Home / মনের জানালা / ধূসর প্রেমের প্রথম চিঠি

ধূসর প্রেমের প্রথম চিঠি

love-03” আমি কমল, পুরো নাম শ্রী কমল ব্যানার্জী”। এই ভাবেই পরিচয় হলো হাওড়া স্টেশনের প্রকান্ড আমগাছের নীচে বসে থাকা কমল বাবুর সাথে। অনিচ্ছা সত্যেও ঘাঁর বাঁকিয়ে, হাত বাড়িয়ে দেয়া লোকটার মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে নিলাম একবার। মাথায় বাদুরে টুপি। গলায় ঝুলছে ভারী উলের লম্বা মাফলার। ধবধবে সাদা ধূতির সাথে হাল্কা বাদামী রং এর পাঞ্জাবী। কুনুই এর কাছে কিছুটা ছিড়ে যাওয়া কালো কোট দিয়ে ঢেকে রেখেছেন জীবনের ভারে নুয়ে পরা দেহটা। বয়সের ভারে মানুষ যতটা নুয়ে পড়ে জীবনের ভারে বুঝি তার চেয়েও বেশী। তবু, দেখতে বেশ পরিপাটি ভদ্রলোক। কিছু কিছু ফুল যেমন তার নিজ রূপেই উদ্ভাসিত করে নিজের সৌ্ন্দ্রয্য, তেমনি কিছু কিছু মানূষও চেহারার সৌন্দর্য্যকে উদ্ভাসিত করে তোলে মনের সৌন্দর্য্য দিয়ে। পঞ্চাশোর্ধ বয়সের এই বৃ্দ্বকে না দেখলে, তা বোধ হয় বিশ্বাস করা হত না। চশমার ভারী গ্লাসের ফাঁক দিয়ে, স্বচ্ছ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন তিনি। চোখে মুখে লেগে আছে এক অমায়িক স্নিগ্ধতার হাসি। দুরের মানুষকে কাছে টানার, অপরিচিতকে আপন করে নেয়ার এক মায়াবী আমন্ত্রন লুকিয়ে আছে সেই হাসির ভিতর। আমার মত বয়সের তুলনায় অতিরিক্ত ধীরস্থীর ও সহজেই সবকিছুকে এড়িয়ে চলার মত একজন যুবকও, সেই আমন্ত্রনের হাতছানি এড়িয়ে যেতে পারলো না। আমি তার চোখে চোখ রেখে মৃদু হেসে মাথা দুলাতেই ভদ্রলোক নিজের পরিচয় দিয়ে জানতে চাইলেন,
-তা বাবুর নামটা যেনো কি? ওপাড় থেকে আসা হলো বুঝি?
-আমার নাম আদ্রি, আদ্রি রহমান। হ্যাঁ আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি, কিন্তু আপনি তা কি করে বুঝলেন?
-সে তুমি বুঝবে না বাপু। বুঝলে হে। বয়স, বয়স হলে অনেক কিছু এমনিতেই বুঝে নেওয়া যায়, হেহেহে।
বলেই, ভদ্রলোক আপন মনে হাসতে লাগলেন। অবাক হয়ে খেয়াল করলাম অসম্ভব সুন্দর করে হাসেন কমল বাবু। এই বয়সে শ্মশ্রূশোভিত মুখের এমন সচ্ছ হাসি, যৌবনে কত মেয়েকে কাঁদিয়েছে কে জানে? তার বাদামী রঙ এর লম্বাটে চেহারার কপাল জুড়ে বসে আছে, উড়ন্ত ঈগলের ডানার মত কাঁচা-পাকা রঙের এক যুগল জোড়া ভ্রু। সেই ভ্রুর নীচে কোনো এক চাঁপা বেদনার ঢেউ-এ আন্দলিত উজ্জল তারার মত দুটি চোখ, ।

রিতার মুখে অনেক বার শুনেছি, জোড়া ভ্রু-ওয়ালা ছেলেরা নাকি অনেক বউ আদুরে হয়। কি জানি হবে হয়তো! অনেকক্ষন ধরে চুপচাপ বসে আছি, কিন্তু কমল বাবু অনর্গল কথা বলে যাচ্ছেন। কিছুই মনযোগ দিয়ে শোনা হয়নি আমার। শুধু মাঝে মধ্যে হ্যা হু করে মিথ্যা শোনার ভান করছি।যেমনটি আজ কাল রিতার সাথে প্রায় করি। রিতা আমার ক্লাশ ফ্রেন্ড অবশ্য শুধু ক্লাশ ফ্রেন্ডই নয়, তার চেয়েও একটু বেশী। আমার মা-বাবা মনে মনে ঠিক করে রেখেছেন, বি কম টা ফাইনাল দিলেই রিতাকে বউ করে ঘরে তুলে নিয়া আসবেন।

রিতাও বোধ হয় সে কথা জ়ানে। তার চোখমুখের মিস্টি ঈশারায় তা স্পস্ট বুঝা যায়। আগত সংসারের ভবিষত স্বপ্নে বিভোর রিতা, সারাক্ষন আমার পাশে পাশে থাকে। প্রতিদিন কলেজে আসার সময় নিত্যনতুন কিছু না কিছু রান্না করে নিয়ে আসে। লাঞ্চ আওয়ারে পাশে বসে নিজ হাতে আমার মুখে তুলে দিয়ে মুচকি হেসে বলে, ‘ জানো? এইটা আজ আমি রান্না করেছি, কেমন হয়েছে বলোতো?’ -যদিও জানি এসবের কিছুই সে রাঁধেনি, বাসায় গেলেই খালাম্মার কাছে তার প্রমান পাওয়া যাবে। রিতা তখন তার মা’কে বলবে ”এই পৃথিবীতে তোমার মত মা আমি দ্বীতিয়টি দেখিনি। যার কিনা পরের ছেলের কাছে নিজের মেয়ের বদনাম করতে একটুও দিদ্বা করে না”। খালাম্মা মৃদু হেসে বলবেন ” শোনো মেয়ের কথা, তুই পরের ছেলে বলছিস কাকে? আদ্রি’তো আমার ছেলের মত, ও পরের ছেলে হতে যাবে কোন দুঃখে!” রিতা তখন দরজার মেরুন রং’এর পর্দাটা সরিয়ে চা’এর ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকবে। পাশে বসে এক কাপ চা বানিয়ে আমার হাতে তুলে দিতে দিতে বলবে “ এই নাও, এইটা আর অন্য কেউ বানায়নি, আমি নিজ হাতে তোমার পাশে বসে বানিয়ে দিলাম। এইবার বিশ্বাস হলতো? যে চা বানাতে পারে সে রান্নাও করতে জানে”।

সেই রিতাকে আজকাল তেমন আর ভালো লাগে না। তার সঙ্গ এখন মনে হয় পোকায় ধরা মিস্টি আমের মত। কেমন যেনো বিরক্তিকর লাগে সব কিছু। ঠিক বুঝাতে পারবো না কাউকে। প্রতিদিনই একান্তে লুকানো ভালো না লাগার কথা, কাউকেই বলতে পারছি না। তাই একাই ভোগ করি বেদনার সব বোঝাপরা আর একাকী বাঁশীর কস্টরাগ। যে রিতার চুড়ির রিনিঝিনি শব্দ ছাড়া আমার ঘুম ভাংগে না, যে রিতার উরন্ত চুলের ঢেউ’এ পাল তোলে আমার স্বপ্ন ঢিংগা, সেই পাল’এ ধীরে ধীরে লেগেছে এক ঘেয়েমির হাওয়া। অবাকের শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে ক্লান্ত আমি, ভাবনার হাওয়ায় নিজমনে আঁকিবুঁকি করি বিধাতার দেওয়া ভাগ্যলিপি। তবে কি প্রেম, প্রীতি, ভালবাসা সব কিছু ক্ষনিকের মোহ? এত মধুর প্রেমও কি সময়ের দীর্ঘতায় পানশে হয়ে যায়? মধুর ঘনত্ব হারাতে হারাতে হয়ে যায় একেবার তরল? এখন জীবনের খর স্রোতে উচ্ছল জলের রেখায় চলাচল করে কেবল মৃতমাছের ঝাঁক। আহ, সব কিছু কি অদ্ভুত শুন্য শুন্য লাগে। তাহলে সবটাই কি সামসুল হকের সেই কবিতার মত ? “মানুষ এমন তয়, একবার পাইবার পর নিতান্ত মাটির মনে হয়, সোনার মোহর”!

হঠাত করেই কমল বাবুর ডাকে হ্যাঁচকা টান লাগে এলোমেলো ভাবনার জালে।
-কি হে, এতক্ষন ধরে ডাকাডাকি করেও কোনো জবাব পাচ্ছিলুম না যে? তা বাপু কি এমন ভাবছো বলো দেখি শুনি?
“না না, তেমন কিছু না” বলেই আমি কথা ঘুরাতে পালটা প্রশ্ন করলাম,

-আচ্ছা কমল বাবু, একটি কথা জিজ্ঞাস করবো? যতোটুকু দেখতে পাচ্ছি আপনার শরীর খুব একটা বেশি ভালো নেই, তবু আপনি বাহিরে এই ঠান্ডা বাতাসে বসে আছেন কেনো?
-হা হা হা এই কথা? আমিতো ভাবলুম কি না কি জানতে চাইবে হে। শোনো তাহলে, এক সময় আমারও ঘরের ভিতর নিজেকে গুটিয়ে রাখতে ভালো লাগতো, বুঝলে? ছোট বেলা থেকেই খুব ঘরমুখো ছিলুম, কলেজ থেকে ফিরে এসে সোজা উঠে যেতুম দো’তালার চিলেকোঠায়। সেখানেই গান শিখা, লেখা পড়া ও খাওয়া দাওয়া সেরে ল-ম্বা ঘুম। চিলেকোঠার জানালা দিয়ে নীলাকাশের সাদা মেঘের ভেলায়, উড়ে উড়ে পূব থেকে পশ্চীমে চলে যেত আমার এক একটি দিন। আ-হা, ভাবনা হীন দু’চোখে স্বপ্ন ভরা সেই যে আমার নানান রঙের দিন গুলো। কিন্তু কুরচি, বুঝলে? কুরচি। হঠাত করে কোথা থেকে এই মেয়েটি এসে, আমাকে আমার ভিতর থেকে এমন ভাবে টেনে বের করলো যে, জীবনে আর কোনোদিন ঘর মুখো হতে পারলুম না।

কোটের পকেট থেকে উটের হাড় দিয়ে বানানো একটি ছোট্ট লম্বা বাক্স ও রূপার তৈরী মাঝারি সাইজের একটি তামাকদানী বের করে, কমল বাবু তামাক সাজাতে সাজাতে আত্ম প্রলাপের মত কথা গুলো বলে গেলেন। আমি তেমন কিছু বুঝতে না পারলেও এতটুকু বুঝলাম, কোনো এক কুরচি দেবীকে হৃদয়ের মাঝে প্রেমের চাদর বিছায়ে স্বযতনে লালন করে বেড়াচ্ছেন এই বৃদ্ধ। তারসাথে আরও বুঝলাম, বড়ই স্টাইলিস্ট, বড়ই সৌখিন ধরনের ধুমপায়ী এই কমল বাবু। তিনি যখন উটের হাড়ের ছোট্ট লম্বা খাপ থেকে কালো চকচকে বাঁকা পাইপটি বের করে ঠোঁটের কোণে ঝুলিয়ে দিয়ে মনের আনন্দে টানছেন। আমি তখন অবাক হয়ে দেখছি, কেমন করে তামাকের মনোমুগ্ধকর খুশবু চারিদিগের বাতাসকে মাতোয়ারা করে দিয়ে আমাকে নিয়ে যাচ্ছে স্বপনীল ঘোরে। আমি কখনো ধুমপান করিনি, কিন্তু আজ কমল বাবুকে দেখে ‘জীবনে একবার হলেও এই তামাক খেয়ে দেখব” বলে, মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম। এ’কথা সে’কথার পর জানতে চাইলাম,

-কমল বাবু, তামাকের যে এত রোমান্টিক ঘ্রাণ থাকে তা আমি জানতাম না। এই তামাকটার নামটা কি আমাকে একটু বলবেন? তাছাড়া, আপনার পাইপটিও খুব সুন্দর। কত দিয়ে কিনেছিলেন ঐ টি?

-তামাকটির নাম এ্যারোমেটি ম্যাগনোলিয়া। ভারতের লৌক্ষ্ণ ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যায় না হে। আর পাইপটির কথা বলছো? সেতো বলতে পারবো না বাপু। তবে হে, আজ থেকে তেঁতত্রিশ বছর আগে আমার একুশতম জন্মদিনে কুরচি এটি কিনে দিয়েছিলো। তা এখনো মনে আছে।
-বলেন কি কমল বাবু? তেতঁত্রিশ বছর আগের জিনিস এখনো আপনি এত যত্ন করে রেখে দিয়েছেন? আর এই কুরচিদেবী’টি কে? একটু বলবেন? আমি খেয়াল করছি যখনই আপনি উনার কথা বলেন, তখনই আপনার চোখ দুটো কেমন ছল ছল করে উঠে, কেনো বলুনতো?

কমল বাবু গলায় মাফলারটা আরো ভালো করে পেচিয়ে, হাতে ধরা পাইপটি ঠোঁটে ঝুলিয়ে কয়েকটা টান দিয়ে কাশতে কাশতে ভেসে গেলেন তার পুরাতনী যৌবনের দেশে,
-সে অনেকদিন আগের কথা হে। আমি তখন সবে মাত্র কলকাতা শহর থেকে অজপাড়াগা’এ পিসি’র বাড়িতে এসে উঠেছিলুম। তারপর, সেখানকার শ্রী ধর্মেন্দ্রনাথ কলেজে ইন্টারে ভর্তি হলুম।
-কেনো? মানুষতো গ্রাম থেকে শহরে পড়তে যায়। আপনি শহর ছেড়ে একেবার গ্রামে চলে গেলেন কেনো?
-কলকাতার ছোকরাদের সাথে মিশে আমার নাকি লেখাপড়া গোল্লায় যাচ্ছিল। তাই এন্ট্রাস পাশ করার পর বাবা ও দাদা ঠাকুর অনেকটা জোর করেই, আমাকে পিসিমার বাড়িতে পাঠিয়ে দিলেন। আমিও তেমন কিছু বলিনি। দূঁরে চলে গেলে অন্তত আর যাই হোক, সব সময় তাদের রক্তচক্ষু করা শাসন মানতে হবে না ভেবে রাজি হয়ে গেলুম।
-তারপর?
-তারপর, অনেকদিন পরের কথা। আমি তখন সবে মাত্র ইন্টারপাশ দিয়ে বি,এ, ভর্তি হয়েছি। পিসিমার বাড়ির দোতালার চিলেকোঠা থেকে শুরু করে কলেজের সাংস্কৃতি সন্ধায় আমার জীবনের সমস্ত হিসাব নিকাশ। বাড়ি থেকে মায়ের চিঠি আসে “কমল, পুজোর ছুটিতে একবার বাটি’তে এসো। তোমার জন্য পাত্রী দেখেছি, পাত্রী’ত নয় সাক্ষাত স্বরসতী”। ধুম্রছায়ার মত ঘোরপাক খেতে খেতে কুন্ডলী বাঁধে স্বপ্নের অপ্সরা, রাজত্ববিহীন ভাবনাহীন রাজত্ব আমার। লাগামহীন সুখের পিঠে আমি যখন সাওয়ার ঠিক তখনি, হঠাত একদিন কলেজের করিডোরে আমার একমাত্র বন্ধু জয়দেব পরিচয় করে দিলো কুরচি দেবীর সাথে।

-এই যে কমল, আমি তোকেই খুচ্ছিলুম। লাইব্রেরী, কৃষ্ণতলায় কোথাও পেলুমনা। কোথায় থাকিস বলতো?

-কেনো রে ? কি হয়ছে ?

-যাকগে, বাদ দে। যে জন্যি খুচ্ছিলুম। এদিকে আস পরিচয় করিয়ে দেই। এই হলো আমাদের ডিপার্টমেন্টের সবচেয়ে ভাল ছাত্রী কুরচি। যার কথা অনেকবার তোকে বলেছি, আর কুরচি এ হলো্‌…….

-থাক থাক তোকে আর পরিচয় করিয়ে দিতে হবে না। নিজের পরিচয় অন্যের মুখে শুনতে ভাল লাগে না। আমি নিজেই পরিচয় হয়ে নিচ্ছি। নমস্কার, আমি কমল ব্যানার্জী। বাংলা ডিপার্টমেন্টে আছি। আপনার কথা অনেক শুনেছি জয়দেবের মুখে। আজ দেখার সৌভাগ্য হলো। চলুন না কোথাও বসে কথা বলি।

কুরচি দেবী কিছু বলার আগেই জয়দেব বলে ফেললো,

-হ্যাঁ, তাই চল। আমাদের এখন কোনো ক্লাশ নেই, কৃ্ষ্ণতলায় বসে আড্ডা দেওয়া যেতে পারে।

জীবনে অনেক মেয়ে দেখেছি, কিন্তু এমন করে কারো মুখপানে চেয়ে থাকিনি কখনো। কি যেনো ছিলো ঐ মুখ খানিতে! খুব সল্পভাষী ছিল কুরচি দেবী। কিন্তু যখন কথা বলতো, তখন কথার ফাকে ফাকে তার ভাংগা হাসির টুকরো ঝরে পরতো অধর থেকে। সেই হাসির সাথে আমার ছোট্ট পৃথিবীর বড় বড় কস্ট গুলি, মৌ্রি ফুলের মত থোকায় থোকায় ঝরে যেতে লাগলো।

কুরচি জাতে ব্রাহ্মণ, কুলিন ঘরের মেয়ে। দীর্ঘ কেশের কালো গভীর অন্ধকারে তার কাঠালচাঁপা বর্ণের গোলাকার মুখশ্রী, যেনো আফ্রিকার গহীন কয়লার খনিতে এক টুকরো রূপালী হিরক। শাপলার পাপড়ির মত নিলাভ অধরে সব সময় লেগে থাকতো হেমন্তের শিশিরের মত এক বিন্দু সিক্ত হাসি। সেইদিন, মাত্র অল্পকিছুক্ষন আমরা আড্ডা দিয়েছিলুম কৃষ্ণতলায়। কিন্তু সেই অল্প সময়ের মাঝেই আমি বুঝতে পারলুম, জীবনটা শুধু দোতালার চিলেকোঠায় শুয়ে ভাংগা জানালা দিয়ে আকাশ দেখা নয়। জীবনেরও প্রয়োজন জীবন। কুরচি দেবীর প্রথম দর্শনেই আমি পরাণের মাঝে খুঁঝে পেলুম প্রাণ। এমনি করে প্রেম আর প্রাণের ভেলায় কি করে যে ভেসে গেল দুটি বছর বুঝতে পারলুম না। বি, এ, ফাইনাল হয়ে গেল। কথা ছিল পরিক্ষার পর কলেজ ট্যুরে আগ্রা যাওয়া হবে। এক এক করে সবাই এসে জমা হলো কৃ্ষ্ণতলায় কিন্তু অনেক খুজেও ঈদিতাকে কোথাও পেলুম না। সেদিন আমারও আগ্রায় যাওয়া হলো না। বিষন্ন মনে বাসায় ফিরে গেলুম, কিছুই ভালো লাগছিল না।

-তারপর ?

-আমি সব সময় কলেজ থেকে বাসায় ফিরে সিঁড়ি বেয়ে সোজা দোতালার চিলেকোঠায় উঠে যেতুম। পায়ের আওয়াজ শুনেই পিসিমা ডেকে বলতেন, “কমল এসেছিস বাপ? তুই হাত মুখ ধুয়ে নে আমি জল খাবার পাঠিয়ে দিচ্ছি”। কিন্তু সেই দিন পিসিমার গলার কোনো আওয়াজ পেলুম না। বাড়ীটা কেমন যেন ভুতড়ে হয়ে গেছে। জামা-কাপড় খুলে কলতলা থেকে হাত মুখ ধুয়ে আসতেই খেয়াল করলুম, আমার এগারো বছরের পিসতুতো বোন শেফালী দরজা দিয়ে উঁকি মেরে আমাকে দেখছে। আমি তাকে ডেকে জিজ্ঞাস করলুম, “এই পুঁটলি বাড়িতে কি হয়েছেরে, সবাই এত চুপচাপ কেন? পিসিমা কোথায়?” পুঁটলি কিছু বলার আগেই দরজার বাহির থেকে পিসিমা পুঁটলিকে ধমকে উঠলেন। পিসিমার বকা খেয়ে শেফালী দৌঁড়ে পালাতেই কাপড়ের আচল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে পিসিমা ঘরে এসে বসলেন। তার চোখ মুখ দেখেই স্পস্ট বুঝতে পারলুম, বাড়িতে কোনো এক ভয়ঙ্কর ভুমিকম্প হয়ে গেছে। যার ঝাকুনি হয়তো এক্ষুনি আমার গা’এ এসে লাগবে।

আমি আসন্ন বিপদকে গ্রহন করার জন্যি মনে মনে প্রস্তুত হয়ে জিজ্ঞাস করলুম, “পিসিমা তুমি কি কিছু বলবে?” পিসিমা অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলতে শুরু করলেন, “কমল, অনেক বড় মুখ করে তোর পিসামহাশয় তোকে কলকাতা থেকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু তার সেই বড় মুখ বুঝি আর রইলো না’রে। আজ ব্রাহ্মন বাড়ি থেকে ব্রাহ্মণ’রা এসেছিলেন। তাঁরা তোর পিসাকে অনেক কথা শুনিয়ে গেল, আর বলে গেল তারা শিঘ্রই কুরচির বিয়ে ঠিক করেছেন। তুই যেন এতে কোনো বাঁধা না দিস। তুই যদি আর কোনো দিন কুরচির সাথে যোগাযোগ করার চেস্টা করিস, তাহলে তাঁরা গ্রাম্য বিচারের মাধ্যমে তোর পিসাকে গ্রাম ছাড়া করবে” বলেই পিসিমা আঁচলে মুখ চেপে হু হু করে মরা কান্না শুরু করে দিলেন।

তারপর একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কমল বাবু আবার শুরু করলেন-

সেইদিন পিসিমাকে শান্তনা দেওয়ার মত কোনো কথাই আমার জানা ছিল না। নত মুখে ঘর থেকে বের হয়ে গেলুম। সব বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে যোগাযোগ করে জানতে পারলুম, কুরচিকে ঘরে তালাবন্ধী করে রাখা হয়েছে। তার সাথে কেহই দেখা করতে পারছে না। এর দুইদিন পর হঠাত করে কুরচিদের বাড়ি থেকে ঢাক-ঢোলের আওয়াজ শুনে বুঝতে পারলুম, কুরচির আজ বিয়ে। সেদিন আমি সারারাত তামাক খেয়েছিলুম। কলেজ মাঠের শেষ সীমান্তে কৃষ্ণতলায়, গাব গাছের প্রকান্ড শিকড়ে হেলান দিয়ে আমি যখন তামাক টানতুম, কুরচি তখন আমার হাঠুর উপর মাথা রেখে, আমার খোলা বুকের পশমে আঙুল দিয়ে কি যেনো আঁকিবুকি করতে করতে বলতো, ” আমি যদি কোনোদিন তোমার পাশে না থাকি, তখন তুমি এমনি করে তামাক খাবে। তামাকের মৌ মৌ গন্ধে যখন আকাশ বাতাস ভরে উঠবে, তখন আমি বুঝে নিব তুমি আমাকে ডাকছো। আমি শাঁই শাঁই করে উড়ে পাহাড় পর্বত ভেংগে তোমার কাছে চলে আসব।”- সেই থেকে আজো অবধি প্রতিক্ষায় আছি, কিন্তু কুরচি আর কোনোদিন ফিরে আসলো না।
-আপনি কি তার সাথে দেখা করার চেস্টা করেননি?

-না করিনি। আমার জন্যে আমার সহজ সরল পিসা মশায়কে গ্রাম ছাড়া হতে হোক, তা আমি কখনো চাইনি। তাই দোতালার সেই চিলেকোঠায় দরজা লাগিয়ে, কুরচির বিয়ের পুরো তিনদিনের বেদনাকে আমি একা একাই উপভোগ করেছিলুম। সক্রেটিসের বিষের পেয়ালায় আকন্ঠ নীম্মজিত আমি, সমাজের গভীরে ডুব দিয়ে তুলে এনেছিলুম বৈষম্মের রক্তকরবী। যেদিন বিয়ের অনুস্ঠান শেষ করে কুরচি স্বামীর হাত ধরে শশুর বাড়িতে চলে গেল। সেদিন আমিও তাঁর স্মৃতির আঁচল গলায় বেঁধে চিরজীবনের জন্যে ঐ গ্রাম ছেড়ে দিলুম।

তারপর অনেকদিন এখানে সেখানে ঘুরে বেড়িয়েছি উদ্দেশ্য বিহীন। কিন্তু বাপু, এভাবে আর চলছিলো না, বুঝলে। হাতের পয়সাকড়ি যা কিছু ছিলো তামাকের ধুয়ার সাথেই উড়েগেল। তাই অনেক চেস্টা করে রেলওয়েতে সহকারী স্টেশন মাস্টারের একটি চাকুরী নিলুম। মহাদেবগঞ্জ স্টেশনে প্রথম পোস্টিং। সেখান থেকে ভাট ফুলের মত ভাসতে ভাসতে ত্রিশ বছরে অনেক জায়গা ঘুরে এই হাওড়া স্টেশনে আসলুম।

-তার মানে আপনি এখন এই হাওড়া স্টেশনের কর্তা বাবু? তাহলে বাইরে এই গাছতলায় বসে আছেন কেনো? না না কমল বাবু, এটা ঠিক নয়। চলুন আপনার অফিসে গিয়ে বসি, সেখানে এক কাপ চা খাওয়াবেন নিশ্চয়?
-না আদ্রি বাবু, ঐটা এখন আর আমার অফিস নেই। আজ দুইদিন হলো সেখানে এখন নতুন মাস্টার সাহেব এসেছেন, ঠাকুর নির্মল রায়।
বলেই কমল বাবু তাড়াহুড়ো করে পাশের বেঞ্চিতে রাখা ব্যাগটা নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে চলে যেতে যেতে বললেন,
-আমার আর সময় নেই আদ্রি বাবু। আমাকে এক্ষুনি যেতে হবে, ট্রেন এসে গেছে। আর হে, আমার তামাক আর পাইপটিকে তোমার খুব পছন্দ, তাই না? এই নাও। এই বাক্সটি তোমার কাছে রেখে দাও। আমি এখন কোথায় কি অবস্থায় থাকি তার ঠিক নেই। তাই এগুলো তোমার কাছে রেখে গেলুম। তুমি যত্নে রেখো। এই দেখ কথায় কথায় তোমাকে আবার তুমি করে বলে ফেললাম, তুমি আবার কিছু মনে করো না যেনো।

আমি অবাক হয়ে কমল বাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে এত অল্প সময়ের ভিতর কি করে একটি মানুষ এত অন্তরঙ্গ হয়ে উঠতে পারে, ভাবতে ভাবতেই জিজ্ঞাস করলাম,

-আচ্ছা কমল বাবু, যাবার আগে আরেকটি প্রশ্নের জবাব দিবেন?
-আর কি জানতে চাচ্ছো? বলোতো হে।
-আপনি কি বিয়ে করেছেন?
-না।
-কেনো?
-কুরচির মত যদি আর কেহ তামাকের গন্ধ ভালো না বাসে, তাই।
বলেই হাসতে হাসতে মন্থর গতিতে চলে যাওয়া ট্রেনের হাতল ধরে, কমল বাবু ধীরে ধীরে মুছে যেতে লাগলেন আমার দৃস্টির সীমানা থেকে। ট্রেনের চাকার কর্কশ ঘর্ষনকে ছাপিয়ে আমার কানে ভেসে আসতে থাকে শুধু একটি মাত্র প্রতিধ্বনী, “কুরচির মত যদি আর কেউ তামাকের গন্ধ ভালো না বাসে, যদি ভালো না বাসে, ভালো না বাসে”।

আমার শীতল হাতে নিঃশর্ত নির্জনে কমল বাবুর দিয়ে যাওয়া কারুকার্যপূর্ণ ছোট্ট কাঠের বাক্সটি খুলে দেখি, উটের হাড়ের লম্বা খাপে একটি কালো চকচকে পাইপ। যেনো কোনো একজন বিপন্ন মানুষের বিস্মৃত হৃদয়ের স্বপ্নহীন রাতের দীর্ঘশ্বাস। রূপার কৌটা ভরা কুরচি দেবীর দুঃখ্যমূল্যে কেনা সুসজ্জিত নির্মোহ ভালবাসা। তার নীচে সযত্নে ভাঁজ করে রাখা, কয়েকদিনের আগের লেখা কুরচি দেবীর একটি লেফাফা।

প্রীতিভাজুনেষু শ্রীকমল বাবু,
আপনার চরণ তলে জানাচ্ছি আমর সহস্র কোটি চোখের জলের প্রণতি। আমি জানি না কী করে আপনার কাছে ক্ষমা চাইবো। আমাদের মাঝে যা কিছু ঘটে গেছে তারজন্যে এখন আপনাকে আমার কি লেখা উচিত কিংবা আঁধো কিছু লেখা উচিত কিনা, বুঝতে পারছি না। আমি জানি আপনার সকল কস্ট গুলিকে আমার চোখের জলে ধুয়ে মুছে দেওয়ার মত সাধ্য এই জনমে আর হবে না। তবু লিখছি, না লিখে যে আমার আর কোনো উপায় নেই কমল বাবু।

সকাল থেকেই আপনাকে সুন্দর একটি চিঠি লিখবো বলে ভাবছিলুম। কিন্তু সুন্দর সুখের যা কিছু ইচ্ছা তা দমন করার মধ্যেও বোধহয় এক ধরনের গভীরতর সুখ নিহিত থাকে। থাকে না? কি যে দেখেছিলাম আপনার ঐ মুখটিতে কমল বাবু। এত যুগ ধরে কত মুখইতো দেখলো এই পোড়া চোখ দু’টি। কিন্তু, কিন্তু এমন করে আর কোনো মুখ’এইতো আমার সর্বস্বকে চুম্বুকের মত আকর্ষণ করেনি। ভালো না বাসলেই ভালো……বড় কস্ট গো ভালোবাসায়।

ভালোবাসাতো কাউকে পরিকল্পনা করে বাসা যায় না। ভালোবাসা হয়ে যায়, ঘটে যায়। এই ঘটনার অনেক আগের থেকেই মনের মধ্যে প্রেম পোকা উড়তে থাকে। তারপর হঠাত’ই এক সকালে এই দুঃখ সুখের ব্যাধি দূরারোগ্য ক্যান্সারের মতই ধরা পড়ে। তখন আর কিছুই করার থাকে না। অমোঘ পরিনতির জন্যে অশেষ যন্ত্রনার সংগে শুধু নিরব অপেক্ষা তখন। কেউ যেনো কাউকে ভালো না বাসে। জীবনের সব প্রাপ্তীকে এ যে অপ্রাপ্তীতেই গড়িয়ে দেয়। তারসব কিছুই হঠাত মূল্যহীন হয়ে পরে। হুস থাকলে এমন মূর্খ্যামী কেউ কি করে, বলেন? সে জন্যেই বোধহয়, হুসের মানুষদের কপালে ভালোবাসা জোটে না। যারা হারাবার ভয় করে না কিছুতেই, একমাত্র তাঁরাই ভালোবেসে সব হারাতে পারে। অথবা অন্যদিক দিয়ে দেখলে মনে হয়, যাকিছুই সে পেয়েছিলো বা তাঁর ছিলো, সেই সমস্ত কিছুইকেই অর্থবাহী করে তোলে ভালোবাসা। যে ভালোবাসেনি তাঁর জীবন বৃথা। তবুও বড় কস্ট গো ভালোবাসায়।

আমার বিয়ের আগে আপনার সাথে সম্পর্ক ছিল মাত্র দু’বছরের। বিয়ের পর সেই সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে আপনি হয়ে গেলেন আমার সারা জীবনের। গোবরাবাগ থেকে চলে যাওয়ার পর কোথায় না খুঁজেছি আপনাকে? যখনই সুযোগ পেয়েছি, তখনই ঠাকুর হরিপদ রায়কে সংগে নিয়ে সারা কলকাতা আপনাকে খুঁজে বেড়িয়েছি। খুজে কি আর মানুষ পাওয়া যায়?

ঠাকুর হরিপদ রায়’এর কথা শুনিয়া ভ্রু যুগল নিশ্চয় কিঞ্চিত বাঁকা হইয়া গিয়াছে। অত্যন্ত ভালো গোছের মানুষ ছিলেন এই ঠাকুর হরিপদ রায়। যাহার সহিত সাত পাঁকে পাক খাইয়া ভগবানকে স্বাক্ষী রাখিয়া জীবন মরণ এক সাথে কাটানোর ওয়াদা করেছিলুম। বিবাহের প্রথম রাতেই আমি তাহাকে আপনার কথা খুলিয়া বলিলুম। তিনি আমার কথা শুনিয়া আপনাকে খুঁজিয়া বাহির করিবার ওয়াদা করিলেন। কিন্তু ঠাকুর হরিপদ রায়’এর ওয়াদাতে বোধহয় কিঞ্চিত খুঁত ছিলো। তাহা না হইলে বিবাহের মাত্র তিন বছরের মাথায় নির্মলকে গর্ভে রাখিয়া, তিনি জীবন দুয়ারে কপাট লাগাইবেন কেনো?

সেই হইতেই শ্বশুর বাড়ির ‘ভাতারখাকি’ নাম নিয়া পিতৃকুলের পতিত ভিটায় আস্রয় নিলুম। যে পিতা মহাশয় অনেক গর্ব করিয়া বংশের কুল রাখিতে, ঠাকুর হরিপদ রায়’এর আস্তিনের সাথে আমার আঁচলের গিঁঠ বাঁধিয়া কন্যাদায় হইতে মুক্তি পাইয়াছিলেন, তিনিও বোধহয় আমাকে সাদা কাপড়ে দেখিয়া অকালেই চক্ষু মুঁদিলেন। তখন থেকেই জেঠা মহাশায়ের উচ্ছিস্টে নির্মলকে কোনো মত লেখা পড়া শিখাইয়া মানুষ করিয়াছি। সে এখন বি, কম, পাশ করিয়া ঘরে বসিয়াছে। কিন্তু আমার যে আর চলছে না কমল বাবু। মরা’র আগে উইল করে বাবা কিছু জমি লিখে দিয়ে গেলেও নির্মলকে পড়ালেখা করাতেই তা শেষ হয়ে যায়। এখন সারাদিন জেঠিমার সংসারে ঝি’এর কাজ করিয়া, দিনান্তে ঘরে ফিরে মিলাতে চেস্টা করি জীবনের নস্ট পান্ডুলিপি। বড় কস্ট গো এই জীবন… থাক সে সব কথা। কিন্তু থাকবেই বা কেনো? আপনি ছাড়া যে আমার আপন বলতে আর কেহ নেই গো কমল বাবু। আপনাকে বলবো বলেই স্মৃতির সুকেসে থরে থরে সাজায়ে রেখেছি আমার তেঁতত্রিশ বছরের না বলা সব কথা।

অনেক বছরপর গত পরশু হঠাত করেই, আপনার বন্ধু জয়দেব বসুর সাথে দেখা হইয়া গেলো। তার কাছ থেকেই জানিতে পারলুম, আপনি এখন হাওড়া স্টেশনের বড়কর্তা। তাই কোনো উপায়ন্তর না দেখিয়া, লজ্জা শরমের মাথা খাইয়া নির্মলকে এই পত্র সমেত আপনার কাছে পাঠাইয়া দিলুম। এই ভাবিয়া যে, রেলওয়ে কোম্পানীতে ওর একটি ব্যবস্থা করিয়া দিতে পারিবেন।

আমাকে আপনি ক্ষমা করিয়া দিবেন ঠাকুর। এই ঝাপসা চোখে এক নজর আপনাকে দেখিবার বড় ইচ্ছা থাকিলেও শরীরের সামর্থ্যে কুলাইবে না বলিয়া আসিতে পারলুম না। যদি পারেন একবার দেখা দিয়া তেঁতত্রিশ বছরের তৃষিত এই চোখ দুটিকে ঠান্ডা করিয়া যাইবেন। তাহা না হইলে যে চিতার আগুনেও এই চোখ দুইটি পুড়িবে না গো………

প্রণামান্তে

আপনারকুরচি , ১৫ মাঘ, ১৩৬৬।

চিঠিটি পড়ে আমি কমল বাবুর দেওয়া পাইপটি ঠোটে ঝুলিয়ে, টানতে টানতে ধীর পায়ে স্টেশন মাস্টারের রুমে ঢুকতেই, এক ভদ্রলোক চেঁচিয়ে উঠলেন-
-এই যে মশাই, এখানে ধুমপান নিষেধ। দয়া করে বাহিরে গিয়ে টানুন। উফফ কোথ্যেকে যে আসে……. যত্তসব!
আমি লজ্জায় পাইপটি নিভিয়ে দিয়ে একটু ইতস্তঃত করে জানতে চাইলাম,
-আপনি কি নির্মল বাবু? I mean ঠাকুর নির্মল রায়?
ভদ্রলোক বিরক্তির সুরে ভ্রু কুচঁকে জবাব দিলো,
-দেখুন মশাই, টিকেট নিতে চাইলে বাহিরে গিয়ে কাউন্টারে লাইন দিন। পরিচয় দিয়ে লাইন ছাড়া এখান থেকে টিকেট পাওয়া যায় না, বুঝেছেন?
আমি নতমুখে ঘর থেকে বের হয়ে আসতেই মধ্যবয়সি এক পয়েন্টস ম্যান কাছে এসে জানতে চাইলো,
-বাবু কোথায় যাবেন বলুন তো?
-না কোথাও না। আচ্ছা আপনি কি এখানে কমল ব্যানার্জী নামে কাউকে চিনেন?
-তিনিতো এখানকার বড় কর্তা বাবু ছিলেন হে। কিন্তু এখনতো তিনি এখানে নেই মহাশয়, গত কয়েকদিন আগে তিনি চাকরী ছেড়ে দিয়েছেন।
-কেনো, চাকুরী ছাড়লেন কেনো?
-তাতো বলতে পারলুম না বাবু। তবে শুনেছি নির্মল বাবুর জন্যে অনেক চেস্টা করেও কোনো চাকরীর যোগার করতে না পেরে, তিনি নিজের চাকরী ইস্তফা দিয়ে সেখানে নির্মল বাবুকে আত্মীয় পরিচয় দিয়ে ডুকিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন তিনি অসুস্থ, তার পক্ষে কাজ করা আর সম্ভব নয়। আসলে সব মিথ্যে কথা বুঝলেন হে। কর্তা বাবু যে কেনো এমন করলেন কিছুই বুঝতে পারলুম না।বড় কর্তা..

গঢ় গঢ় করে বলে যাওয়া পয়েন্টস ম্যানের আরো অনেক কথা…… কিছুই শুনতে পায় না আদ্রি। হঠাত করেই সব কিছু বড় এলোমেলো লাগে তার। কিছুক্ষন আগেও শ্রীকমল বাবুর এ্যারোমেটিক ম্যাগনোলিয়া তামাকের কুন্ডুলিকৃত ধোঁয়া যে সুগন্ধি ছড়িয়েছিলো চারিদিকে, সেই ধোঁয়াকে এখন এঁদো কুয়ার মাঝে ভাসমান শুকনো পদ্মের এক ঝাঁঝালো তীক্ত গন্ধের মত লাগে। আদ্রি মিলাতে পারে না কিছুই। কমল বাবু এ কাকে তার জীবনের সব টুকু ঢেলে দিলো? একি শুধুই প্রেমের প্রতিদান? নাকি ভালোবাসার চরণে জীবনের শেষ সম্বলটুকু উপুর করে দিয়ে তৃপ্তির ঢেকুঁর?
কমল বাবুর চলে যাওয়া পথে আদ্রির পাংশুটে চোখে উড়ে অসংখ্য ধূসর মৃত প্রজাপতি। আনন্দ বেদনার সন্ধিক্ষনে দাঁড়িয়ে মিলাতে চায়, পাওয়া না পাওয়ার ভাগফল। মিলে না কিছুই, একাকী বিকেলের রক্তিম আভায় শুধু অবশিস্ট থাকে, সবটুকু সৌন্দর্য্যের কারুকার্য দিয়ে গড়া একটি মুখ। খুব জানতে ইচ্ছে করে, রিতা তুমি কেমন আছো?(সংগৃহীত}

About CheraPata

Check Also

ভাত, কাপড়, ভালবাসা

( ভুমিকায় বলে নেই, গল্পের বক্তা চরিত্রটির মত আমিও নারীবাদি নই।আমি মানি নিয়তি নারী পুরুষ …