল হাসিটা দিলাম। ড্রাইভারকে ফোন করে বললাম মাজহারের অফিসে চলে যেতে। ডালিয়া নাস্তার ট্রেটি তুলে নিয়ে যেতে যেতে বলল,

-বিকেল পড়ে গেছে। থাইগ্লাসটা টেনে ভেতরে চলে আয়। মশারা কিস করতে চলে আসছে।

আমি ভেতরে চলে এসে থাইগ্লাসটা টেনে দিলাম। ড্রইংরুমটা বেশ সাজানো। দেয়ালে ডালিয়া আর শ্যামলের বড় একটা যুগল ছবি। হঠাৎ করে তোলা ছবি মনে হচ্ছে, তাই ভালবাসার পাশাপাশি বন্ধুত্বটা বেশ ফুটেছে। মনে হল এটা ওদের বিয়ের প্রথম দিকের ছবি। পাশে আদিব কে কোলে নিয়ে ওদের আর একটা ছবি দেখে মনে হলো ছেলেটাকেতো দেখলাম না। আমি ডালিয়াকে অনুসরন করে রান্নাঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়িয়ে বললাম,

-কিরে তোর ছেলে কই?

-আর বলিস না মা সকালে ওকে নিয়ে ভাইয়ার ওখানে গেছে রাতে চলে আসবে।

-খালাম্মা এখানে থাকে নাকি?

-হুম।

আমি আর এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম না কেন ডালিয়ার মা ছেলেরা থাকতে মেয়ের বাসায় থাকেন। পারিবারিক সমস্যার একঘেয়ে ব্যাপারগুলো আলোচোনা করতে ইদানিং ভালো লাগে না। আমি কথা ঘুরাতে বললাম,

-বয়স কত হলো তোর ছেলের?

-আড়াই। পিউ তুই বেড রুমে গিয়ে বোস আমি বুয়াকে একটু বুঝিয়ে দিয়ে এক্ষুনি আসছি।

আমি ডালিয়ার মাষ্টার বেড এ চলে এলাম। পুরো এপার্টমেন্টেটা যেন জোড়াজোড়ি করে শৈ্ল্পিক করা হয়েছে যার অনেক কিছুই আমার কাছে ভালো লাগে নি।তবে শোবার ঘরে ঢোকার পর বেশ শান্তি শান্তি আমেজ পেলাম। বেড রুমের পাশেই লাগোয়া বারান্দায় গোলাপের তীব্র সুবাস আমাকে টেনে নিয়ে গেলো। বেশ কয়েক ধরনের শুধু গোলাপ গাছ।বারান্দাটা লম্বায় তেমন বড় না হলেও পাশে বেশ চওড়া। এটা বাড়ির পেছন দিকের বারান্দা। দোতালা হওয়ায় বাড়ির সিমানার দেয়ালের অপারের ছোট গলিটা খুব কাছ থেকে দেখা যাচ্ছে। গলিটার প্রস্থ খুব কম আর বারান্দাটার বরাবর গলির ওপাশে ঢাকা ওয়াসার একটা বিশাল ট্যাঙ্ক আর তার পাশে বিশাল সাইজের একটা আম গাছ দেখা যাচ্ছে। গাছটা হাল্কা অন্ধকার মেখে নীল হয়ে আছে। মুকুলের গন্ধটা ভীষণ নষ্টালিজিক করে দিচ্ছে। কলেজে বিশাল বিশাল আম গাছ ভরে এই সময় মুকুল আসত, ভর দুপুরে আমাদের ডিপার্টমেন্টে বসে নিরস হিসাব্বিজ্ঞান বুঝতে বুঝতেও মুকুলের গন্ধে আর ভাললাগায় মাখামাখি হয়ে থাকতাম।

-কিরে এখানে তুই! দেখ কারেণ্ট চলে গেলো। ডালিয়া সচেতনভাবে থাইগ্লাসটা টেনে দিতে দিতে কথাটা বলল। আমি জবাব দেওয়ার আগেই ও আবার তাড়া দেয়।

– বলেছিস তোর হাসবেন্ড কে? এক্ষুনি বল।

-ওহ।আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম।ইদানিং জব্বর মন খাউড়া হয়ে গেছিরে দোস্ত। তবে সে কি বলবে তা আগেই আমি তোকে বলতে পারি। চাইলে লাউড স্পীকারে শুনে মিলাতে পারিস।

-মজার তো! বল শুনি।

-প্রথমে বলবে কই তুমি?

-কেন? সে জানে না তুই এখানে আসবি?

-জানে কাল রাতে বলেছি কিন্তু সে এই প্রশ্নটাই করবে। এটা একটা মেকি এংসাইটি। মানে সে ফোনে প্রচুর অন্যমনস্ক থাকেন প্রশ্নের সাথে ভাবের কোন মিল নেই।

-হুম,তারপর। ডালিয়া মুচকি হাসছে।

-তারপর আমি বলব বান্ধবীর বাসায়।

-এবার সে চমকাবে কারন এটা রেগুলার আন্সার না।

সে নড়েচড়ে বসে বলবে কোথায়?তোমার আবার বান্ধবী আছে নাকি!

-মানে?

-মানে তোদের কথা অনেকবার বলেছি কিন্তু তার মনে থাকবে না কারন সে সব কথাই মনোযোগ দিয়ে শুনে কিন্তু বেশির ভাগ কথাই মনে রাখনে না। আর কিছু কিছু আজব ব্যাপার মনে রাখে যা মনে রাখার তেমন কারন নাই। আমি এই ব্যাপারে এক্সপেরিমেন্টও করেছি। একবার একি কথা কিছু দিন বাদে বাদে চারদিন বললাম, চারদিনই সে আঁতকে উঠে বলল, তাই!

-হা !হা!

-সে যাই হোক তারপর সে ঠিকানাটা জানতে চাইবে। এটা মনোযোগ সহকারেই শুনবে। আর বলবে, ‘তাহলে কি তুমি ডিনারে আসবে না’। আমি বলব, ‘না’। সে বেশ অবাক ভাব নিয়ে আবার বলবেন ‘তাই’! আসলে বিস্ময়টাও মেকি। আমি পার্টি এটেন্ড করা পছন্দ করি না সে জানে। আর যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়িও করবে না। ব্যাক্তি স্বাধীনতা কিছু ক্ষেত্রে দারুণ মেনে চলেন।

-হুম

-তারপর আমি বলব আমাকে পিক করে নিয়ে যেতে হবে। সে বলবে ‘ঠিক আছে নিয়ে যাব’। আর অযথা বান্ধবীর সাথে কথা বলার জন্যও কৌতুহলীও হবে না। অভারওল হি ইস আ আইডল হাসবেন্ড।

আমি থেমে মাজহারকে কল করলাম এবং লাউড স্পিকারে ডালিয়াকে তা শোনালাম। মোটামুটি সব মিলে যাচ্ছে দেখে প্রথম দিকে হাসতে হাসতেও শেষের দিকে হঠাৎ ও চুপ হয়ে যায়। আমি পরিবেশ হাল্কা করার জন্য প্রশ্ন করলাম।

-আম গাছে কি খুব বোল এসেছে রে? গন্ধ পাচ্ছি।

-হুম। কিন্তু অসুস্থ বোল।

-মানে?

– অনেকগুলো মুকুলের ছড়া একসাথে ঝট লেগে ফুটবলের সাইজের মত গোল হয়ে আছে মানে মুকুলের কোন স্বাভাবিক ছড়া নেই। সারাটা গাছে যে পরিমাণ মুকুল আসার কথা তা কয়েকটা জায়গায় একসাথে এসে একেবারে জট লেগে থাকে। আম টাম কিছুই হয় না আস্তে আস্তে ঝড়ে যায়। দেখলে কষ্ট লাগে রে। দিনের আলো হলে আরো ভালো দেখতে পারতি।

ও উঠে ভেতর থেকে চট করে টর্চ এনে ধরল গাছটা বরাবর ,আলো পড়ায় আমি অনিচ্ছাসত্বেও তাকিয়ে ফেললাম।আসলেই তাই। আবছা আলোতেও কি বেঢপ দেখা যাচ্ছে!না দেখলেই ভালো হতো প্রতিবন্ধি অল্পায়ু সন্তানের জননীর মত এই দুঃখি গাছটাকে। আমার আর এ ব্যাপারে কিছু শুনতে ইচ্ছা হলো না। আমি বললাম,

-হয়েছে।দেখছি।

আলো নিভে যাওয়ায় হুট করে আবার অনেকটা অন্ধকার ঘিরে ধরল চারপাশ। কথা খুজে পাচ্ছি না হঠাৎ। আকাশে দু একটা তারা ফুটে উঠেছে। তাদের ছাপিয়ে বাদুরগুলোকে চোখে পড়ছে এখন বেশি, যেন বুঝতে পারছে না কি করবে এমন অস্থির ভাবে উড়ছে তারা। কিছুক্ষণ নিরব হয়ে রইলাম দুজন।গলি দিয়ে দু একজন চলতি মানুষের অষ্পষ্ট আলাপ ভেসে আসছে।

-ইদানিং কি লিখছিস রে?নিরবতা যেন জোর করে ভাঙ্গল ডালিয়া।

-একটা জটিল প্রেমের গল্প।

-প্রেম!দূর!প্রেম বলে কিছু আছে নাকি?

-কি বলিস!এত বিখ্যাত প্রেমকাহিনি জন্ম দিয়ে এখন বলছিস প্রেম নেই।!কোলন ক্যাপ্সলক ও, মানে আমি বিস্মিত।

আমার হাল্কা কথায় পরিবেশ হাল্কা হলো না। ডালিয়া চুপচাপ হয়ে গেল। অন্ধকারেও ওর মুখটা ভারী লাগছে।

-কিরে? কি হল?

ডালিয়া জবাব দেয় না।আমি ওর হাতটা ধরে বলি।

-কি হয়েছে আমাকে বল। আচ্ছা তোদের সমস্যা চলছে?

-হুম।

-তুই আমার সাথে শেয়ার করতে চাস আবার নিজ থেকে বলতে পারছিস না?

-হুম।

-ঠিক আছে আমি কয়েকটা প্রশ্ন করছি।তোর নামে যা শোনা যায় তা সত্যি?

-কি শোনা যায়?

-ফেসবুকে লিমার সাথে কথা হল একদিন ও বলল তোকে নাকি ডিফরেন্ট ছেলেদের সাথে দেখা যায়।

-হুম। এতটুকু শুনে থাকলে ঠিক আছে। ডীপ কিছু শুনে থাকলে তা ভুল।

-একটা মেরেড মেয়েকে ডিফ্রেন্ট ছেলেদের সাথে দেখা যায় এর চেয়ে ন্যাস্টি কথা আর কি হতে পারে? । তোর আর শ্যামলের সম্পর্ক খারাপ?

-হুম।

-তাই তুই জেদে কিংবা ডিপ্রেশানে এরকম করিস?

-হুম।

-রামছাগল কোথাকার! আর বন্ধু নামক ধর্মের কোর্তা পড়া মানুষগুলো তোকে খুব স্যাটিস্ফাই করে? আরে বলদ তারাও ফায়দা লুটে। উলু বনে মুক্তা ছড়িয়ে লাভ কি?

-আরে দূর কিসের লাভ। ভালোবাসা এখানে থাকেই না। বেশির ভাগই ফ্রেন্ড আন্ড সেক্স এই দুইটা মিলিয়ে একটা অদ্ভুত সম্পর্কে যেতে চায়। তোর কথা ঠিক তারা ফায়দাই লুটতে চায়। কয়েকদিন যেতেই নিষ্পাপ মুখগুলোতে ইনিয়ে বিনিয়ে প্রেম তারপর সেক্স কাইন্ড কথাই আসে। বাট বিশ্বাস কর দোস্ত দে কান্ট উইন। আমি প্রাইমারি পর্যন্তের পরই হতাশ হয়ে ফিরে আসি। তাই বেশিদিন বন্ধুত্ব থাকেনা।

-তাহলে এত বুঝিস তবে কি সুখ পাস ফালতু বদনাম করে?

-সুখ পাই না। এস্ক্যাপ করি ডিপ্রেসান থেকে।

-তাই তুই এটাকে ডিপ্রেসান থেকে রিলিজ পাওয়ার গেটওয়ে বানিয়েছিস? মানসিক অশান্তিতে থেকে পালানোর আরো কত উপায় আছে। ডালিয়া তুই আসলে এক আবর্জনা থেকে বাচতে অন্য আবর্জনাতেই পা রাখছিস।

-আসলে এস্ক্যাপ ও না।মাঝে মাঝে আমি নিজেও জানি না কেন এসব করি।

-আমি জানি।প্রেম করে বিয়ে করেছিস তো তার উপর অনেক বাধা ছিল।মানসিক চরম উত্তেজনা ছিল। প্রেম হচ্ছে একটা অতিমাত্রায় ঘোরলাগা বা নেশালাগা মানসিক অবস্থা। রক্তের স্বাদ পাওয়া বাঘের মতই কিংবা তুই নেশাখোড় মানুষের মত নেশার জিনিসটাই খুজছিস আসলে। আর তাই এখন ক্ষোভে বলছিস প্রেম বলে কিছু নাই।

ডালিয়া আমার কথা থামিয়ে আমার হাত আরো শক্ত করে ধরে বলল, ঠিক ধরেছিস রে। ঐ সময়টায় পৃথিবীকে, নিজেকে জীবনকে এক অদ্ভুত ডাইমেনশানে দেখেছি । যে একবার তা দেখেছে, অনুভব করেছে, সে মরেছে। বারবার তা দেখার জন্য মন কেমন করবেই। কিন্তু তার জন্য সময় চাই। দাম্পত্য বা সংসারের ব্যস্ততায় এই আকুলুতাটা চাপা পড়ে যাওয়ারই তো কথা। কিন্তু আমি নিজেকে সারাক্ষণ একলা আর অপমানিত বোধ করি যে।

-কিছু কথা বলি মনোযোগ দিয়ে শোন।

– হুম।

-হাজবেন্ডের কাছে একটা মেয়ে কি চায়? ভাত,কাপড়,ভালোবাসা। ঠিক কি না?

-হুম।

-এই ভালোবাসা কে প্রেম নামক বস্তুর সাথে মিলিয়ে ফেললেই গলদ। লাভ কি সেটেল সব ক্ষেত্রেই প্রেমটা ফ্রিজ হয়ে যায় আস্তে আস্তে। সেটা মাঝে মাঝে কিছু উত্তাপে গলে সচল হয় আবার জমে যায়। এই জমা আর গলার খেলাই দাম্পত্য। তবে ভালোবাসাটাই তখন জেগে থাকে। এটা মেনে নে। তোরা যারা প্রেম করে বিয়ে করেছিস সবারই এক প্রবলেম।

-তুই কি মনে করিস আমি এতটা ইডিয়েট।এটা বুঝিনা। আরে বোকা প্রেম খুজার সময় পেতাম কই যদি সংসার, ভবিষৎ, টুকটাক ঝগড়াঝাটি এগুলো নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম।যাকে দাম্পত্য বলে। তুই বললি প্রেম ফ্রিজ হয়ে যায় বাট এখানে প্রেম ভেনিশ। হা হা!আমার জন্য যে মজনুর মত দিওয়ানা ছিল সে এখন নিশি নামক আর এক মেয়ের জন্য পাগল। হ্যা হয়তো আমাকে আদিবকে ভালোবাসে, মায়া আছে। সে চায় না আমরা চলে যাই।আমাদের ইকোনোমিকাল চাহিদার ব্যাপারে কেয়ারিং।কিন্তু যেটা করছি তাকে মোটেও সংসারে বলা যায় না।

-এটা কতদিন হয়?

-এই দেড় বছর। আগে খুব ঝগড়া করতাম কান্নাকাটি করতাম। তাতে শুধু লোক জ়ানাজানি হলো ও আরো দূরে চলে গেছে।প্রায়ই বাসায় আসে না।

-কোথায় যায়?

-জানিনা। কারের ব্যবসা করে তো ,বলে চিটাগং যাবে মাল শিপমেন্ট হবে বিভিন্ন হাবিজাবি । আমি অই প্রসঙ্গে আর কিছু বলি না।

-হোয়াই ডন্ট ইউ থিঙ্ক আবাউট ডিবোর্স?

এবার ডালিয়া বেশ অবাক হয়ে তাকালো। আবছা অন্ধকারেও তার মুখের বিস্মিত আদল বোঝা গেল,

-আমার কিছু পারিবারিক সমস্যা আছে।জানিসই তো আব্বা শেষের দিকে পুরো দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিল। আমার মার্ষ্টার্স কমপ্লিট না করেই বিয়ে, বাচ্চা,। তাছাড়া অনার্সের রেজাল্ট তোদের মত ভালোও না।আর ভাইরা বিয়ের পর এমনিতেই আর অভিভাবক থাকেন না তার উপর কথায় কথায় খোটা দেয়, আমার ক্যারিয়ার আমি নিজে শ্যামলের জন্য নষ্ট করে ফেলেছি, ভুল করলে তার মাশুল দিতেই হয়।তারা কিছু করতে পারবে না ইত্যাদি।

-কথা তো ঠিকই বলে।

-হুম।

আমার কথাটা বোধ হয় একটু লাগে ওর।ডালিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলে,

-কয়েক জায়গায় চাকরীর জন্য তদবীর করেছিলাম। চাকরী এমনিতেই মামা ছাড়া হয় না তার উপর আমার অযোগ্যতা।অযোগ্য মেয়েদের কাছে এই অনাত্মীয় মামারা ফেবার চায় জানিস ই তো। ওইরকম ফেবারের প্রফেশানে যাওয়া এখানে থাকার চেয়ে খারাপ। আসলে যেখানে ভাত কাপড়ের প্রশ্নটাই জোড়ালো সেখানে আত্মসম্মান বলে কিছু থাকেনা। তোর মত বাবার বাড়ির খুটি শক্ত হলে আমি এই বাড়ি অনেক আগেই ছাড়তাম। ঢাকা শহরে ছেলে নিয়ে বাসা ভাড়া দিয়ে খেতে পড়তে যে খরচ লাগবে তা আর্ন করতে আমাকে কি কি করতে হবে বুঝতেই পারছিস। আমার ক্ষেত্রে ডিভোর্স হলে কিছুই হবে না ছেলেটার লাইফ মাঝে স্পয়েল হবে শুধু শুধু।

-হুম। আমার মনটা তেতো হয়ে গেলো।

-তুই জিজ্ঞেস করলি না, কেন ফালতু বদনাম করি?কোন একদিন হয়ত ভুল করে পা দিয়েছিলাম এই অন্ধকার গলিতে এখন অভ্যেস হয়ে। কোথায়ও ডুবি না।মূহুর্তের ভালো লাগায় নিজেকে ভাসিয়ে দিতে চাই। মনে করতে চাই এইতো ভালো আছি। আমি শ্যামলের চিন্তা থেকে সরে আসতে চাই,সরে থাকি। তাদের প্রশংসায়, আমার প্রতি কেয়ারিং আচরনে মুহুর্তের জন্য ভুলে যেতে পারি।ভাবতে পারি আমিও একজন কাঙ্গিত নারী। তবে আমি মানছি এই ভালো লাগাটা নিষিদ্ধ।

-শ্যামল যেটা করেছে সেটা পুরুষের জন্য কিছুটা নেচারাল।খুব কম পুরুষই এই ধরনের সুযোগ পেয়েও নিজেকে ঠিক রাখতে পারে। তুই সেই দুর্ভাগ্যবানদের একজন যার স্বামী খুবই দূর্বল, আর পাকেচক্রে সে সুযোগ পেয়ে গেছে আর তার লোভে জড়িয়ে গেছে। যখন এই সংসার ছাড়তেই পারবি না তবে এটা মেনে নে আর শুদ্ধ কিছুতে নিজেকে ব্যস্ত রাখ। এই ছদ্মবেশি মাকরসাগুলোর কাছে নিজের সময় বিক্রি করিস না আর।

-হুম।

– তুই আসলে ভীষণ অসুস্থ তাই এটা বুঝতে পারছিস না দূর থেকে তোকে কেমন নষ্ট দেখায়। এটা নিশ্চয়ই জানিস নষ্ট মায়ের ছেলে মেয়েরাও নষ্ট হয়।

আমি ইচ্ছে করেই কষ্ট দিয়ে বলি যাতে ও লজ্জা পায়। ডালিয়া আমাকে ধরে হঠাত হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। আমি ওকে কাঁদতে দেই।

অভাব থেকে নষ্ট আর স্বভাব থেকে নষ্ট হওয়াকে আমি আলাদা ভাবেই দেখি। অভাব একটা ভালো মানুষকেও কত দূর্বল করতে পারে কত নোংরা পথে নিতে পারে তার ধারনা আমি আশেপাশে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনাতেই পেয়েছি। কিন্তু খুব কাছের এই মানুষটার বেলায় আমি মানতে পারলাম না। সেই কেন নিয়তির কাছে হেরে নষ্ট পথে আনন্দ খুজবে, এর মানসিক শক্তি এত কম হবে কেন? ইচ্ছে হলো ওকে আরো লজ্জা দিয়ে দিয়ে কথা বলি। কিন্তু শব্দ নিয়ে অহরহ নাড়াচাড়া করা আমি কোন শব্দ পেলাম না।

ভাত কাপড় আর ভালবাসার সঠিক সহাবস্থান অনেক নারীর জীবনেই নাই তবু তারা চুপচাপ সংসার করে যাচ্ছে বেশ কিছু অপারগতার কারনে। আমি নারীবাদী নই।আমি মানি নিয়তি নারী পুরুষ সবাইকে নিয়ে খেলে। নারী জাগরণ শব্দটাকেও আমি অন্য ভাবে দেখি। প্রতিকূন পরিবেশের মধ্যে নিজেকে জাগানোর জন্য পর্যাপ্ত মানসিক শক্তি তিল তিল করে একজন নারী যেখানে হারায়, সেখানে নিয়তি, পরিবেশ, সমাজ, পরিবার এই সবই কিছুটা করে দায়ী। এক্ষেত্রে পুরুষকে আমি আলাদাভাবে দায়ী করিনা।

আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে সবল দূর্বলের নিয়ন্তা প্রকৃতি বা মহান ইশ্বরের খোজ় করলাম।এই খোজটা আমার স্বভাবসুলভ।কিন্তু ডালিয়াকে জ়ড়িয়ে ধরে আজ আমার নিজের খুব ইশ্বর হতে ইচ্ছে হল, ইচ্ছে হল নিয়তির পদতলে দলিত এই অসুস্থ আম গাছটাকে, আমার বুকে কান্নারত ডালিয়ার মত সব নারীকে সবল আর সুস্থ করে দেই।

১৩ইচৈত্র

মোহাম্মদপুর। (রাবেয়া রব্বানি)

About nilpori

Check Also

মুক্তিযুদ্ধের ছোটগল্প: রক্তস্নাত চিতই পিঠা

উৎসর্গ: ৭১ এর সকল মুক্তিযোদ্ধাদের মায়েদের যারা সূর্যসন্তান জন্ম দিয়েছেন। দুপুর বেলার ফিকে রোদ। আকাশ …