Home / দর্শনীয় স্থান / দুর্গাসাগর

দুর্গাসাগর

Durga Sagar lake-41পর্যটকদের জন্য প্রিয় একটি যায়গা দুর্গাসাগর । অবসরে অশান্ত মন কে শান্ত করতে ঘুরে আসতে পারেন দুর্গাসাগর এর মনোরম পরিবেশ থেকে ।
বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে ৮ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে বাবুগঞ্জের মাধবপাশা ইউনিয়ন। সেখানে রয়েছে বদ্বীপ আকৃতির একটি বিশাল দীঘি। নাম তার দুর্গাসাগর। ৭০০ বছরের পুরনো এই দীঘির পরিচয় এখন দেশ ছাড়িয়ে দেশান্তরে। তাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদের সেখানে উপস্থিতির কমতি নেই। মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখতে আসা পর্যটকরা গাছগাছালির ছায়াঘেরা দুর্গাসাগর দেখে মুগ্ধ হন। তারা অবাক বিস্ময়ে দেখেন পাখির সমাহার দীঘির বিশাল জলরাশির মধ্যে। সেই অতিথি পাখিরা এখানকার দৃশ্যকে আরও মনোরম করে তুলেছে।
শীত ও বসন্ত ঋতুর শুকনো মৌসুমে দীঘির পাড় লোকে-লোকারণ্য হয়ে প্রাণবন্ত করে তোলে দিনের পুরোটা সময়। বারো ভূঁইয়াদের শাসনামলে রাজা উদয় নারায়ণের স্ত্রী দুর্গাবতী যদি তখন অনুমান করতেন তার প্রজাদের জলপানের জন্য খনন করা এই দীঘি আধুনিক যুগে পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়বে, তাহলে হয়তো ১৮৭০ সালে নির্মিত দীঘির সৌন্দর্যবর্ধনে আরও কিছু করে যেতেন।
জনশ্রুতি রয়েছে, রাজমাতা দুর্গাবতী দীঘিটি খননকালে তার কর্মচারীদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন দীঘির আয়তন নির্ণয়ের এক অভিনব পন্থা নেয়ার কথা। সে অনুযায়ী দুর্গাবতী সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি পেছনে না ফিরে যত দূর হেঁটে যাবেন তত দূর দীঘি খনন হবে। কথা অনুযায়ী রাজমাতা ৬১ কানি জমি হেঁটে অতিক্রমের পরই হঠাত্ পেছনে ফিরে তাকান। যদিও তার এই পেছনে ফিরে তাকানোর বিষয়ে দুটি কারণের কথা প্রচলন রয়েছে। কেউ বলেন, রাজদরবারের কর্মচারীদের ঘোড়ার ডাকের শব্দে, কেউ বা দাবি করেন কর্মচারীদের ঢোলের আওয়াজে দুর্গাবতী সন্ধ্যা নামার আগেই পেছনে তাকিয়ে দুর্গাসাগরের অস্তিত্বের জন্ম দেয়। তারই আলোকে সেই আমলে চার লাখ টাকা ব্যয়ে দীঘিটি খনন করে প্রজাদের তৃষ্ণার পানি জোগান দেয়া হয়।durga sagor
কিন্তু দীঘির উত্পত্তি এখানে শেষ হলেও মাধবপাশা গ্রামে দুর্গাবতীর আগমনের নেপথ্যে রয়েছে আরেক ইতিহাস। পূর্ব ইতিহাস বলে বিক্রমপুর পরগনার চন্দ্রদ্বীপ উত্পত্তির নেপথ্যে চন্দ্র শেখর চক্রবর্তী নামে এক সন্ন্যাসীর ভূমিকা রয়েছে। দনুজ মর্দন নামে তার এক শিষ্য ছিল। সেই সন্ন্যাসী তার স্বপ্ন দেখা কালী দেবীর নির্দেশ অনুযায়ী শিষ্যকে জলরাশি থেকে তিনটি দেবী মূর্তি উত্তোলনের কথা জানান। সন্ন্যাসীর নির্দেশ মতো শিষ্য দনুজ ডুব দিয়ে তিনটি মূর্তি উত্তোলন করেন। অতঃপর জলরাশিতে স্বপ্নের বাস্তবতায় চর জেগে উঠলে দনুজ মর্দন রাজা হন। সন্ন্যাসীর নাম অনুযায়ী ওই রাজ্যের নাম হয় চন্দ্রদ্বীপ। পরে দনুজ মর্দন দনুজ মাধব বলে খ্যাতি লাভ করেন। পরে ১২৮০ সালে সুবর্ণ গ্রামের বদলে রাজ্যের রাজধানী চন্দ্রদ্বীপে স্থানান্তর করা হয়। এই দনুজ মাধবের বংশধর বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম রাজা কন্দর্প নারায়ণ ১৫৮৬ সালে বরিশালের মাধবপাশায় রাজধানী স্থাপন করেন। তার ছেলে উদয় নারায়ণ রাজ্যভার গ্রহণ করেন। উদয় নারায়ণের মৃত্যু হলে তার দুই ছেলে লক্ষ্মী নারায়ণ ও জয় নারায়ণের মধ্যে বালক জয় নারায়ণই রাজা হন। কিন্তু রাজ্য পরিচালনা করতেন রানীমাতা উদয় নারায়ণের স্ত্রী দুর্গাবতী। তার ইচ্ছা পূরণে দীঘিটি খননের পর দুর্গাসাগর হিসেবে দীঘিটির নামকরণ হয়ে যায়।
durgasagorসরকারি হিসাব অনুযায়ী, গোটা দীঘির আয়তন ৪৫ একর ৪২ শতাংশ। এর মধ্যে ২৭ একর ২৮ শতাংশ জলাশয়, বাকি ১৮ একর ৪ শতাংশ পাড়। রাজতন্ত্র বিলুপ্তির পর সর্বপ্রথম ১৯৭৪ সালে তত্কালীন ভূমিমন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত দীঘিটি সংস্কার করেন। এর মাঝখানে রয়েছে সুউচ্চ মাটির টিবি, যা থেকে দীঘি বদ্বীপে রূপ নেয়। এটা দীঘির বাড়তি আকর্ষণ। পাখিরা এখন ঢিবিতে গড়ে তুলেছে অভয়ারণ্য। বলা যায়, বারো মাসেই বিভিন্ন প্রজাতির পাখির সমাবেশ থাকে দুর্গাসাগরে। তবে শীত মৌসুমে অতিথি পাখির কলকাকলি মুগ্ধ করে সবাইকে। দীঘির পাড়ে বনবিভাগের তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন ফলদগাছ লাগানো হয়েছে। নয়নাভিরাম দুর্গাসাগর দেখার জন্য প্রতিদিন ভিড় জমে সৌন্দর্যপিয়াসীদের।

About akter tanjida

Check Also

শশী লজ

অবসর সময়ে ঘুরে আসতে পারেন কোন মনোরম এক জায়গা থেকে । এরকমই এক জায়গা হচ্ছে …