Home / মনের জানালা / “আড়ালের গল্প” পর্ব-৩

“আড়ালের গল্প” পর্ব-৩

araler golpo৫.

প্রচন্ড বৃষ্টি নেমেছে।তার সাথে মেঘের গা শিরশিরে গর্জন।নবনীতা তার ছোট্র রারান্দায় দাড়িয়ে আছে।আজকের তারিখটা অনেকক্ষন যাবৎ মনে করার চেষ্টা করছে। আজ আকাশ এত কাঁদছে কেন?আজ কি দেবীপক্ষের শেষ দিন? আনমনেই বলে ওঠে নবনীতা।তার ঘোলা দৃষ্টি বৃষ্টি আর অন্ধকার পাড়ি দিয়ে দিগন্তের শেষ সীমা পর্যন্ত পৌছানোর চেষ্টা করছে।বাতাসের সাথে সাথে বৃষ্টির ছাঁট এসে মাঝে মাঝেই ভিজিয়ে দিচ্ছে তাকে। সেদিকে তার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।তার মাথায় ক্রমাগত অরূনিমা নাম টা ঘুরছে। হুম অরূনিমা,নাম টা তার বড্ড চেনা।নামের পেছনে মানুষটাও অজানা নয়।ওই তো,বছর চারেক আগেই মেয়েটা দুইচোখ ভর্তি স্বপ্ন নিয়ে ভার্সিটিতে ভর্তি হতে এসেছিলো।হলের সব কাজ মিটিয়ে বাবা টা যখন চলে যাচ্ছিলো,বাবাকে জড়িয়ে ধরে কি কান্নাটাই না কাঁদলো মেয়েটা। ছোট একটা ভাই ছিল তার,ভাইটাকে ডাক্তার করার প্রচন্ড ইচ্ছে ছিল বাবার।তাই পরের বছর ভর্তি করেছিল একটি প্রাইভেট মেডিকেলে।ভাই-বোন আর মা বাবার ছোট্র একটা সুখের সংসার।কিন্তু হুট করেই বাবা টা একদিন পরপারে পাড়ি জমালো।বাড়ির বড় মেয়ে হিসেবে সব দ্বায়িত্ব তখন তার।সংসার চালাতে ক্লাসের পাশাপাশি টিউশনি,বুটিক হাউজের কাজ আরোও কত কি।কিন্তু সৃষ্টাকর্তা কখনও কখনও খুব বেশি নিষ্ঠুর হয়ে যান।তাই প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে পড়ুয়া ভাইটার জন্য রাতারাতি হাজার হাজার টাকা জোগাড়ের ভার পড়লো তার উপর।দিশেহারা হয়ে একদিন মেয়েটিকে অন্ধকার পথে নেমে আসতে হল।একটি পিতৃতুল্য লোকের সাথে এক বিছানায়,, তারপর…

প্রচন্ড বজ্রপাতের শব্দে চমকে ওঠে নবনীতা।বৃষ্টির বেগ বেড়েছে তুমুল রূপে।তার প্রচন্ড ঝাপটাই নবনীতা জুবুথুবু হয়ে বসে পড়ে বারান্দার এক কোনে।ডুগরে কেঁদে ওঠে সে।অসহ্যকর কষ্টে আড়ষ্ট হয়ে কনক্রিটের মেঝের সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে হয় তার। অসম্ভব ভয়ে কুকড়ে যায় সে।বার বার একটি তীব্র সত্য চোখের সামনে প্রকট হয়ে দাড়ায়।যে সত্যি টি কেউ জানে না,শুধু জানে নবনী। অরুনিমা আর নবনীতা।নবনীতা আর অরুনিমা।যারা একটি মানুষেরই ভিন্ন ২টি সত্তা।কেউ জানে না,কেউ না…।শুধু নবনীতা জানে তার ভেতরের অরুনীমা কে।

বৃষ্টি থেমেছে অনেকক্ষন।একলা শহরের আকাশ থমকে আছে মুখ ভার করে।ছোটবেলার কথা গুলো আজ নবনীতার খুব বেশি মনে পড়ছে।মনে পড়ে,ক্লাস সিক্সের ভূগোল ক্লাসে স্যার একদিন পড়িয়েছিলেন পৃথিবীটা প্রায় গোলাকৃতি বলে একবার দেখা হওয়া মানুষটির সাথে চলতে চলতে আরো একবার দেখা হয়ে যেতে পারে।নবনীতা সেদিন কথাটি শুনে মজা পেলেও আজ মনে হয়না স্যার ভুল কিছু বলেনি। আজকের বিকেলটা বড্ড সুন্দর ছিল নবনীতার।অনিকেতের হাত ধরে যখন তার বাড়ির চৌকাঠ পেরিয়ে ছিলো,তখনও বোঝেনি কি ঘটতে যাচ্ছে।কিন্তু অনিকেতের বাবার সাথে দেখা হওয়া মাত্রই মষ্তিস্কে জমাকৃত অরূনিমা নামক স্মৃতিগুলো ফ্ল্যাশব্যাকের মত দৃষ্টি সীমানায় হাজির হয়।সেই রাত,সেই লোমশ শরীর…এক পলকেই নবনীতার সামনে অন্ধকার হয়ে যায় সব কিছু।তার পর এক ছুটে দৌড়ে বেড়িয়ে আসে বাড়ি থেকে।

-আচ্ছা, মা-তনয় যদি কখনো জানতে পারে, তারা কি আমাকে বুঝবে?তনয়টি বুঝবে তার বুবু টা তার জন্য কি করেছে?নাকি দুশ্চরিত্রা মেয়ে ভেবে মুখ ফিরিয়ে নিবে?অভিশাপ দিবে মৃত্যুর? -অথবা অনিকেত?ও কি সবটা জানার পর রাখবে আমার হাত টা ধরে?নাকি অন্ধকারে ছুড়ে ফেলে দিবে আমাকে? অনমনেই নিজেকে বার বার প্রশ্ন করে । তারপর হুহু করে কেঁদে ওঠে নবনীতা।তীব্র কষ্ট টা যেন হৃদপিণ্ড কে পিশে মেরে ফেলতে চায়। সহ্য করতে পারে না নবনীতা।বালিশের তল থেকে ছোট্ট কৌটা টা বের করে আনে।তারপর ধীরে ধীরে ৪৩টি রিভোট্রিল মুখে গুজে দিয়ে চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়ে।যেই ঘুম আর কখনো ভাঙার নয় ।

লিখেছেনঃ সাবিহা বিনতে রইস

About Ashiq Mahmud

Check Also

ভাত, কাপড়, ভালবাসা

( ভুমিকায় বলে নেই, গল্পের বক্তা চরিত্রটির মত আমিও নারীবাদি নই।আমি মানি নিয়তি নারী পুরুষ …