Home / মনের জানালা / তুমি আসবে বলে

তুমি আসবে বলে

tumi asbe boleদোয়েল চত্বরের সামনে দাড়িয়ে আছে নিলা।কয়েকদিন ধরেই আসছে এখানে। তেমন গুরুত্বপূর্ণ কোন কাজ না। এখানে মাটির জিনিসের দোকান গুলো তে একটা আয়না পছন্দ হয়েছে তার। নিজের ঘরের জন্য। দামে বনছে না বলে কিনা যাচ্ছে না। দোকানি কিছুতেই আঁটশো টাকার কমে দিবে না। নিলার কাছে আছে ৪০০ টাকা আর ভাংতি কাচিয়ে কুচিয়ে বড়জোর ৪৩৮ বা ৪৪০ টাকা হবে। এর চেয়ে বেশী না। মন খারাপ করে দোকানের সামনে দাড়িয়ে ভাবছে নিলা কি দোষ হতো জিনিসটার দাম একটু কম হলে??? ঘরে নিয়ে টাঙ্গিয়ে দিলে সুন্দর দেখাতো। অন্য কোন অকেশন হলে সমস্যা ছিল না। কিন্তু এটা তো স্পেশালের চেয়েও স্পেশাল অকেশন। আসলে অকেশন না একটা স্বপ্ন নীলার। যাকে এতো দিন ভালোবেসে এসেছে সে আসবে বাসায়। নিলার কাছে সব কিছু স্বপ্ন স্বপ্ন লাগছে। এখনকার যুগে যখন ভালোবাসা লিটনের ফ্ল্যাট এ গিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ছাড়ে সেখানে নীলার বাসায় তার আসা এই পিছিয়ে পরা মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়েদের ভালো থাকার অনেকটুকু কারন যেন।নীলার মা, বোন সবাই অপেক্ষা করে আছে নীলার ভালোবাসার মানুষটি কে দেখার জন্য।

নিলা শেষবারের মতো দোকানে গিয়ে বলল মামা শেষবার বলুন তো সাড়ে চারশো তে দিবেন এটা????
দোকানদারঃ আরে না রে আপা। কাইল তো কইসি এইটা পাঁচশ তেও পারুম না। আপনার জইন্ন একদাম ছয়শ রাখুম যান। দুই দিন ধইরা ঘুরতাসেন বইলা দাম কমাইয়া দিলাম। এই দামে অন্য দোকানে পাইলে আইসা আমারে ঠাডায়া দুইটা চটকনা দিয়াযাইয়েন।
নিলা মুখ কালো করে বলল না মামা থাক। লাগবেনা।

দোকানদার এবার রেগে গিয়ে বলল হুর!! নিবেন নাতো হুদাই এত কথা কওয়াইলেন ক্যান?????
মন খারাপ করে বাসার উদ্দেশে বাসে উঠলো নিলা।কান্না পাচ্ছে তার। আশ্চর্য ও লাগছে। এতো ছোট বিষয়ে কান্না পাওয়ার কিছু নেই। আবেগে লুটোপুটি খাওয়া মেয়ে নিলা না। জীবনের বাস্তবতা খুব ভালো মতই বুঝে। মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে সে। মধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্ত ঘরের মানুষদের মধ্যে একটাই তফাৎ খুঁজে পেয়েছে ,মধ্যবিত্তদের সব শখগুলো পাকে চক্রে পরে কেন যেন বিলাসিতায় পরিনত হয়। আর উচ্চবিত্তদের সব শখ আহ্লাদ গুলাই কেন যেন প্রয়োজনে পরিনত হয়।

যে মেয়ে এত অল্প বয়সে এই সত্য উপলব্ধিকরেছে, এতো অল্প তে তার চোখে পানি মানায় না। তবুও আজ কেন যেন মন নিয়ম মানছে না।বার বার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। কি হতো আরও একটু টাকা থাকলে তার। নিজের ঘরটাকে সুন্দরকরে সাজানো যেত। মানুষটা কি ভাববে এই ঘরদুয়ার দেখলে। ভাবতে ভাবতে বাসায় চলে গেল নিলা।
রাতে খাবার খেতে গিয়ে দেখল ঘরে তেমন সুন্দরপ্লেট নেই ভাতের। প্লেট আছে তবে সেগুলো অনেক আগের আমলের তার মায়ের কিনা। অফিসের সুন্দর প্লেট গুলোর মতো ঝকঝকে সাদা প্লেট থাকলে মন্দ হতো না। রাতে বিছানায় গাএলিয়ে নিলা ভাবল কাল একবার অফিস থেকে ফেরার পথে নিউমার্কেট হয়ে আসবে। ওখানে এধরনের জিনিস পাওয়া যায় অনেক। কে জানে দাম কেমন। হয়তো বা প্লেট ও দামে কুলাবে না। ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়ল নিলা।

আজ ওর আসার দিন। কলিংবেল চাপল কে যেন দরজায়।সেই মানুষ টা এসেছে তাহলে!!! নীলার হাত পা ঝিম ঝিম করছে। সব কেমন যেন স্বপ্নস্বপ্ন লাগছে। মায়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল যদিও পরিচয় করানোর কিছু নেই। মা সব জানেন ওর ব্যাপারে। মানুষটাকে একটু ছুয়ে দেখতে ইচ্ছে করছে তার। কিন্তু মা সামনে থাকার কারনে পারছে না। মা বলল নীলা নিয়াজ কে তোর ঘরে নিয়ে যা। আচ্ছা মা বলেই নিয়াজকে নিজের রুমে আনল। এখন যদি এই মানুষটার হাত ধরে নীলা খুব কি অপরাধ হবে??? ইশ!!!!কিসুন্দর লাগছে তাকে!!!!! ভালোবাসার মুগ্ধতা!! ইচ্ছে করছে গালে গাল ঘসে দিতে। নাকে নাক লাগাতে। হোক বেহায়াপানা, বলুক লোকে মন্দ, মানুষটা তো তারই। তাকিয়েই আছে নীলা নিয়াজের দিকে। নিয়াজ কি বলছে কোন খেয়াল ই নেই তার। এক পর্যায়ে নিয়াজ আলতো করে ধাক্কা দিয়ে বলল নীলা???? কি হয়েছে তোমার???? নীলা সম্বিত ফিরে পেয়ে বলল কই নাতো??? তুমি বোসো তো প্লীজ। দাড়িয়ে থেকো না। খাট ছাড়া বসার জায়গা নেই তার রুমে।বসতে হলে খাটেই বসতে হবে। নীলা বলল তুমি আরাম করে খাটে পা উঠিয়ে বসো। আমি পানি আনছি। পানি এনে দেখে নিয়াজ এক দৃষ্টি তে আয়নাটার দিকে তাকিয়ে আছে। বাহ বেশ সুন্দর আয়নাতো????? একচিলতে হাসি ফুটলো নীলার। কিছুক্ষন বসি তোমার পাশে নিয়াজ??? নিয়াজ অবাক হয়েবলল এটা আবার জিজ্ঞেস করতে হয় নীলা???? তুমি কেমন যেন অদ্ভুত আচরণ করছ আজ। নীলা বলল আসলে এত আনন্দ পেয়ে অভ্যস্ত না আমি তাই সব গুবলেট পাকিয়ে ফেলেছি। গল্প করতে করতেই খাবারের ডাক পড়ল তাদের। ডাইনিং টেবিলে বসে সাদা ঝকঝকে প্লেট এ ধোয়া উঠা সাদাভাত দিতে পেরে আরও একবার তৃপ্তির হাসি হাসল নীলা। কি আরাম করেই না নিয়াজ খাচ্ছে।নীলার চোখে আবারো পানি চলে আসছে। বড় কষ্টে সেই পানি আটকাচ্ছে। নিয়াজ দেখে ফেললে লজ্জা পাবে ও। খাওয়া দাওয়া শেষে নিয়াজ বলল নীলা আমি আসলে একটা কথা বলার জন্য এসেছি তোমার বাসায়। নয়তো এভাবে আসতাম না। বেশ অবাক হলো সে??? কি এমন কথা!! নিয়াজ থেমে থেমে বলা শুরু করলো আসলে যে কথা বলতে এসেছি সেটা হল আমি তোমার বাসায় তোমার দাওয়াতে আসতে পারবো না। তুমি মন খারাপ করো না এটা নিয়ে প্লীজ। নীলা অবাক হয়ে শুনে যাচ্ছে। কিছুই বলছে না। নিয়াজ কি বলছে এগুলা????দাওয়াতে আসতে পারবে না মানে কি???? হি হি করে হেসে দিল নীলা।
হাসছিস কেন নীলা????
কি অদ্ভুত নিয়াজ তাকে তুই করে বলছে কেন????
নীলা??? ও নীলা??? উঠ মা। সকাল হয়েছে তো।অফিসে যেতে হবে না???
চোখ মেলে নীলা অবাক হয়ে গেল???? এটা স্বপ্ন ছিল মানতে নীলার কষ্ট হচ্ছে। একটু সময় নিয়ে ঠিক হয়ে অফিসের উদ্দেশে দৌড় দিল। স্বপ্ন টা ভালো হলেও শেষটুকু নিয়ে চিন্তা হচ্ছে তার। বড় কষ্টে অফিস শেষ করে নিউমার্কেট গেল ও। কি যে সুন্দর সুন্দর জিনিসপত্র!!!! এত সুন্দর কেন সব??? পুরা মার্কেট টাই কিনে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছে নীলার। শেষ মেষ দামাদামি করে ছয়টা প্লেট কিনল। কি যে খুশী লাগছে তার। মাটির আয়নার চেয়ে প্লেট ঢের ভালো হয়েছে। শান্তনা হোক অথবা সত্যি নীলা খুশী এটাই বড় কথা।
রাতে ঘুমাতে ভয় লাগছে ওর। যদি আবারো উদ্ভট স্বপ্ন টা দেখে???? না থাক একটা রাতই তো কষ্ট করে পার করে দেই। ঘুমাব না। কিন্তু যত ঘুম সব আজকে রাতেই আসতে চাইছে যেন। ভোর বেলায় আজানের সময় নিজেকে সজাগ রাখতে পারে না আর। ঘুমিয়ে পরে। সাতটার সময় ধরমরিয়ে জেগে যায়। আজ ঘুমানোর জো কই???? দুনিয়ার কাজ বাকী। অফিস থেকে ছুটি নিয়েছে নীলা। মায়ের রুমে নিজের রুমে ধোয়া চাদর বিছিয়ে দিল। ঘর দুয়র ঝকঝকে তকতকে করে গেল রান্নাঘরে। নিয়াজ কে ফোন দিল কিন্তু ধরল না। সমস্যা নেই। বিজি আছে হয়তোবা। এমন হয়। কাজ শেষে নিজেই ফোন দিবে নিয়াজ। আজ দুপুরেই তো আসবে মানুষটা।খুশী যেন আর তর সইছে না। রান্নাবান্না করতে করতে একটা বেজে গেল। কিন্তু কি ব্যাপার মানুষটা ফোন করলো না যে???? সময় যতই আগাচ্ছে বাড়ছে নীলার অস্থিরতাও। কেন যেন মনেহচ্ছে শেষ মুহূর্তে এসে মানুষটা খেতে পারবে না। নীলার রান্না তার কাছে ভালো লাগবে না। নীলার মা বুঝতে পেরে বলল মারে এত চিন্তা করছিস কেন???? রান্না ভালো হয়েছে তোর। তুই ঘেমে নেয়ে আছিস। যা গোসল করে আয়। নীলা চটজলদি বাথরুমে ঢুকে গেল। মানুষটা আসার আগে ফ্রেশ হয়ে হালকা সাজুগুজু করতে হবে। গোসল সেরে মায়ের একটা শাড়ি পড়ল নীলা। চোখে কাজল টেনে দিল। সুগন্ধি মেখে মোবাইল টা হাতে নিয়েই চমকে গেল নীলা???? আঁট টা মিসকল!!!!!!!! নিয়াজের!!!!!!!! আর একটা মেসেজ!!!!!!!! তাড়াতাড়ি মেসেজটা ওপেন করলো সেখানে লিখা
“ফোন টা ধরো বাবো (বাবো নিয়াজের আদরের ডাক) দরকারি কথা আছে তোমার সাথে। আমি জানি তুমি অপেক্ষা করে আছো তবে ফোনটা ধরো প্লীজ!!!!!”

মেসেজটা পরে নীলার মাথা ঘুরাতে লাগলো???? এমনিতেই রাতে ঘুম হয় নি। সকালের নাস্তাও করে নি, তার উপর এতোগুলা কাজ করে ক্লান্ত হয়েগিয়েছে। কি এমন দরকারি কথা আছে নিয়াজের???? বাসায় এসেই তো বলতে পারতো সে। তবে কি নিয়াজ ছুটি পায়নি অফিস থেকে??? নিয়াজ কি আসবে না আজ??? তার সেই সপ্নের মতো কিছু কি হবে????? দাড়িয়ে থাকতে পারছে না নীলা। ধপ করে বসে পড়ল বিছানায়। সাথে সাথে মোবাইলের লাইট জ্বলে রিংটোন বেজে উঠলো। সেখানে লিখা কলিং নিয়াজ। ফোনটা ধরতে হাত কাঁপছে নীলার।
কে জানে ওপাশ থেকে কি বলবে সে!

লিখেছেনঃ Farhana Yesmin

About Kabir Hossain

Check Also

ভাত, কাপড়, ভালবাসা

( ভুমিকায় বলে নেই, গল্পের বক্তা চরিত্রটির মত আমিও নারীবাদি নই।আমি মানি নিয়তি নারী পুরুষ …