Home / মনের জানালা / বেচে থাক ভালোবাসা পর্ব-১

বেচে থাক ভালোবাসা পর্ব-১

beche thak valobasa১।

অ্যাকসিডেন্ট করে তারিনের বাম পা গেলো ভেঙ্গে। তার কিছু দিন পর পুরুষ জাতির উপর ওর সমস্ত বিশ্বাসও ভেঙ্গে গেলো।

বিয়ের বাজার করে ফিরছিল সেদিন। দুদিন পরেই গায়ে হলুদ। আচমকা রিকশার চাকা খুলে একপাশ কাত হয়ে গেলো। হাত ভর্তি প্যাকেট সহ তারিন পড়ল রাস্তায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা লেগুনা চলে গেলো বাম পায়ের উপর দিয়ে। পরদিনই পা টা কেটে ফেলতে হয়। অপারেশন শেষে জ্ঞান ফেরার পর নিজের কাটা পায়ের বেদনা ভুলিয়ে দেয় আরো বড় একটা শোক সংবাদে। পা হারানোর অপরাধে বর পক্ষ বিয়ে ক্যানসেল করে দিয়েছে।

অদ্ভুত লাগে তারিনের। যার সাথে বিয়ে, তার সাথে বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকেই কথা হতো। ভালোই লেগেছিল ছেলেটাকে। কত কথাই না বলত ছেলেটা। ভবিষ্যতের কত পরিকল্পনাই করেছিল দুজনে মিলে। সেই ছেলে কি অবলীলায়ই না তাকে ভুলে গেলো।
কয়েকদিন আগেও যে বাড়িতে উৎসবের রঙে ঝলমলে ছিল, সে বাড়ির লোকেরা আজ হাসতেও ভুলে গেছে। সব কিছুর জন্যে নিজেকেই দোষী মনে হয় তারিনের। শোকে স্তব্ধ হয়ে কাদতেও ভুলে গেছে।
তারিনের শোকে নতুন মাত্রা চড়ায় তার বাবার আচরণ। ভদ্রলোকের আচরণে মনে হচ্ছে অ্যাকসিডেন্ট আর বিয়ে ভাঙ্গা দুটোই তারিনের দোষ। হাসপাতালে কিছু করেননি কিন্তু বাসায় ফেরার পর থেকেই নানাভাবে ঘুরায়ে পেচায়ে তারিনকেই সব বিষয়ে দায়ী করে চলেছেন। এমনকি সুযোগ পেলে সরাসরি খোটা দিতেও ছাড়েন না।

তারিন প্রতিবাদ করে না। শুধু তারিনের মা কাঁদেন। পাঁচটা মেয়ের জন্ম দিয়ে এমনিতেই তিনি সারাক্ষণ তারিনের বাবার কাছে অপরাধবোধে ভোগেন। মেয়েরা আর বাবা যেন চিরশত্রু। তার মাঝখানে দুপক্ষেরই কচকচানিতে জীবনটা তার ফালাফালা হয়ে গেছে। তার উপর বড় মেয়ের বিয়ে না হতেই এতো বড় সর্বনাশ হয়ে গেলো, কান্না ছাড়া কিই বা করার আছে তার।

এরপর থেকেই দুনিয়া এবং পুরুষ জাতি দুটোর প্রতিই চরম বিতৃষ্ণায় মন ভরে গেছে তারিনের। সামর্থ থাকলে দূরে কোথাও পালিয়ে যেত। কিন্তু বিছানা থেকেই তো নামতে পারে না। ভার্সিটি যাওয়া বন্ধ। বান্ধবীরা আগে দেখতে আসতো প্রায়ই। এখন তা ও কমে গেছে একেবারে। নিজের রুম আর বারান্দা এতেই আটকে গেছে জীবন। টিভি রুমে বাবা থাকে বলে সেখানেও যাওয়া হয় না।

সে কারণেই আবার যখন বিয়ের প্রস্তাব এলো, শুধুমাত্র এই দমবন্ধ পরিবেশ থেকে হাপ ছাড়ার জন্যেই তারিন রাজি হয়ে গেলো। ফুটন্ত কড়াই থেকে জলন্ত চুলাতেই ঝাপ দিচ্ছে জানে, তাও সিদ্ধ হওয়ার চেয়ে পুড়ে মরাই কেন যেন শ্রেয় মনে হলো ওর কাছে। অন্তত মায়ের কান্না আর বাবার খোচা তো আর সইতে হবে না।

তারিনকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে জাহিদ। সদ্য পাশ করা এম বি বি এস ডাক্তার। ডাক্তার হিসাবে আরো অনেক কোয়ালিফাইড মেয়ে ও বিয়ে করতে পারত। কিন্তু শুরু থেকেই জাহিদের চিন্তাধারা ছিল ভিন্ন। দেশের সেরা একজন মেধাবী হিসেবে ও চায় ওর সব কাজই হবে অন্যদের জন্য উদাহরণ। একজন প্রতিবন্ধী মেয়েকে জীবনসঙ্গী করে সে তাই একটা দৃষ্টান্ত রাখতে চায়। যা অন্যরা অনুসরন করবে। তাই করুনা করে না, সত্যিকার সদিচ্ছা থেকেই জাহিদ তারিনকে বিয়ে করতে চাচ্ছে। জাহিদের মা শুরুতে গাইগুই করলেও পরে ছেলের জেদের কাছে হার মেনেছেন।

এ কথা জাহিদ তারিনকে বলেছে। কিন্তু তারিনকে স্পর্শ করেনি। আগের ব্যাটাও এরকম অনেক কথা বলেছিল। সে শুধু এই জেলখানা থেকে মুক্তি চায়। জাহিদ তাকে এই কাজে সাহায্য করছে, সে জন্যে সামান্য কৃতজ্ঞতা বোধ করে শুধু। আর কিছুই না।
২।

খুব বেশি না হলেও মোটামুটি ধুমধামের সাথেই বিয়ে হয়ে হয়ে গেল তারিন আর জাহিদের।
এতোদিনে কাঙ্ক্ষিত মুক্তির দিনে কেনো যেন তারিনের বুক ভেঙ্গে কান্না এলো। হুইল চেয়ারে করে তাকে যখন গাড়িতে তুলে দেওয়া হচ্ছিল, যাকে সামনে পাচ্ছিল তাকে ধরেই মরা কান্না কাদল ও।

জাহিদ অবশ্য খুব বিব্রত হল এতে। কেমন যেন অপরাধী লাগছিল নিজেকে। সেই ভাবটা নিয়েই বাসর ঘরে ঢুকল ও। তারিন তখনও ফোপাচ্ছে। পাশে বসে স্বান্তনার স্বরে কিছু বলতে যাবে জাহিদ, তার আগে তারিনই কথা বলে উঠল, ‘দেখুন মাফ করবেন। আমি আপনার সাথে এক বিছানায় থাকতে পারবো না।’

এমন অপ্রত্যাশিত আক্রমণে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো জাহিদ। বলে কি মেয়ে ?

‘কেনো?’
‘কেনো আমি আপনাকে বুঝায় বলব পরে। এখন আমাকে একা থাকতে দিন।’
‘কি বল, বিয়ের দিনেই বৌকে একা রেখে যাওয়া যায় নাকি?’
‘প্লীজ। আমাকে মাফ করুন। আপনার সাথে থাকার মত মানসিক অবস্থায় আমি নেই।’
‘কি করতে বল আমাকে?’
‘আপনি এই রুম থেকে চলে যান, নয়তো আমাকে অন্য রুমে রেখে আসেন।’
‘আরে ঘর ভরা মানুষ। প্রতি রুমে ফ্লোরিং করে থাকা লাগতেসে।’
‘তাহলে আপনিও ফ্লোরে থাকেন প্লীজ। প্রথম দিনে আমার এই অনুরোধটুক রাখেন।’
‘আমি কেনো থাকবো?’
‘মানে?’
‘মানে, এটা আমার ঘর। বিগত প্রায় বিশ বছর ধরে আমি এই বিছানায় ঘুমাই। আর আমারতো তোমার সাথে থাকতে সমস্যা নাই। সমস্যা তোমার, তো তোমারই তো ফ্লোরে থাকা উচিত।’

জাহিদ ভেবেছিল এই কথা শুনে বুঝি তারিন দমে যাবে। কিন্তু হলো উল্টোটা। বলামাত্র তারিন বিছানা থেকে নেমে গেলো। দেয়াল ধরে ধরে জানালার ধারে গিয়ে নিঃশব্দে কাদতে লাগলো। জাহিদের মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো। তারিনকে কষ্ট দিতে চায়নি ও। বাসর রাতে বিড়াল মারা আর হবে না বুঝে চুপচাপ ফ্লোরে বিছানা বানিয়ে শুয়ে পড়ল। মুখে বললেও তারিনকেতো ও আর মেঝেতে শোয়াতে পারে না। ওর খুব ইচ্ছা করছিল তারিনের মাথায় হাত বুলিয়ে স্বান্তনা দিতে। কিন্তু সাহস হলো না। আজ রাত নিয়ে কি কি ভেবে রেখেছিল, আর কি হলো ? সামনেই বা কি আছে কে জানে ? এসব ভাবতে ভাবতেই ও যখন ঘুমিয়ে গেলো, তারিন তখনো জানালার ধারে ফোঁপাচ্ছে।

লিখেছেনঃ – অসীম পিয়াস।

About Kabir Hossain

Check Also

ভাত, কাপড়, ভালবাসা

( ভুমিকায় বলে নেই, গল্পের বক্তা চরিত্রটির মত আমিও নারীবাদি নই।আমি মানি নিয়তি নারী পুরুষ …