Home / ব্যক্তিত্ত্ব / শামছুল হক

শামছুল হক

শামছুল হক: ১লা ফেব্রুয়ারি ১৯১৮ সালে বর্তমান টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার উপজেলার এলাসিন ইউনিয়নের শাকইজোড়া গ্রামের মাতুলালয়ে শামসুল হকের জন্ম। তার পিতার নাম দবির উদ্দিন সরকার মাতা-শরিফুন্নেছা। পিতা দবির উদ্দিন ছিলেন দেওলি ইউনিয়নের মাইঠান- টেউরিয়া গ্রামের একজন আদর্শ কৃষক। চারভাই দুই বোনের মধ্যে শামসুল হক ছোট বেলা থেকেই পড়ালেখায় ভাল। নিজ গ্রামের মসজিদ মাদ্রাসায় বাল্যশিক্ষা গ্রহন করে টেউরিয়া নিমণ প্রাথমিক স্কুল থেকে তৃতীয় শ্রেণী পাশ করেন। এলাসিন স্বর্ণময়ী মাধ্যমিক স্কুলে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণী পর্যমত্ম পাঠ শেষ করে পোড়াবাড়ী মাধ্যমিক স্কুলে সপ্তম শ্রেণী পর্যমত্ম পড়ালেখা করেন। এরপর ১৯৩৫ সালে সমেত্মাষ জাহ্নবী হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি হন। এখান থেকেই শামসুল হকের জীবনে রাজনৈতিক সচেতনতা, কর্মপন্থা ও কার্যক্রম শুরম্ন হয়। ১৯৩৬ সালে তিনি প্রথম মুসলিম লীগের সদস্য হন। ১৯৩৮ সালে এই স্কুল থেকে তিনি কৃতিত্বের সাথে প্রবেশিকা ( মেট্রিকুলেশন) পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে করটিয়া সা’দত কলেজে ভর্তি হন। তখন কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন ইব্রাহিম খাঁ। শামসুল হকের রাজনৈতিক পরিমন্ডল বাড়তে থাকে। ছাত্রদের প্রয়োজনে কলেজের ছাত্র সংসদ প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এবং ১৯৩৯ সালে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় ছাত্র সংসদের সহ সভাপতি (ভি.পি) নির্বাচিত হন। ১৯৪০ সালে এই কলেজ থেকে তিনি প্রথম বিভাগে আই.এ পাস করেন। এরপর রাজনীতির বৃহত্তর অঙ্গনে পা রাখতে জীবনের কঠিন ব্রত নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে প্রথম বর্ষে (সম্মান শ্রেনিতে ) ভর্তি হন। অল্প দিনের মধ্যে রাজনীতির ময়দানে ছাত্র নেতাদের মধ্যে সেরা হয়ে উঠেন শামসুল হক। পড়ালেখায় কিছুটা ঘাটতি দেখা দিলেও ১৯৪৩ সালের চূড়ামত্ম পরিক্ষায় স্বল্প সময়ের প্রস্ত্ততিতে বি.এ (সম্মান) ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর আর এম.এ ডিগ্রি অর্জন করা হয়নি। ১৯৪০ সালে মুসলিম লীগের এক অধিবেশনে যুক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হকের লাহোর প্রসত্মাব উত্থাপনের সময় (২২ মার্চ) শামসুল হকের রাজনৈতিক মঞ্চে অভ্যুদয় ঘটে। এ সময় ছাত্র নেতৃবৃন্দের প্রতিনিধি হিসেবে তার সাথে পরিচয় ঘটে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের। লাহোর প্রসত্মাবের মূল বিষয়‘‘ ভারতের উত্তর পূর্ব ও উত্তর পশ্চিমাংশে স্বাধীন ও সার্বভৌম মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে- এর ভিত্তিতে নিজের মন প্রান উজার করে বড় বড় রাজনীতিবিদদের সাথে জনমত গঠনে সারা বাংলা চষে বেড়ান। বাংলার মুসলমান সমাজ মুসলিম লীগের পতাকাতলে সংগঠিত ও সমবেত হতে থাকে। ১৯৪৫-১৯৪৬ সালে প্রাদেশিক ও সাধারন নির্বাচনে মুসলিম লীগ এই বাংলার বিজয় লাভ করেন। বাংলার জনগন চিনে নেয় শামসুল হককে। দেশ বিভাগের সময় হয়। ১৪ ই আগস্ট ১৯৪৭ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র পাকিসত্মান প্রতিষ্ঠা পায়। পূর্ব পাকিসত্মান ও পশ্চিম পাকিস্তান- মাঝখানে ব্যবধান পায় ১২০০ মাইল। শাসন পরিচালনায় পশ্চিম পাকিসত্মানি গোষ্ঠি আর পূর্ব বাংলার তাবেদারি মুসলমান নাম ধারী জমিদার বেনিয়া গোষ্ঠি । শরম্নতেই সাধারন মানুষের জন্য ত্যাগী,সংগ্রামী মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাসিম প্রমুখকে মুসলিম লীগের রাজনীতি থেকে বিতাড়িত করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় শামসুল হককে ও মুসলিম লীগের রাজনীতি থেকে বিতাড়িত করা হয়। তাই এই অবসরে তিনি ‘গণতান্ত্রিক যুবলীগ’ নামে সংগঠনের আত্নপ্রকাশ ঘটান। তরম্নন ও যুব নেতৃবৃন্দ তার সাথে যোগ দেয়। ১৯৫০ সাল মোগলটুলি, ঢাকা অফিসে অনেকেরই যাতায়াত বাড়তে থাকে। বিভিন্ন প্রশ্নে যেমন ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি গন দাবি খাদ্য সমস্যা সম্পর্কে মানুষের কাছাকাছি যেতে চেষ্টা করে। কিন্তু বেশিদিন টিকতে পারে না। এরপর শামসুল হক আবুল হাসিমের সহযোগিতায় মোগলটুলি অফিসে শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও হাসিম পন্থি লোকদের নিয়ে ‘‘ওয়ার্কার্স ক্যাম্প’’ চালু করেন। যেখানে কামরম্নদ্দিন আহাম্মদ, অলি আহাম্মদ , মোহাম্মদ তোয়াহা, তসদ্দুক আহম্মদ , তাজউদ্দিন আহম্মদ প্রমুখ এবং কলকাতা কেন্দ্রিক রাজনীতি থেকে আগত খন্দকার মোসতাক আহম্মদ ,শেখ মুজিবর রহমান প্রমুখ নেতৃবৃন্দ সংগঠিত হতে শুরম্ন করেন। এদিকে পূর্ব পাকিসত্মানে বাংলার পরিবর্তে উর্দু কে রাষ্ট্রভাষা করার সরকারি সিদ্ধামেত্মর বিরম্নদ্ধে মানুষ সোচ্চার হতে থাকে। গঠিত হয় ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’। শামসুল হক এখানে সক্রিয় ভূমিকা রেখে চলেন। ১৯৪৮ সালের মার্চে ভাষার প্রশ্নে চারদিনও কারাবরন করেন তিনি। ২১ মার্চ ১৯৪৮ রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানের গর্ভনর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তার ভাষনের এক পর্যায়ে ‘উর্দু এন্ড অনলি উর্দু শ্যাল বি দ্যা স্টেট ল্যাঙ্গুয়েজ অব পাকিস্তান’ বলে ঘোষনা দেন। জিন্নাহর মুখেরকথা শেষ হবার সাথে সাথে শামসুল হক ‘নো’, ‘নো’বলে চিৎকার করে দাঁড়িয়ে পড়লেতার সাথে সাথে আরো অনেকে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেন। ঐ-দিন সন্ধ্যা ৬.৩০ মিনিটেজিন্নাহ’র সাথে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধিদের সাক্ষাৎকালে শামসুল হকবলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। শামসুল হকের বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষেযুক্তি তর্কে জিন্নাহ রাগান্বিত স্বরে শামসুল হককে উদ্দেশ্য করে বলেন, You are the man who always create trouble. I remember that you created trouble convention also along with Moulana Hasrat Moulana Abdul Hamid Khan Bhashasni and Abul Hashim?। তাছাড়া সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কমিটির সাথে মি. জিন্নাহর যে বৈঠক হয় সেখানেও শামসুল হক ভাষার প্রশ্নে তার সাথে মতবিরোধে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪৯ সালে প্রথম পূর্ব ও পশ্চিম পাকিসত্মানে ৩৫ আসনের মধ্যে একটি টাঙ্গাইল মহকুমার দক্ষিনের মুসলিম আসনের উপনির্বাচনে মওলানা ভাসানি বিজয়ী হলে তা বাতিল করা হয়। ২৬ শে এপ্রিল পুনরায় উপনির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষনা হলে প্রার্থী হন শামসুল হক। তার নিজের এলাকা কিন্তু তিনি সহায় সম্বল হীন। ওয়ার্কার্স ক্যাম্প নেতৃবৃন্দের বিপুল উৎসাহ , উদ্দিপনা ও সহযোগিতা পেলেন। বিপরীতে মুসলিম লীগের প্রার্থী করটিয়ার বিখ্যাত জমিদার পুত্র খুররম খান পন্নী। তার পিছনে মন্ত্রিবর্গ সহ নুরম্নল আমিনের সরকার। এরপরও শামসুল হক বিজয় ছিনিয়ে আনেন। কিন্তু বিধি বাম এবারও চক্রামত্ম করে নির্বাচনের ফল বাতিল করা হয়। এর ফলে রাষ্ট্র পরিচালনায় নানা ব্যর্থতা ও অযোগ্যতা তুলে ধরতে শামসুল হক নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠনে সর্বাত্নক প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। একে একে যোগাযোগ করেন শেরে বাংলা , হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বগুড়ার মোহাম্মদ আলী প্রমুখের সঙ্গে। তাদের কোন সাড়া না পেয়ে আসামের কারাগারে বন্দি মওলানা ভাসানীর সাথে যোগাযোগ করেন। এক পর্যায়ে মওলানা ভাসানী কারামুক্ত হয়ে ঢাকায় ফিরলে ২৩ ও ২৪ জুন (১৯৪৯) এক সম্মেলন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’। মওলানা ভাসানী হলেন সভাপতি, শামসুল হক সাধারন সম্পাদক, আর যুগ্ন সাধারন সম্পাদক করা হয় খন্দকার মোশতাক ও শেখ মুজিবকে। শামসুল হকের নেতৃত্বে অতি দ্রম্নত আওয়ামী মুসলিম লীগ বিরোধী দল হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে থাকে। ১১ অক্টোবর (১৯৪৯) পাকিসত্মানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান , পূর্ব পাকিসত্মান সফরে আসলে দেশের দূরবস্থা ও খাদ্য সংকটের প্রতিবাদে আওয়ামী মুসলিম লীগ একটি জনসভা ও বিক্ষাভের আয়োজন করে। বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের সাথে গোলযোগ দেখা দিলে মওলানা ভাসানী , শামসুল হক সহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে নুরম্নল আমিনের সরকার । তাদের কারাগারে প্রেরণ করে। ১৯৫১ সালের মার্চ মাসে শামসুল হক মুক্তি পান। দীর্ঘ সময় কারাভোগের পর তিনি ধর্মকর্ম ও পরিবারের প্রতি মনোযোগী হন। একই সাথে দলের কার্যক্রম সুচারম্ন ভাবে চালিয়ে যেতে থাকেন। কিন্তু সুবিধাবাদী অনেকে তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে তাকে সংগোপনে দলের নেতৃত্ব থেকে অপসারনের প্রস্ত্ততি নিতে শুরম্ন করে। এক সময় ক্রমশ ঝিমিয়ে পড়া ভাষা আন্দোলনের জোয়ার জেগে উঠে। ১৯৫১ সালের মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্র ভাষা কমিটি কমিটি গঠিত হয়। আর ১৯৫২ সালে ৩১ শে জানুয়ারি গঠিত হয় ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’। ২১ শে ফেব্রম্নয়ারি পূর্ব পাকিসত্মানের সর্বত্র সাধারন ধর্মঘট পালনের সিদ্ধামত্ম নেয়া হয়। ২০ ফেব্রম্নয়ারি সন্ধ্যা থেকেই নুরুল আমিন সরকার ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। ভাষা সংগ্রাম পরিষদের এক সভায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষ বিপক্ষ মতানৈক্য দেখা দিলে ( বিপক্ষ সদস্যদের মতামত উপেক্ষিত হওয়ায়) শামসুল হকের প্রসত্মাব অনুসারে তা ভোটে দিলে বিপক্ষের মতামত ১১:৪ ভোটে পাস হয়। তা সত্ত্বেও অলি আহাদ, আব্দুল মতিন, শামসুল আলম ও গোলাম মওলা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষ দৃঢ় অবস্থান নেয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ২১ ফেব্রম্নয়ারি পুলিশের গুলিতে কয়েকজন শহীদ হন। শামসুল হক ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দের ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার যুক্তি ছিল-‘‘ ভাষা আন্দোলন যে পর্যায়ে উপনীত হয়েছে তাতে শামিত্মপূর্ণ উপায়ে আন্দোলন চালানো বাঞ্চনীয়, যেহেতু সরকার বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবেলায় কারোরই কোন সাংগঠনিক শক্তি বা প্রস্ত্ততি নেই। তাছাড়া পরবর্তি বছরই সাধারন নির্বাচন হওয়ার কথা, এ কারনে এ আন্দোলনকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনে জয় লাভের মাধ্যমে বাংলাকে দেশের রাষ্ট্রভাষা করা আমাদের জন্য সহজ হবে।’’ এতদ্বসত্ত্বেও শামসুল হক ২১ ফেব্রম্নয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সকাল থেকে দুপুর পর্যমত্ম ছাত্র নেতৃবৃন্দের সাথে বিভিন্ন সলাপরামর্শ ও বক্তৃতা করা ছাড়াও এক পর্যায়ে তাদের অবস্থানের প্রতি ব্যক্তিগত ভাবে সহমত পোষন করেন। পুলিশের গুলিবর্ষনেও তিনি পিছপা হননি। বিকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে আহত ছাত্রদের সেবা শুশ্রম্নষায় এগিয়ে আসেন। এরপর থেকেই বোঝা যায় রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে শামসুল হকের অবদান অতুলনীয়, অপরিসীম এবং অবিস্মরনীয়। ১৯৪৯ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর শামসুল হক আফিয়া খাতুনের সঙ্গে (ইডেন কলেজের ইংরেজি শিক্ষিকা,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব পরিচিতা) বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ৯ই এপ্রিল ১৯৫১ সালে তাদের প্রথম কন্যা উম্মে বতুল তাজমা তাহেরা (শাহীন)এবং ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৫২ সালে দ্বিতীয় কন্যা উম্মে বতুল ফাতেমা জহুরা (সায়কা) জন্মগ্রহন করেন। বর্তমানে তার কন্যাদ্বয় পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে আমেরিকায় প্রবাস জীবন যাপন করছেন। আবার ভাষা আন্দোলনের জন্য ১৯-০৩-১৯৫২ সালে কারাবরন করলেন শামসুল হক। ১৯৫৩ এর ১৩ ফেব্রম্নয়ারি কারাবরন হতে মুক্তি পেলেন তিনি। জেল গেটের বাইরে হাজার হাজার মানুষ তার অপেক্ষায় ছিলেন। তাকে দেখে জনগন আনন্দে করতালি ও শেস্নাগান করলেন। তিনি স্বভাব সুলভ ভঙ্গিতে স্মিত হাস্যে হাত নেড়ে অভিনন্দন জানালেন। পরবর্তিতে সেখান থেকে সে সরাসরি ঢাকার শ্বশুরালয়ে যান । সেখানে গিয়ে দেখতে পান তার স্ত্রী ও সমত্মানরা দেশ ত্যাগ করে নিউজিল্যান্ড চলে গেছেন। এ বিষয় নিয়ে তার শ্বশুর বাড়ীর লোকজনদের সাথে তার তর্ক বিতর্ক হয়। এক পর্যায়ে শামসুল হক হালকা রকমের আহত হন। এরপর ধীরে ধীরে পারিবারিক ও ব্যক্তিগত ভাবে নিঃসঙ্গ ও একাকী হয়ে পড়েন আর রাজনৈতিক ভাবে হন অবহেলার শিকার। এ সময় প্রবল মানসিক যন্ত্রনা ও বিরহ ব্যাথায় পৃথিবীর বস্ত্ত জগতের ও স্বাভাবিক জীবন প্রবাহ থেকে ছিটকে পড়েন তিনি। শুরম্ন হয় তার উদ্ভট ও ভাবলেশহীন জীবন যাপন। জীবনের শেষবেলা কাটে হাটে-ঘাটে-মাঠে, নদীতে ও নৌকায়। দূর্ভাগ্যবশত ১৯৬৫ সালে তৎকালিন পূর্ব পাকিসত্মানে একদিকে আয়ুব খানের সামরিক শাসন, পাক ভারত যুদ্ধ, অন্যদিকে রাজনীতি বন্ধ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের বিরম্নদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। ঐ সময় শামসুল হক সব কিছু হারিয়ে মনে মনে নানা প্রকার বিচ্ছেদ, যন্ত্রনা, অসহায়ত্ব, ভগ্ন রোগাক্রামত্ম স্বাস্থ্য নিয়ে অসুস্থ অবস্থায় তৎকালিন টাঙ্গাইল মহকুমার কালিহাতি থানার দূর্গাপুর ইউনিয়নের জোগারচড় এলাকার কদিমহামজানি গ্রামের শামসুল হকের সুপরিচিত স্বদেশী আন্দোলনের কংগ্রেস নেতা মৌলভি মহির উদ্দিন আনসারি সাহেবের বাড়িতে আশ্রয় নেন। তাকে কংগ্রেস নেতার ছেলেরা স্থানীয় ডাক্তার দ্বারা বেশ কিছু দিন চিকিৎসা করান। চিকিৎসা চলাকালিন অবস্থায় শামসুল হক সাহেব ১৯৬৫ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। ঐ সময়ের তাগিদে কংগ্রেস নেতার ছেলেরা সমাজের কিছু সংখ্যক লোক নিয়ে কদিমহামজানি গ্রামের স্থানীয় কবরস্থানে শামসুল হক সাহেবকে দাফন করেন। শামসুল হকের মৃত্যুর আগ মুহূর্ত হইতে প্রায় এক যুগ কেটেছিল দেশের মানুষের সামনে অচেনা, অজানা, অকাতর ,অবহেলা ও অসহায় অবস্থায়। অবশেষে তাহার মৃত্যু হয় পরিবার ও আত্নীয় স্বজনের অগোচরে এবং দেশবাসীর অজামেত্ম। এরপর ২০০৭ সালে ঐ গ্রামের ডাঃ আনছার আলী তালুকদার সহ যারা দাফন করার সময় উপস্থিত ছিলেন। তারা শামসুল হকের অনুসারি ডাঃ সাইফুল ইসলাম স্বপন, তৃনমূল নেতা কৃষক আব্দুল গফুর বেপারী এবং স্যাটেলাইট চ্যানেল এনটিভি ও দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার টাঙ্গাইল প্রতিনিধি সাংবাদিক মহববত হোসেন সহ অন্যান্য ব্যক্তিবর্গের নিকট শামসুল হকের মৃত্যুর বিস্তারিত কাহিনী খুলে বলেন এবং তার কবরটি চিহ্নিত করে দেখান। সেই অনুসারে শামসুল হকের জন্মভূমি দেওলি ইউনিয়ন সেই ইউনিয়নের তার অনুসারি ও ভক্ত তৃনমূল নেতা কৃষক আব্দুল গফুর বেপারী, ডাঃ সাইফুল ইসলাম স্বপন সহ অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ শামসুল হকের কবরটি ইট দ্বারা বাধিয়া রেখেছেন। শামসুল হকের ‘বৈপ্লবিক দৃষ্টিতে ইসলাম’ মুসলমানদের জন্য সুসমন্বিত জীবন ব্যবস্থাকল্পে অনুপম ভাষায় রচিত একটি অনবদ্য বই। মোট কথা তার লেখা একমাত্র ‘বৈপ্লবিক দৃষ্টিতে ইসলাম’ বইখানি ছাড়া দ্বিতীয় কোন বই-ই আজ আর বর্তমানে নেই। এ বইটি ইসলামী ফাউন্ডেশন ১৯৮৭ সালে তৃতীয় সংস্করন প্রকাশ করেছে। (শামসুল হকের সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্ত, ইতিহাস ও তথ্য সংগ্রহকারী তৃনমূল নেতা কৃষক আব্দুল গফুর বেপারী, গ্রাম: বাবুপুর, উপজেলা: দেলদুয়ার, জেলা: টাঙ্গাইল।)

About Kabir Hossain

Check Also

গজনবী, স্যার আবদুল করিম

গজনবী, স্যার আবদুল করিম (১৮৭২-১৯৩৯) একজন পর্যটক, অবিভক্ত বাংলার মন্ত্রী, বঙ্গীয় শাসন পরিষদের (Bengal Governor’s …