Home / মনের জানালা / স্বপ্নকন্যা

স্বপ্নকন্যা

love-02

বলতে গেলে সারাটা জীবনই নিয়তি তাকে নিয়ে খেলা করেছে নিষ্ঠুর ভাবে। এই যে এত দীর্ঘ সময় পর, বছরের পর বছর হৃদয় দগ্ধ করা প্রতীক্ষার পর আবার যখন দেখতে পেলেন জোহরা খাতুনকে, তবুও যেন বিশ্বাস হতে চায় না আফজাল সাহেবের। তার কাছে মনে হচ্ছে যেন স্বপ্ন দেখছেন তিনি। অথচ চোখের সামনেই দাঁড়িয়ে আছে জ্বলজ্যান্ত একজন রক্ত মাংসের মাঝ বয়সী সুন্দরী মানবী। বয়সের ভার হয়তো তাকে কিছুটা নূব্জ্য করেছে সত্যি। ঘোমটার আড়ালে কানের কাছে দু একটি পাকা চুলও চোখে পড়ে। তা ছাড়া যেন জোহরা খাতুন দেখতে সেই আগের মতই আছেন। আর এতগুলো সত্যি যেখানে উপস্থিত তা কী করে মিথ্যে হয়ে যেতে পারে? তবুও যেন সন্দেহের দোলাচলে দুলতে থাকেন আফজাল হোসেন।

জোহরা খাতুন দাঁড়িয়ে আছেন তার সামনে। যেন অনন্ত কালের কোনো বন্দীদশা থেকে উদ্ধার পেয়েই তিনি ছুটে এসেছেন তার কাছে। কিন্তু পরিস্থিতি আর পারিপার্শিকতার কারণে তিনি তাকে টেনে নিতে পারছেন না একান্ত সান্নিধ্যে। আফজাল হোসেন নির্নিমেষ তাকিয়েছিলেন জোহরা খাতুনের দিকে। কিন্তু কিছুই বলতে পারছিলেন না। হয়তো বলতে পারছিলেন না জোহরা খাতুনও। তখনই আফজাল হোসেনের স্ত্রী সালমা এসে বললেন, ওকে দেখার কি আছে? আজ থেকে ও আমাদের বাসায় থাকবে আর কাজ করবে। কাজের বুয়া আজকাল পাওয়াই যায় না। তবুও ভাগ্য ভালো কেবল খাওয়া-পরার বিনিময়েই একে পাওয়া গেছে।

সারাটা জীবন যার স্মৃতি মহামূল্যবান গোপন সম্পদের মত হৃদয়ের গহীনে লুকিয়ে রেখেছেন, সেই জোহরা খাতুন তারই চোখের সামনে একজন গৃহকর্মীর ভূমিকায় ব্যস্ত থাকবেন, ব্যাপারটা ভাবতেই যেন বুক বিদীর্ন হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয় আফজাল হোসেনের। যা তিনি ভুল করেও একবারের জন্যে ভাবতে পারছিলেন না। আজীবন যাকে বুকের মণিকোঠায় ঠাঁই দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে বসে ছিলেন, যাকে তিনি মনে মনে দিনরাত নানা আবরণে আভরণে সাজিয়েছেন, সেই স্বপ্নকন্যা তারই দৃষ্টির সম্মুখে দিনরাত অপদস্ত হবে? তারই চোখের সামনে বালতির ময়লা পানিতে শতচ্ছিন্ন ময়লা ন্যাকড়া ভিজিয়ে ঘরের মেঝে মুছবে কিংবা ঝাঁট দেবে? রান্নাঘরে খেটেখুটেও একগাদা কাপড় নিয়ে বাথরুমে ধুতে বসবে? যা তিনি ভাবতেই পারেন না। তবুও তিনি স্ত্রীকে বললেন, এ কী কাজ করবে? একেই তো আরেকজন না দেখলে সে চলতে পারবে না!

সালমা কপাল কুঁচকে বললেন, তাহলে কি বিদায় করে দিতে বলছো? ভেবে দেখ, কাজের মানুষ কিন্তু আজকাল সহজে পাওয়া যায় না!

তখনই যেন আফজাল হোসেনেরর বুকটা কেমন হাহাকারে ভরে ওঠলো। যেমন করেই হোক জোহরা খাতুনকে আর দৃষ্টির আড়াল করতে চান না তিনি। সঙ্গে সঙ্গেই কেমন কন্ঠে তিনি বলে উঠলেন, না না। থাক!

কতকাল পর আবার জোহরা খাতুনকে দেখতে পেয়েছেন। হোক না তার বাহ্যিক পরিচয় গৃহকর্মী। তবুও তো জোহরা খাতুন তার চোখের সামনেই থাকবেন। এতকাল যাকে একটিবার দেখার জন্য দিনরাত ছটফট করেছেন। যার একটি সংবাদের জন্য দিনরাত উম্মুখ হয়েছিলেন। সে কোথায় আছে? কেমন আছে? জানার জন্য উদগ্রীব হয়েছিলেন। সে যদিও কাছাকাছি এলো শেষপর্যন্ত, তাও যদি ফের তাকে হারিয়ে ফেলতে হয় তাহলে এর চেয়ে দুঃখজনক ঘটনা হয়তো তার জীবনে আর কিছুই হতে পারে না।

সালমা আফজাল হোসেনের কণ্ঠস্বরে কেমন চমকে উঠে তাকালেও কিছু বললেন না। কিন্তু তার অবয়বে যেন বৈশাখী কালো মেঘের একটি ছায়া এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে তখনই। তিনি খানিকটা বিরক্ত হয়েই যেন জোহরা খাতুনকে বললেন, যাও, তোমার থাকার ঘরটা দেখে ঝেড়েপুছে নাও। আর ময়লা কাপড়ে থাকবে না। চুলে ঠিকমত তেল সাবান দিও। অপরিষ্কার মানুষ আমার সহ্য হয় না!

তারপরই তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন জোহরা খাতুনকে, রান্নাবান্না জানো তো?

জোহরা খাতুন তখনই খানিকটা হেসে উঠে বললেন, খেয়ে বাঁচতে হলে তো মানুষকে রান্নাবান্না কিছুটা জানতেই হয়।

আবার চমকে উঠবার পালা আফজাল সাহেবের। কিন্তু তিনি চমকে না উঠলেও চমকালেন সালমা নিজেই। মনে হলো কিছু বলতে চেয়েও যেন থেমে গেলেন।

জোহরা খাতুন ফের একই ভঙ্গিতে হাসেন। আফজাল হোসেন কতদিন জোহরা খাতুনকে অনুনয় করে বলেছেন, একটু হাসো না জোহরা! মুখটা কালো করে রেখো না!

সেই জোহরা খাতুন আজও একই ভঙ্গিতে হাসেন। আফজাল হোসেনের মনের ভেতর পুরোনো দিনগুলোর স্মৃতি যেন দপদপিয়ে চেরাগের সলতের আগুনের মত লাফিয়ে উঠতে চায়।

সালমার মনে যেন অকস্মাৎ একটি সন্দেহের ঢেউ আছড়ে পড়ে। তিনি বলে উঠলেন, তুমি আমাদের ব্যাপারে সব জেনে বুঝেই এসেছো কিন্তু! পরে না আবার আমাদের ডুবিয়ে দিয়ে যাও!

তা কি করে হয়?

তোমাকে আমি ঠিক বিশ্বাস করতে পারছি না!

সেটা আপনার মনের ব্যাপার। বলেন তো ফিরে যাই। যেভাবে আমার দিন কাটছিলো, সেভাবেই বাকি দিনগুলো কাটিয়ে দিতে পারবো।

আফজাল হোসেনের ইচ্ছে হয় তিনি বলেন যে, সালমা, তুমি একে নিশ্চিন্তে বিশ্বাস করতে পারো। কিন্তু তিনি জেনে বুঝেই চুপ করে থাকতে বাধ্য হন। হয়তো এ কথা শুনলে সালমা বলে বসতে পারে, তুমি একে চেনো নাকি? নাকি তোমাকে খুঁজতে খুঁজতেই এখানে এসে উঠেছে?

সালমার মুখে একেবারেই লাগাম নেই। কলেজে পড়াতে পড়াতে স্বভাবটাও তার মাস্টার মাস্টার হয়ে গেছে। ছাত্র-ছাত্রীদের বলতে বলতে এখন আর স্থান-কাল-পাত্র বোধ হয়তো তার হারিয়ে গেছে। যে কারণে আফজাল হোসেন স্ত্রীর সঙ্গে তেমন জটিল কোনো কথাই আজকাল বলেন না।

যদিও আফজাল হোসেন জানেন না যে, সালমাই জোহরা খাতুনকে এ বাড়ির ঠিকানা দিয়ে এসেছিলেন। বাকি জীবন নির্ঝঞ্ঝাট ভাবেই জোহরা খাতুন এ বাড়িতে থাকতে পারবেন, সে প্রতিশ্রুতিও সালমা তাকে দিয়ে এসেছিলেন।

আফজাল হোসেনের ভাবনা হয়তো মিথ্যে নাও হতে পারে। এ নিয়ে তিনি নিজের মনেই যুক্তিতর্ক করেন। কিন্তু বেশিক্ষণ তা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে পারেন না। তিনি নিজে যেমন জোহরা খাতুনের প্রতীক্ষায় ছিলেন এতকাল, জোহরা খাতুনের মনেও তার জন্য কিছুটা প্রত্যাশা থাকা বিচিত্র কিছু নয়। কারণ তারা দুজনেই যদি স্বেচ্ছায় বিচ্ছিন্ন হতেন, তাহলে হয়তো এমন একটি ধারণা অপ্রাসঙ্গিক বলেই মনে হতো। কিন্তু তাদের জীবনের যে সত্যগুলো মুহূর্তেই মনের ভেতর কিংবা স্মৃতিতে বাঙময় হয়ে উঠেছে, তা তিনি প্রতিহত করবেন কিভাবে?

জোহরা খাতুন সালমার কথাতেই তার সঙ্গে চলে আসতে চাননি। তাদের গ্রামে সালমার শ্বশুর বাড়ি। প্রায় তিনি সেখানে যেতেন তার বয়স্ক শ্বশুর শাশুড়িকে দেখতে। কথায় কথায় যখন তিনি জানতে পারেন যে, জোহরা খাতুনের বলতে গেলে কেউ নেই। একটি বাড়িতে একা থাকেন। কোনো রকমে অভাব অনটনের ভেতর দিয়ে তার কাল গুজরান হচ্ছে। তার ভাই আর ভাইয়ের বউরা মিলে তাকে পৃথক করে দিয়েছে। নামমাত্র যা সম্পত্তি তাকে দিয়েছিলো, তাও তার অসুখের সময় চিকিৎসার নামে বিক্রি করে দিয়ে টাকাগুলো হাতিয়ে নিয়েছে ভাইয়েরা। ব্যাপারটি বুঝতে পারলেও জোহরা খাতুন কিছু বলতে পারেন না ভাইদের। কিছু একটা বললেই শুনতে হবে অকথ্য ভাষা। যা শুনলে নিজকে মানুষ হিসেবে ভাবতে ইচ্ছে করে না। ইচ্ছে করে না এ কৃপণ আর নির্দয় পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে।

সালমা একটি কাগজে ঠিকানা লিখে দিয়ে জোহরা খাতুনকে বলেছিলেন, তেমন একটা কষ্টের কাজ করতে হবে না। তিনি যখন ঘরে থাকবেন না, তখন তার ছেলে-মেয়েদের প্রতি একটু খেয়াল রাখবেন। এ ছাড়া তেমন ভারী কাজ তাকে করতে হবে না। মোট কথা তার অবর্তমানে তিনি তাদের দিকে দৃষ্টি রাখলেই চলবে।

তারপর জোহরা খাতুন অনেকদিন ভেবেছেন শহরে গিয়ে কোনো একটা কাজকর্ম জুটিয়ে নিতে পারবেন। কিন্তু শহরে এলেই যে কাজ পেয়ে যাবেন তা কিন্তু হয়নি। এ বয়সে কোনো কাজ পাওয়া খুবই কঠিন। তা ছাড়া বিদ্যার জোর বেশি থাকলে না হয় চেষ্টা করে দেখতে পারতেন। কিন্তু বিদ্যার পুঁজি যার সামান্য তিনি কী আর কাজ পাবেন? যদিও কায়িক পরিশ্রমের কাজ পেলেও পেতে পারতেন কিন্তু তার যে বয়স এ বয়সে তাও যেন তার জন্য ঠিক উপযুক্ত হয় না।

দুদিন খেয়ে না খেয়ে নানারকমের বিপদের হাত থেকে নিজকে রক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে শেষে সালমার দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী হাজির হয়েছেন তিনি। আর যাই হোক চার দেয়ালের ভেতর অন্তত নিরাপত্তা পাবেন কিছুটা। কিন্তু নিরাপত্তা কোথায় আর হলো! আফজাল হোসেনকে চোখের সামনে দেখতে পেলেও তিনি যেন তাকে চিনতেই পারলেন না। কিন্তু জোহরা খাতুন এত কাছ থেকে যাকে দিনের পর দিন দেখেছেন তাকে কী করে এত সহজে ভুলে যাবেন? পুরুষ মানুষ আফজাল হোসেন যত সহজে জোহরা খাতুনকে ভুলে যেতে পারেন জোহরা খাতুনের পক্ষে তা কস্মিন কালেও হয়তো সম্ভব নয়।

তার মনে পড়ে পাশের দুটো গ্রাম পরেই ফুলতলা গ্রামের রাস মেলায় একবার দুজনই গিয়েছিলেন। খানিক পর জোহরা খাতুন একটি গানের আসরের পাশে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন মুগ্ধ হয়ে। আফজাল হোসেন ভেবেছিলেন জোহরা খাতুন তার পেছন পেছনই আসছেন। কিন্তু খানিক বাদে ফিরে জোহরা খাতুনকে দেখতে না পেয়ে ভেবেছিলেন যে, জোহরা খাতুন হারিয়ে গিয়েছেন। খানিক খোঁজাখুঁজি করে আফজাল হোসেন মেলার মাঝামাঝি একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে কাঁদতে আরম্ভ করেছিলেন। জোহরা খাতুনই ব্যাপারটাকে প্রথম আবিষ্কার করেন। আর সে গল্প অনেকদিনই গ্রামের মানুষ বলাবলি করেছে। এখানে আসার কিছুদিন আগেও কেউ কেউ কখনো হঠাৎ মনে করিয়ে দিয়েছে। শেষবার চার-পাঁচদিন আগেই নিরঞ্জন সিকদারের বউ কথাটা মনে করিয়ে দিয়েছিলো। আফজাল হোসেন কি সালমাকে সে গল্প কখনো হাস্যচ্ছলেও বলেননি? তিনি যে সে ঘটনার কথা একেবারেই ভুলে গেছেন তা কী করে হয়? অবশ্য ভুলে যাওয়াটাই হয়তো তেমন অস্বাভাবিক কোনো ব্যাপার নয়। মানুষ যখন অর্থবিত্তের দিক দিয়ে জীবন কিংবা সমাজের ভালো কোনো একটি স্তরে পৌঁছে যায়, তখন অনেক ঘটনাই হয়তো ভুলে যায়। কেউ কেউ অতীত স্মৃতিকে হয়তো ভুলে থাকতে চেষ্টাও করেন। তাহলে কি আফজাল হোসেন সে ঘটনা পুরোপুরিই বিস্মৃত হয়েছেন? নয়তো তাকে দেখেও কেন চিনতে পারলেন না? আর চিনতে পারলেও এমন নির্বিকার থাকেন কী করে?

কিন্তু সালমা যে আফজাল হোসেনের স্ত্রী ব্যাপারটা যদি তিনি কোনোভাবে জানতে পেতেন তাহলে হয়তো কখনোই এদিক পানে আসতেন না। তিনি তো শুনেছেন আফজাল হোসেনের ছোট ভাই তফাজ্জলের স্ত্রী সালমা। নাকি সবাই তাকে মিথ্যে বলেছিলো? পাছে আফজাল হোসেনের কথা শুনে তার মন খারাপ হয়। কিংবা তার সংসারে কোনো সমস্যা সৃষ্টি করবেন ভেবেই হয়তো ব্যাপারটাকে সবাই গোপন করেছে তার কাছ থেকে। কিন্তু তাকে মিথ্যে বলেই বা কার কি লাভ হয়েছে? তিনি শুরুতেই যেমন নি:স্ব ছিলেন আজও তেমনি নি:স্বই রয়ে গেছেন। তা ছাড়া এ মধ্য বয়সে তিনিই বা কী করে কারো সমস্যা হয়ে উঠতে পারেন ভাবলেই অবাক লাগে। আসলে কল্পনাবিলাসী মানুষ যা ভাবে সে ভাবনার সঙ্গে বাস্তবতার অনেক মিলই খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু আফজাল হোসেন তো ঠিকই সংসার ধর্ম করছেন। নিয়তি কি কেবল তাকেই ঠাকালো চারদিক দিয়ে?

ভাবতে ভাবতে সালমার কথা মত তার জন্য নির্দিষ্ট করা ঘরটার দিকে এগিয়ে যান জোহরা খাতুন। ঘরের ভেতরটার দিকে তাকিয়ে মনটা হঠাৎ করেই ভালো হতে আরম্ভ করে। এমন একটি ছিমছাম ঘর তারও থাকতে পারতো। কিন্তু নিয়তি তাকে আশ্রয়দাত্রী করার বদলে করে দিয়েছে আশ্রিতা। তবুও তিনি মেনে নিয়েছেন এমন একটি অপছন্দের ব্যাপারকে। এ জীবনে তিনি যেন সব কিছু কেবল মেনে নিতেই আর সব ব্যাপারের সঙ্গে মানিয়ে নিতেই জন্মেছেন। নিজের যে কোনো ইচ্ছে তিনি প্রকাশ করবেন বা কোনো ইচ্ছের বাস্তবায়ন ঘটাবেন সে সুযোগ হয়তো বাকি জীবনে আর পাবেন না। আর সৃষ্টিকর্তাই হয়তো বিশেষ মনোযোগ দিয়ে তাকে অন্যের ইচ্ছাধীনা করেই তৈরী করেছেন। তাই যদি না হবে, চিরটা কালই কেন তাকে অন্যের ইচ্ছেকেই মেনে নিতে হয়েছে? তার মনটা কি এমনই নিরেট যেখানে কোনো আশার বীজে সর্ষের চারার সমান ইচ্ছের গাছও জন্মাতে পারে না?

দিনরাত হাজারো প্রশ্নে আপন অস্তিত্বকে বিদ্ধ করলেও তেমন কোনো জবাব খুঁজে পান না তিনি। আর এভাবেই কাটিয়ে এসেছেন এতটা কাল। কিন্তু আফজাল হোসেন কখনো গ্রামে গেলেও এ সংবাদ জোহরা খাতুনের কাছে পৌঁছেনি। এমন কি আফজাল হোসেনও তার ব্যাপারে কাউকে কোনোদিন কিছু জিজ্ঞেস করেছেন বলেও শুনতে পাওয়া যায়নি। আর আফজাল হোসেন এভাবে তাকে মন থেকে মুছে দিতে পারলেন ভেবে কষ্ট পেতে লাগলেন জোহরা খাতুন। আপনা আপনিই তার বুকের ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে আসতে থাকে। চোখ দুটো জ্বলতে থাকে অকারণেই। তবুও তিনি চোখ থেকে বিন্দুমাত্র পানি ফেলেন না। এখন কান্না এলেও কান্নাটা হয়তো তাকে মানাবে না। কান্নার মত তেমন কোনো প্রতিকুল পরিবেশও তৈরী হয়নি।

খানিকক্ষণ পর সালমা কটি শাড়ি-ব্লাউজ নিয়ে এসে বললেন, জোহরা, এ ঘরটা তুমি তোমার নিজের মত করে সাজিয়ে নিতে পারো। সঙ্গে অ্যটাচড বাথরুম আছে। এ ঘরে আরো কিছু যদি চাও তাহলে পাবে।

জোহরা খাতুনের মনে হলো এখনই রুমটাতে যা আছে তাই যেন বাহুল্য। নতুন করে আরো অতিরিক্ত কিছু আনিয়ে একা একা শ্বাসরুদ্ধ হওয়ার কোনো মানে হয় না। নিশ্চিন্তে থাকার একটি ঠাঁই পেয়েছেন তাই যথেষ্ট। কিন্তু কতকাল তিনি এভাবে থাকতে পারবেন জানেন না। সালমা কিংবা আফজাল হোসেনের ছেলে-মেয়েরা একদিন বড় হবে। তাদের কাছে তার প্রয়োজনও তখনই হয়তো ফুরিয়ে যাবে। তাহলে কি তিনি আবার ফিরে যাবেন পৈতৃক ভিটেতে? তখন তো তার বয়স আরো বাড়বে। হয়তো ততদিনে তিনি আফজাল হোসেন আর সালমাও বার্ধক্যের আঘাতে স্থবির হয়ে পড়বেন। আফজাল হোসেন বা সালমাকে দেখার লোকজনের হয়তো অভাব হবে না। কিন্তু জোহরা খাতুন তখন কি করবেন? কার আশ্রয়ে থাকবেন? নিজে নিজে কি সব কিছু করতে পারবেন? আর এমন কথা মনে হতেই একটি অনিশ্চয়তার দুরন্ত হাওয়া ঘূর্ণির মত হঠাৎ উদয় হয়ে যেন তার পরবর্তী করণীয়গুলোও ভুলিয়ে দিয়ে যায়।

সালমা রান্নাঘরে কিছু একটা করছিলেন। তখনই হাঁড়ি-পাতিলে বা কোনো একটি ধাতব পাত্রে চামচ কিংবা এমনি আরেকটি ধাতব পাত্রের সংঘর্ষের ফলে বেশ খানিকটা জোরে জোরেই শব্দ হচ্ছিলো। তখনই দু’টো ঘরের দরজা খুলে দুটো ছেলেমেয়ে বাপি আর মমি চোখ ডলতে ডলতে বেরিয়ে এসে ডায়নিং হলের মাঝামাঝি দাঁড়ালো। মমি যেন কিছুটা সাহসী বলেই সে বলে উঠলো, আম্মি, তুমি প্রতিটা দিন কি পেয়েছো বলো তো? শুধু শুধু বিশ্রি শব্দ করে ঘুমটা নষ্ট করে দাও!

সালমা কোনো কথা না বলে যেভাবে শব্দ করছিলেন তেমনি করতে লাগলেন। খানিক পর তিনি বেরিয়ে এসে বললেন, কাল থেকে আর শব্দ করবো না। যার যার খাবার তোরা বানিয়ে খেয়ে নিস!

বাপি অবাক হয়ে বললো, এটা কেমন কথা? শব্দ না করার সঙ্গে খাবারের সম্পর্ক কি?

সালমা গম্ভীর কন্ঠে বললেন, শব্দের সঙ্গে খাবারের সম্পর্ক নাও থাকতে পারে। কিন্তু রান্না করতে গেলে হাঁড়ি পাতিলের সঙ্গে চামচ-খুন্তির ঘষা লাগবেই!

তাই বলে এত জোরে শব্দ হবে?

বললাম তো কাল থেকে আর শব্দ করবো না!

তখনই হয়তো মমির চোখ পড়লো জোহরা খাতুনের দিকে। মমির কণ্ঠ শুনে হয়তো দেখার জন্যে দরজায় মুখ বাড়িয়েছিলেন। তারপরই কি মনে করে আবার ঘরে আড়াল হয়ে গেলেন। তখনই মমি তার মায়ের কাছাকাছি গিয়ে বললো, ওটা কে আম্মি?

সালমা বললেন, কে? কার কথা বলছিস?

মমি প্রায় ফিসফিস করে বললো, ওই যে গেস্টরুমে বুড়ো মত মহিলা?

সালমা বললেন, তোর দাদুর দেশের লোক। এখন থেকে আমাদের সঙ্গেই থাকবে।

মমি অবাক হয়ে বললো, কেন? আমাদের কি কেউ হয়?

সালমা সে কথার জবাব না দিয়ে বললেন, আত্মীয়-স্বজন না হলে কি কেউ থাকতে আসে?

কার আত্মীয়? তোমার না বাবার?

আমারও না তোর বাবারও না। এ তোদের আত্মীয়।

মমি এবার সত্যি সত্যিই অবাক না হয়ে পারে না। বলে, তোমাদের কারো আত্মীয় না হলে আমাদের হয় কী করে?

হয়। তা এখন বুঝবি না। আর এখন সর তো! বাসি মুখে কথা না বলে বাথরুমে যা!

মমি মায়ের ধমক খেলেও আজ আর পাত্তা দিলো না। তার মাথায় ব্যাপারটা খুবই জটিল হয়ে জায়গা দখল করে নিয়েছে। বাবা মা’র কেউ না হলেও আত্মীয়? এ কেমন আত্মীয়? সে ভাবতে ভাবতেই তার ঘরের বাথরুমে গিয়ে ঢুকলো।

মমি তার বাথরুমের দরজা বন্ধ করে দিতেই সালমা আবার জোহরা খাতুনের ঘরে গিয়ে তাকে বললেন, কাপড়-চোপড় পাল্টে আসতে। ইচ্ছে করলে তিনি গোসলও করে নিতে পারেন।

তখনই জোহরা খাতুনের মুখে হাসি ফুটে উঠলো। বললেন, তাই ভাবছিলাম মনে মনে।

হ্যাঁ। কিছুটা তাড়াতাড়ি এসো। ছেলেমেয়ে দুটোর সঙ্গে তোমার পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। মেয়েটাতো জিজ্ঞেসই করে ফেলেছে।

হ্যাঁ। জোহরা খাতুন বললেন, মা মেয়ে দু’জনের কথাই শুনেছি।

বাপি মায়ের পেছন পেছন এগিয়ে এসে জোহরা খাতুনের ঘরে উঁকি মারতেই সালমা খানিকটা রেগে উঠে বললেন, ছিছি বাপি! তুই শব্দ না করে একজন মহিলার ঘরে উঁকি দিচ্ছিস? তোকে কি এসব কিছু শিখাইনি?

ভুল হয়ে গেছে মা!

তখনই সালমা বললেন, এ হচ্ছে জোহরা। তোর দাদুর গ্রামের। এখন থেকে আমাদের এখানেই থাকবে।

তাতো শুনলাম। কিন্তু কী বলে ডাকবো?

ফুপু-খালা যেটা খুশি ডাকতে পারিস।

তুমি না বললে, উনি তোমাদের কোনো আত্মীয় না!

কিন্তু তোদের যে আত্মীয় তা তো বলেছি!

তখনই বাপি কিছু না বলে হাই তুলতে তুলতে ফিরে যায় তার ঘরের দিকে।

জোহরা খাতুন এমন পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত নন বলে বাথরুমে ঢুকে কিছুটা আড়ষ্ট বোধ করেন। শৈশব থেকেই তিনি অভ্যস্ত পুকুরের পানিতে গোসল করে। হাত পা খেলিয়ে ইচ্ছে মত ডুব দিয়ে কিংবা হালকা সাঁতারে গোসল করতেন। এখানে বালতির জমানো পানি মগে নিয়ে গায়ে ঢালতে হবে। যা খুবই অস্বস্তিকর আর বিরক্তিকরও।

তবু তিনি কিছুটা অতৃপ্তি নিয়ে গোসল সেরে ফ্্েরশ হয়ে বেরিয়ে এলেন। হঠাৎ আফজল হোসেনের পড়ার ঘরের দরজায় চোখ পড়তেই জোহরা খাতুন দেখতে পেলেন কেমন গভীর দৃষ্টি ছড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছেন আফজাল হোসেন। তিনি ভেতরে ভেতরে কিছুটা অস্থির হয়ে উঠলেন। হঠাৎ করেই তার মনে হয় যে, আফজল হোসেন তাকে ঠিকই চিনতে পেরেছেন। আর মনেও রেখেছেন অতীতের সব কিছুই। তার দৃষ্টির গভীরতা অন্তত তাই বলে।

জোহরা খাতুনের এ কথা মনে হতেই সকাল বেলার সেই দুঃখবোধ যেন নিমেষেই তিরোহিত হয়ে যায়। মনে হয় তিনি একাই কেবল আফজল হোসেনের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে রাখেননি। আফজল হোসেনের মনেও সে সব স্মৃতিময় দিনগুলোর সবগুলো না হলেও খানিকটা অন্তত অবশিষ্ট আছে।

শেষবার আফজল হোসেন পড়ার জন্য শহরে চলে আসছিলেন, তখন বিদায় নিতে গিয়ে আরেকটু হলে সবার সামনেই কেঁদে ফেলছিলেন। বিড়বিড় করে বলেছিলেন, তোমাকে আমি কখনোই ভুলতে পারবো না। তুমিও আমাকে ভুলে যেও না। এতদিন ভেবেছেন বিনা কারণেই তিনি আফজল হোসেনকে মনে রেখেছেন। আফজল হোসেন কবেই তাকে ভুলে গিয়ে দিব্যি বিয়ে করে সংসারী জীবন যাপন করছেন।

আফজল হোসেনকে একা তিনি দোষ দিতে পারছেন না সংসারী হওয়ার অপরাধে। তিনি নিজেও তো সংসারী হতেই বাবা-মায়ের পছন্দ মত পাত্রের হাত ধরে শ্বশুর বাড়ি গিয়েছিলেন। লোকটা যদি অকালে মরে না যেতো, আজ হয়তো তারও ছেলে মেয়ে থাকতো দু’চারজন। তারাও হয়তো মমি কিংবা বাপির মতই কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখা পড়া করতো।

ভাবতে ভাবতে জোহরা খাতুনের বুক চিরে একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসতেই বুকের বাঁ পাশটায় কেমন যেন আংটা দিয়ে ধরার মত ব্যথা অনুভব করলেন। খুব বেশিক্ষণ না। খুবই সামান্য সময়ের জন্যই। কিন্তু এরই মধ্যে তার কপালে যেন খুব হালকা একটি ঘামের আবরণ জমে উঠেছে। গোসল পরবর্তী শারীরিক যে শীতলতা বোধ তাও যেন এ সামান্য কষ্টের কারণেই বিলীন হয়ে গেছে।

আফজাল হোসেন তাকিয়ে ছিলেন জোহরা খাতুনের দিকে। কিন্তু জোহরা খাতুন কেমন যেন হঠাৎ করেই স্থবিরের মত দাঁড়িয়ে পড়লেন। বাতাসের জন্য যেন একবার বুক ভরে শ্বাস নিতে চেয়েও পারলেন না। কেমন কুঁজো হয়ে বুক চেপে বসে পড়লেন মেঝের ওপর। চেহারাটাও কেমন বিকৃত দেখাচ্ছে। মিনিট খানেক আগেই তো কেমন ঝকমকে দেখাচ্ছিলো জোহরা খাতুনকে। হঠাৎ কী এমন হলো যে, তিনি দাঁতে ঠোঁট চেপে ধরে মেঝেতে অমন করে বসে পড়লেন। লক্ষণটা যেন ঠিক মিলে যাচ্ছে।

আফজাল হোসেন যেবার একমাস লন্ডনে থেকে ফিরে এলেন, সেদিনই তার মা সালমা সম্পর্কে কিছু একটা বলতে গিয়ে হঠাৎ বুক চেপে বসে পড়েছিলেন ঠিক একই ভাবে। চেহারায় বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠেছিলো মুহূর্তেই। কিন্তু হাসপাতালে নিতে নিতেই মায়ের কখন মৃত্যু হয়েছে টের পাননি। যে কারণে সালমা তার মাকে কি বলেছিলেন আর তিনিই বা কি বলতে চেয়েছিলেন তা আজও অজানা রয়ে গেছে। আফজাল হোসেনও সালমাকে এ নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করেননি। সালমা ক্ষেপে যাবে বা সংসারে অশান্তি করবে ভেবে তিনি বরাবরই চুপ থাকার পক্ষপাতি ছিলেন বলে, কোনো বিষয় নিয়ে বাড়াবাড়িও করতে চান না।

জোহরা খাতুন একই ভাবে মেঝেতে ঝুঁকে বসে আছেন। আফজাল হোসেন সেদিকে দৃষ্টি রেখে টেবিলের উপর থেকে ফোনটা নিয়ে ডাক্তার হাসমত উল্লাকে ফোন করে বললেন, এখনি একজন ডাক্তার সহ অ্যাম্বুলেন্স পাঠিয়ে দাও।

ক্লিনিক বেশি দূর না হলেও সময়টাকে কেন যেন দীর্ঘ বলে মনে হয়। তিনি স্থানকাল ভুলে গিয়ে ছুটে গেলেন জোহরা খাতুনের পাশে। কি হয়েছে তোমার?

জোহরা খাতুন তেমনি দাঁতে ঠোঁট চেপে ধরে মাথা নেড়ে বোঝাতে চাইলেন হয়তো যে, তার কিছু হয়নি। কিন্তু এখন তাকে তুলে বিছানায় শোওয়ানো খুবই জরুরি। কিন্তু সালমা কি মনে করে ভেবে তিনি স্ত্রীকে ডাকলেন, সালমা, সালমা!

তার কণ্ঠস্বরে যে আকুতি ছিলো তা হয়তো লহমায় কর্ণগোচর হয় সালমার। তিনি সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এসে জোহরা খাতুনকে এভাবে বসে থাকতে দেখে প্রশ্ন বোধক দৃষ্টিতে তাকালেন আফজাল হোসেনের দিকে।

পেছন পেছন মমি আর বাপিকেও আসতে দেখা যায়।

আফজাল হোসেন বললেন, একে বিছানায় তুলতে হবে।

কি হয়েছে? বলে মমি এগিয়ে আসে আরো। জোহরা খাতুনের দিকে তাকিয়েই তার মনে কোনো একটা অশুভ ভাবনার উদয় হয়। তখনই সে জোহরা খাতুনের পেছন থেকে দুটো বগলের নিচ দিয়ে হাত দিতেই বাপি পাদুটো তুলে ধরলে সালমাও জাহরা খাতুনের কোমরের নিচে হাত দিয়ে আরো খানিকটা উঁচিয়ে ধরতে চেষ্টা করেন। একবার রুদ্ধশ্বাসে কেবল বলতে পারলেন, হাসমতকে ফোন দাও!

আফজাল হোসেন কোনো কথা বললেন না। তিনি যা করার ইতোমধ্যেই করেছেন। কিন্তু এখন তার আর কী করণীয় তা বুঝতে পারছিলেন না।

কিছুক্ষণের মধ্যেই অ্যাম্বুলেন্সের সংকেত শুনতে পান আফজাল সাহেব। এবং দেখতে দেখতেই হাসমত উল্লা পেছনে স্ট্রেচারসহ দুজন লোক নিয়ে ঘরে প্রবেশ করে। কার কি হয়েছে?

বলতে বলতে এদিক ওদিক তাকায় সে।

মমি হাত তুলে বললো, এদিকে আঙ্কেল!

ডাক্তার হাসমত জোহরা খাতুনের দিকে তাকিয়ে কি বুঝলেন কে জানে! সঙ্গে সঙ্গেই নাকেমুখে অক্সিজেনের মাস্ক চেপে ধরে সাথের লোক দুজনকে বললেন, পেশেন্টকে নিয়ে চলো।

সঙ্গে আফজাল সাহেবও ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে উঠলেন। জোহরা খাতুনের নাকে মুখে অক্সিজেনের মাস্কটা এক হাতে ধরে রাখলেন। কিন্তু জোহরা খাতুন সেটাকে সরিয়ে দিয়ে আফজাল হোসেনের একটি হাত দুহাতে চেপে ধরে বললেন, আমার সময় শেষ। তবুও ভালো লাগছে জীবনের শেষ মুহূর্তে তোমাকে এভাবে পেলাম। বলতে বলতে জোহরা খাতুনের দুচোখ বেয়ে পানির স্রোত বয়ে চলে।

আফজাল সাহেবেরও খারাপ লাগে। কিন্তু তিনি কেবল বলতে পারেন, এখন চুপ করে থাকো তো! তারপর তিনি আবার জোহরা খাতুনের নাকে অক্সিজেন ধরেন। ঠিক তখনই জোহরা খাতুন চোখ বন্ধ করলে আফজাল হোসেন বুঝতে পারেন না যে, জোহরা খাতুন এমনিই চোখ বন্ধ করলেন, নাকি জ্ঞান হারালেন।

ক্লিনিকে আসতে বেশি সময় লাগে না। জোহরা খাতুনকে আইসিসিইউতে নিয়ে গেলে আফজাল হোসেন কেমন উদ্ভ্রান্তের মত বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন।

এমন সময় বাপি ছুটে আসে। ঘরে ফেলে আসা সেল ফোনটি আফজাল হোসেনের দিকে বাড়িয়ে ধরে বলে, তোমাকে এক্ষুনি অফিসে ফোন করতে বলেছে!

আফজাল সাহেবের মনে পড়লো যে, আজ নতুন একটা কণ্ট্রাক্ট সাইন হওয়ার ব্যাপারে মিটিং হওয়ার কথা। ঘড়িতে সময় দেখলেন। মিটিং শুরু হতে আরো ঘন্টাখানেক বাকি আছে। তিনি সেল ফোনটা তুলে নিয়ে কাউকে ফোন করে বললেন, আজকের সব প্রোগ্রাম ক্যান্সেল করে দাও।

কিছুক্ষণ পর সালমাকেও দেখা যায়। তিনি এসে বললেন, তুমি অফিসে যাও। এদিকটা আমি দেখছি।

আফজাল হোসেন বললেন, প্রোগ্রাম ক্যানসেল করে দিতে বলেছি।

সালমা কেমন অবাক হয়ে তাকালেন আফজাল হোসেনের দিকে। চোখেমুখে রাজ্যের তাচ্ছিল্য ফুটিয়ে বললেন, জোহরার জন্য?

আফজাল হোসেন কোনো কথা বললেন না।

সালমা ফের বলে উঠলেন, একটা হাউস মেইডের জন্য এমন ইম্পর্টেন্ট মিটিংটা ক্যানসেল করালে?

সালমার কথাগুলো আফজাল সাহেবের কানে কেমন বিশ্রী আর কুৎসিৎ হয়ে প্রবেশ করে। তবুও তিনি সালমার মুখের দিকে তাকিয়ে নির্বিকার কণ্ঠে বলে উঠলেন, এখন জোহরার চেয়ে ইম্পর্টেন্ট কিছু নেই।

বিস্মিত সালমা কী বলবেন তেমন কোনো শব্দ খুঁজে পাচ্ছেন না যেন। কিছু একটা বলতে চেয়ে মুখ তুললেও হয়তো ভিন্ন কিছু ভেবে ফের মুখ নামিয়ে নিলেন তিনি। মনে হচ্ছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি যেন তার এত কালের চেনাজানা আফজাল হোসেন নয়। যেন ভিন্ন কেউ। এর আগে যাকে কখনো দেখেননি তিনি।(সংগৃহীত}

About CheraPata

Check Also

ভাত, কাপড়, ভালবাসা

( ভুমিকায় বলে নেই, গল্পের বক্তা চরিত্রটির মত আমিও নারীবাদি নই।আমি মানি নিয়তি নারী পুরুষ …