Home / মনের জানালা / আমি তাদের মাঝে নেই

আমি তাদের মাঝে নেই

ami tader maje neiরাইসুল মিয়া বললেন, ‘শুয়োরের বাচ্চা, ট্যাকা কি গাছে ধরে? তোর বাপের কি ট্যাকার গাছ আছে?’
.
রাইসুল মিয়ার ছেলে মিন্টু চোখ পিটপিট করে বলল, ‘আমি যদি শুয়োরের বাচ্চা হই, তাইলে শুয়োরটা ক্যাডা?’
.
আমি অতুল সেন এর চায়ের দোকান থেকেই এসব দেখতে পাচ্ছি। মিন্টুর মুখে এই কথা শুনে রাইসুল মিয়া রেগে গেল। সামনে চেড়া কাঠ পেয়ে ছেলেকে বেদম প্রহার করতে লাগল। চেড়া কাঠের প্রহারে মিন্টু ও-মা, ও-মাগো বলে চিৎকার করতে শুরু করল। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে বারো বছরের ছেলেটার নিষ্পাপ চোখের জলে সূর্যের আলো পড়ে চিকচিক করছে। আমি চায়ের দোকান থেকে উঠলাম। এসব দেখতে দেখতে চোখ সয়ে গেছে; বুকের বাঁ দিকের ভেতরের যন্ত্রটায় কোনো অনুভূতি সাড়া দেয় না, বড্ড অচল হয়ে পড়েছে।
.
প্রতিদিন সকালে হোটেল আসার সময় মনসুর চাচার সঙ্গে দেখা হয়। তিনি সকালে ঘুম থেকে উঠেই তার বাড়ির রাস্তা লাগোয়া বারান্দায় বসে বেশ সময় নিয়ে দাঁত ব্রাশ করেন। আমাকে দেখলে তিনি গুই সাপের মতো ফোস ফোস করেন। আজও করলেন। এরকম কেন করেন আমার জানা নেই। আমি মনে মনে তাকে গুই সাপ বলি। ভাগ্যিস মনের কথা পড়তে পারার ক্ষমতা উপরঅলা তাকে দেননি।
.
নবাব চাচা হোটেলের ক্যাশ বাক্সে এখনো বসেননি। রতন তার নরম আঙুলের কায়দায় দেশলাই জ্বালিয়ে দুটো ধুপ কাঠি ধরিয়ে ক্যাশ বাক্সের উপর রাখল। প্রতিদিন সকালে এই কাজের দায়িত্ব ওর। রতনের বয়স আট। এই হোটেলে ওর কাজ টেবিল পরিষ্কার করা ও পানি দেয়া। ইদ্রিস আলী হোটেলের বাবুর্চি। তিনি অলরেডি সকালের পরোটা ডাল বানিয়ে ফেলেছেন। তবে ভদ্রলোক অপরিষ্কার। যে হাতে কপালের ঘাম পরিষ্কার করেন ঠিক ওই হাত দিয়ে তিনি ময়দা ধরেন। আমি তাকে প্রায়ই বলি, ভাইসাহেব, আপনার কাজটা ঠিক হচ্ছে না। একটু পরিষ্কারভাবে কাজ করেন। তিনি আমার কথা কানে তোলেন না।
.
আমার কাজ চা বানানো এবং টেবিলে কাস্টমারদের খাবার দেয়া। এই কাজ আমাকে একাই করতে হয়। নবাব চাচা এসে ক্যাশ বাক্সে বসলেন। তিনি ক্যাশ বাক্সে বসেই সিগারেট ধরালেন। গম্ভীর গলায় ডাকলেন, ‘দুলু, এই দুলু।’
আমি চাচার কাছে গিয়ে বললাম, ‘জি চাচা।’
‘আমাকে এক কাপ চা দে। চিনি দিতে ভুলিস না আবার।’
‘জি চাচা।’
.
নবাব চাচার কোনো ছেলে-মেয়ে নেই। অবশ্য এজন্য তার কোনো কষ্ট নেই। তার স্ত্রীকে তিনি বেশিই ভালোবাসেন। বড্ড ভয়ও পান তাকে। নবাব চাচার ডায়াবেটিস, একারণে চায়ে চিনি খাওয়া তার নিষেধ। তবুও তিনি আমার হাতে বানানো চা খাওয়ার লোভ সামলাতে পারেন না। আমি তাকে চিনি ছাড়া চা দিলাম।
.
হোটেলে কাস্টমার আসতে শুরু করল। রতনকে পাওয়া যাচ্ছে না। ও মাঝে মাঝে পাশের দোকানের বেঞ্চে বসে মিশা সওদাগরের ছবি দেখে। ও আমাকে মাঝে মধ্যে বলে, ‘দুলু ভাই, বড় হইয়া হারামি হমু। এডি আমার পচুন্দ।’ আমি ওর কথা শুনে হাসি আবার কষ্ট পাই। যে ছেলেটার ছোট থেকে লেখাপড়া করার কথা, ওর মাথার উপর দু’জোড়া ভরসামাখা হাত থাকার কথা, ওর মুখে বড় হয়ে ক্রিকেটার, ফুটবলার, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হব ধরনের কথা থাকার কথা। কিন্তু আজ তার মাথার উপর সেই ভরসামাখা হাত নেই; শুধু আছে একাকী আকাশ।
.
রতন মুখে ‘ঢিসুম, ঢিসুম, ওওও ঢিসুমম’ বলতে বলতে হোটেলে ঢুকল। নবাব চাচা ওকে ধমক দিল, যা ব্যাডা, কাম কর। খালি ঢিসুম, ঢিসুম। রতন কাজে লেগে পড়ল।
.
মনসুর চাচার মেয়ে প্রতিদিন সকাল ন’টার দিকে হোটেলে এসে চা নিয়ে যায়। আজও এল। তার হাতে সবুজ রঙের ফ্লাস্ক। নবাব চাচাকে সে সালাম দিয়ে ভেতরের দিকে এসে আমকে বলল, ‘দিলু সাহেব, কেমন আছেন?’
‘আমার নাম দিলু না, আমার নাম দুলু। আর আমাকে সাহেব বলবেন না।’
‘আচ্ছা দুলু বলব, ঠিক আছে। এখন আপনার হাতের বানানো চা দিন। ধরুন ফ্লাস্ক।’
‘আজ আমি চা বানাইনি।’
‘তাহলে আপনি চা বানান, আমি অপেক্ষা করি। আচ্ছা, আপনাকে একটা প্রশ্ন করি?’
‘হুঁ।’
‘আপনি হোটেলে কাজ করেন কেন? আপনাকে দেখে কিন্তু মনে হয় আপনি শিক্ষিত। ওমা, অবাক হচ্ছেন কেন? মুখ বন্ধ করুন, আপনাদের হোটেলে অনেক মাছি।’
.
মনসুর চাচার মেয়ের নাম মৃণালী। মৃণালী ফ্লাস্কে চা ভরে নিয়ে চলে গেল। সে আসলে চা খায় না। চা নিতে আসা তার অযুহাত। সে আমার সঙ্গে কথা বলতে আসে। প্রতিদিন তার কথার বিষয় এগুলোই। গুই সাপের মেয়ে হবে কালনাগিনী। কিন্তু সে হয়েছে প্রজাপতি।
.
হোটেল বন্ধ হয় রাত ন’টায়। আজ বন্ধ হলো সাড়ে ন’টায়। রতন আর আমি হোটেল বন্ধ করে অতুল সেনের দোকানে বসলাম। অতুল বলল, ‘খবর হুনছ?’
‘কিসের খবর?’
‘মিন্টু মারা গ্যাছে। রাইসুল মিয়া পোলাডার মাথায় বাড়ি দিছিল। বস্তিতে পুলিশ আইছে, রাইসুল মিয়ারে ধরতারে নাই।’
.
আমরা উঠলাম। রতনকে ওর নানীর কাছে পৌঁছে দিতে হবে। নানী ছাড়া রতনের এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই। আমার মাথার উপর কি সেই ভরসামাখা দু’জোড়া হাত আছে? আমার কি কেউ আছে? সবার কথা ভাবতে গিয়ে নিজেকে বড় নিঃসঙ্গ লাগে। চামড়ার শরীরের নিচে কোথায় যেন এক দলা দুঃখ জমে আছে নাছোড়বান্দাভাবে। বেলজ্জ দুঃখ! দেখা যায় না, অনুভব করা যায়। রতনকে পৌঁছে দিলাম।
.
রাত এগারটায় মিন্টুকে মাটির নিচে ঘুমোনো অবস্থায় রেখে এল বস্তির ক’জন মুরুব্বি। আমি যাইনি। দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। মিন্টুর নেশাখোর, হিরোয়িনখোর, পতিতালয়ে যাতায়াত করা পিতাকে পুলিশ ধরেছে অল্প আগে। তার দ্বিতীয় স্ত্রী কান্নার অন্তরালে বিশ্রীভাবে হাসছে। রফিকের হতে তাকে আর নতুন করে কাঠ খড় পোড়াতে হবে না। সব পথ পরিষ্কার। আমার বুকের গভীরে বেড়ে ওঠা কষ্টরা গভীর রাতে জেগে ওঠে; শেষ করে দিতে চায় অবিরত।
.
বেশ কয়েকদিন কেটে গেছে। হোটেলে সবকিছু আগের মতই চলছে। মিন্টু মরে যাবার পনের দিন হয়েছে। রাইসুল মিয়ার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে। সে নাকি স্বীকার করছে না যে, সে তার ছেলেকে খুন করেছে। এদিকে মৃণালীর বাবাকেও পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে হিরোয়িন ও নারী পাচারের জন্য।
.
নবাব চাচা হোটেলের জন্য টিভি কিনেছেন, ডিস লাইন নিয়েছেন। এ-সবকিছু তিনি করেছেন রতনকে খুশি করার জন্য। আমি হোটেলে প্রায় তিন মাস থেকে কাজ করছি। আজ কাজ ছেড়ে দিলাম। নবাব চাচা, রতন, ইদ্রিস আলী খুব অবাক হয়েছে। নবাব চাচা বললেন, ‘দুলু, মজুরি বাড়ায় দিমু। তাও কাজটা ছাড়িস না। তোরে আমি পছন্দ করি।’
.
তবুও আমাকে কাজটা ছেড়ে দিতে হলো। আমাকে ছেড়ে যেতে হবে এই বস্তি, এই সাধারণ মানুষদের। আর ক’দিন থাকলে আমি প্রেমে পড়ব এই মানুষদের, প্রজাপতির মতো মৃণালীর।

-সাঈদ আহমেদ

About Kabir Hossain

Check Also

ভাত, কাপড়, ভালবাসা

( ভুমিকায় বলে নেই, গল্পের বক্তা চরিত্রটির মত আমিও নারীবাদি নই।আমি মানি নিয়তি নারী পুরুষ …