Home / মনের জানালা / আঁধারের আলো

আঁধারের আলো

adarer aloঘুম থেকে উঠেই ছেলেটি আবিষ্কার করল খুব আরামদায়ক কোথাও ঘুমিয়ে ছিল। ঠিক বুঝতেও পারছে না সে,জায়গাটা কোথায়?! চোখ দুটি দিয়ে আবছা আবছা চারিদিকে চেয়ে দেখছে, তবুও সবকিছু স্পষ্ট নয়। রুমটা সাদা, আলিশান ফার্নিচার, সবকিছুই সাদা কাপড়ে আবৃত। ছেলেটি বুঝতে পারল সে এখন হাসপাতালে। তবে এটি যেন তেন হাসপাতাল নয়,খুবই ব্যয়বহুল হাসপাতাল। সে পূর্বের ঘটনা চিন্তা করার চেষ্টা করছে, কিন্তু মাথা প্রচন্ড ব্যাথা। হাত,পা,মাথার ব্যান্ডিস লাগানো। রুমে নার্স এবং ডাক্তার এল,তারা কি নিয়ে কথা বলছে তার কিছুই বুঝতে পারছে না,নার্স এসে একটি ইনজেকশন দিল,আবার ঘুমিয়ে পড়ল ছেলেটা। সন্ধ্যার সময় চোখ খুলে দেখল একজন যুবতী ডাক্তার আর নার্স কথা বলছেন, ছেলেটি জিজ্ঞাসা করল ডাক্তারকেঃ
-ডাক্তার,আমি এখানে কেন? কি হয়েছে আমার?
-ও..আপনার জ্ঞান এসেছে তাহলে??
-কি হয়েছিল আমার? আমি কিছুই মনে করতে পারছি না!
-আপনি মারাত্মক জখম হয়েছিলেন, তবে মাথায় খুব একটা আঘাত লাগেনি,তবে রক্ত ঝরেছিল খুব,তাও বেঁচে গিয়েছেন। আপনি ৫দিন কোমাতে ছিলেন তবুও।
ছেলেটি কোন জবাব দিল না, চুপচাপ শুনল। ডাক্তার তাকে জিজ্ঞাসা করলেনঃ
-নাম কি আপনার?
-আঁধার
-আপনার কারো কি আসার সম্ভাবনা আছে? আত্মীয়,বাবা মা?
-আমার কেউই নেই
-বাবা মা?
-বেঁচে নেই
-আমি দুঃখিত।আজকে আপনি পূর্ণ বিশ্রাম নিন,কাল দেখা হবে,কেমন..।
বাইকটি খুব স্পীডে চলছে রং সাইড দিয়ে,আঁধার এবং তার বন্ধু বসে আছে,বন্ধুটি তাকে বার বার নিষেধ করছে আসতে চালা বাইক,আঁধারের জবাব একটাই,১০লাখ টাকার মামলা,নিজের জীবন দিয়ে দিব তবুও টাকা লাগবেই।আরেকটা বাইক একই গতিতে চলছে।আঁধার খেয়াল করল যে তার বিপরীতপক্ষ বাইকটি স্পীড কমিয়ে দিল আর অনেক পিছে পড়ে রইল,আঁধার একটি মূহুর্তের জন্য পিছনে তাকাল,তখনই তার বন্ধুর চিত্‍কার..”আঁধার সামনে…..”আঁধার সামনে তাকাতেই…
ঘুম ভেঙ্গে গেল আঁধারের,উঠে বসে,খুব ঘামছে সে।ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে সকাল ১০টা,উঠে বসে।সেই ডাক্তার এল চেক আপ করতে।ডাক্তার তার অবস্হা দেখে পানি দিল ওষুধ খেতে আর বললঃ
-মিঃ আঁধার,খুব খারাপ দুঃস্বপ্ন দেখেছেন মনে হয়?
-অনেকটা ওরকমই
-আপনি কি বলতে পারবেন,ঐ দিন আপনার কি হয়েছিল?
-বাইক এক্সিডেন্ট
-সেটা আমি যানি,কিন্তু মূল কাহিনীটা কি?
-বাবা মা কার এক্সিডেন্ট এ মারা যান,ব্যাংকে ১কোটি টাকা লোন থাকায় জমিজমা সবকিছু নিয়ে যায় ব্যাংক।তবুও শোধ হয়নি কিছু।থেকে যায় ১০লাখ টাকা।বাইক এ করে রেস লাগাই,রং সাইড দিয়ে বন্ধুদের সাথে,তখনই এক্সিডেন্ট হয়,তারপর এখানে।
-আপনি এখন কোথায় থাকেন?
-আমার বন্ধুর কাছে,আচ্ছা,যে বন্ধুটা আমার বাইকে ছিল সে কি বেঁচে আছে?
-দুজন এসেছিল হাসপাতালে,তার মাঝে আপনি বেঁচে ছিলেন
-ও মাই গড!!!
-আচ্ছা,আমি এখন যাই।সন্ধ্যায় আসব,যদি কিছু লাগে নার্সকে বলবেন।
বেশীরভাগ সময় তার ঘুমেই কেটে যায়।সন্ধ্যা গড়িয়ে এল।আঁধার জেগেই ছিল।ডাক্তার প্রবেশ করতে আঁধার উঠে বসলঃ
-আচ্ছা,আর কোন ডাক্তার আসে না কেন?শুধুই যে আপনি আসেন চেক আপ করতে?
-আপনি আমার কেয়ার এ আছেন,সিনিয়র ডাক্তার আসবে আপনার রিলিজের সময়।ও হ্যাঁ,আপনার জন্য কিছু ফল এনেছি,খেয়ে নিবেন।
-আপনি এত কিছু কেন করছেন?
-patient দের জন্য করতে হয়,আর আপনার তো কেউ নেই খেয়াল করার জন্য তাই আমিই যতটুকু পারছি করছি।
-আপনাকে ধন্যবাদ,আচ্ছা ডাক্তার আমার বাইকটা এখন কোথায়?
-জাহান্নামে (কিছুটা উচ্চস্বরে বলে উঠল)আপনি মৃত্যু থেকে ফিরে আসলেন,আবার বাইকের খোঁজ করছেন!!!আজব মানুষতো!
-আমি তো শুধু জিজ্ঞাসা করলাম
-দুঃখিত,আপনার সাথে এভাবে বলা ঠিক হয় নি।আপনি রেষ্ট নিন।
তারপরদিন ডাক্তার এল চেক আপ করতে।আঁধার প্রায় মোটামুটি সুস্হ।তবে একমাস বিশ্রামের প্রয়োজন।ঘাঁ গুলা পুরোটা সেরে উঠে নি।
আঁধার ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করলঃ
-আমাকে কবে রিলিজ করা হবে?
-২দিন এর মাঝে,কিন্তু আপনি কোথায় উঠবেন?আপনারতো ১মাস বিশ্রামের প্রয়োজন।
-সেটা তো জানি না,১মাস এখানে থাকতে পারব না?
-সে রকম কোন নিয়ম নেই,তবে ব্যবস্হা করা যেতে পারে,আমি দেখছি কি করা যায়।তবে আপনার কোন আত্মীয়কে থাকতে হবে সবসময়,সেখানে কোন নার্সকে রাখা হবে না,কেউই থাকবে না।
-তাহলে আমি একা কি করব?
-সমস্যা নেই,কোন ব্যবস্হা হবেই।
দেখতে দেখতে ২দিন পার হয়ে এল,হাসপাতালেই ব্যবস্হা হল।আলাদা সেকশন আছে।নতুন কক্ষ,নতুন পরিবেশ,সাধারণ বেড,সোফা আর খাবারের টুকটাক আসবাদপত্র।আঁধার চিন্তা করছে কে আসবে,খেয়াল করবে তার জন্য।ডাক্তার আমাকে এখানে রেখে গেল পঁচে মরার জন্য?বোধ হয় সে ভেবেছে আমি ঠাট্টা করছি,এজন্য এখানে রেখে দিলেন যাতে কেউ এসে নিয়ে যাবেন এ ভেবে!সকালবেলায় ডাক্তারটি প্রবেশ করল।আঁধার জিজ্ঞাসা করলঃ
-আমার কি কেউ এসেছে?
-কারও কি আসার কথা আছে?
-না..তবে আপনি যে ব্যবস্হা করলেন,তাই ভাবলাম,কিন্তু এত সকালে চেকআপ করতে এলেন যে?
-আমি এখন আপনার অভিভাবক,ডাক্তার নই।
এ কথা শুনে আঁধার অবাক হল,জিজ্ঞাসা করলঃ
-আপনি আমার জন্য কেন এত করছেন?
-এসব এর জবাব আপনাকে পরে দেব।এখন আপনার জন্য breakfast এনেছি,তারাতারি সেরে ফেলুন।
-আচ্ছা,এখানে আসাতে নতুন করে রেজিষ্ট্রেশন করা হয়নি?
-এত ভাবতে হবে না,আমি সব ব্যবস্হা করে ফেলেছি।
-আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
-আপনার জন্য একটি মোবাইল এনেছি,যখনই প্রয়োজন পড়বে আমাকে ফোন দিবেন।
এভাবে আস্তে আস্তে এক এক করে দিন গড়িয়ে উঠল।আঁধার তাকে ডাক্তার বলত,কখনও নাম ধরে ডাকত না,নাম যানার প্রয়োজনবোধ করেনি।মাঝে মাঝে সে দেখত ডাক্তারটি বাসায় নি গিয়ে সোফার ঘুমিয়ে পড়েছে।একদিন আঁধার বলেই বসলঃ
-আচ্ছা ডাক্তার,আপনি বাসায় যান না মাঝে মাঝে,আপনার পরিবার টেনশন করে না?
-আমি আলাদা থাকি।
-আপনি বিয়ে করেন নি?
-করেছিলাম,কিন্তু ভাগ্য আমার সাথে ছিল না কখনও
-মানে?
-এত কিছু বুঝতে হবে না।আপনি তারাতারি সুস্হ হতে পারলেই আমার দ্বায়িত্ব শেষ জনাব।

আঁধার সর্বদা এক ধরণের দূরত্ব রাখত,আর ভাবত কেন এত কিছু করছে মেয়েটি তার জন্য?উত্তর খুঁজে পেত না।দেখতে দেখতে পুরোপুরি সুস্হ হয়ে উঠল।শেষদিনে আঁধার হাঁটতে শুরু করেছে আস্তে আস্তে।ডাক্তার জিজ্ঞাসা করলঃ
-এখন কোথায় যাবেন?
-যানি না।যে বন্ধুর কাছে থাকতাম সেও মারা গিয়েছে..দেখা যাক,একটা ব্যবস্হা করা যাবে।
-চলুন আপনাকে এগিয়ে দিয়ে আসি।
হাসপাতাল থেকে বার হওয়ার সময় আঁধার মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করলঃ
-আমার মোট বিল কত হয়েছে?
-ওসব নিয়ে কিচ্ছু ভাবতে হবে না আপনাকে।এসব টেনশন মাথা থেকে ঝেরে ফেলুন।
-আপনি আমার এত উপকার করলেন,আর আপনার নামটিও যানা হল না!
-আমি আলো।
-মানে!!!আপনি জোক করছেন?
-না,আমি আঁধারের আলো।
একথাটি শোনার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না আঁধার।মেয়েটি বিদায় দিয়ে চলে গেল ভিতরে।আঁধার পাশের রেষ্টুরেন্টে বসে চিন্তা করছে,ডাক্তারটি কি বলতে চাইল আসলে?এটাই কি তার প্রাপ্য!এ জন্যই কি সে এতকিছু করল তার জন্য?আঁধারের আলো হওয়ার জন্য???
আর হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার সময় আঁধারের মাঝে এক ধরণের চাপা কষ্ট অনুভব করল।কোন মূল্যবান কিছু আজ ফেলে এসেছে বোধহয়।
বিকাল হয়ে এল,মোবাইলটি বেজে উঠল।দেখতে পেল ডাক্তারটি ফোন দিয়েছে।
-কোথায় আপনি,জনাব আঁধার?
-আমি হাসপাতালের পাশের রেষ্টুরেন্টে।
মেয়েটি এল আঁধারের কাছে।এবার কোন ডাক্তার বেশে নয়।এসেই বলে উঠলঃ
-আমি জানতাম,আপনি বেশীদূর যাবেন না।আমি আপনার সব প্রশ্নের উত্তর এর জবাব দিতে এসেছি।আমার বিয়ে
হয়েছিল লাভ মেরেজ।খুব সুখেই ছিলাম আমরা।আমরা ২জনই ডাক্তার।বিয়ের ১মাস হয়েছিল।আমার স্বামীর যে জিনিসটা আমার অপছন্দ ছিল তা হল সে আপনার মত খুব রাফ বাইক চালাত।আমি মানা করতাম শুনতো না।ফলতো ঠিকই পেলাম আমি।আমাকে ছেয়ে একাই চলে গেল দূর দেশে।আমাকে নিয়েও গেল না।একা সময় কাটাতে হচ্ছে।তারপর দেখলাম আপনারও সে অবস্হা।তাই ভাবলাম আপনার ভুল ধরিয়ে দেই আমি।

মেয়েটি কাঁদছে।
আঁধার মেয়েটির হাত ধরে বলল,”আমি যদি এ হাত কখনও না ছাড়তে চাই তাহলে আপনার কি কোন সমস্যা আছে?”
মেয়েটি উত্তর দিল,”শর্ত আছে আমার,..তুমি কখনও বাইক চালাবে না,আমাকে ওয়াদা কর।”
আঁধার বলল,”আপনার ওয়াদা মনে রেখে এ নতুন পথ চলার চেষ্টা করব।চলবেন আমার সাথে?”মেয়েটি উত্তর দিল,”তোমার সাথে পথ চলতেই আজ আমি নিজেকে আঁধারের আলো বলেছি।”
আঁধার চোখ মুছে দিল,কিছুক্ষণ পর আলো বলে উঠল,”এই ছেলে,তুমি আমাকে আপনি বলছ কেন?””ওকে ম্যাম,আপনাকে আমি তুমি বলব,থুক্কু তোমাকে আমি তুমি বলব,”জবাব এল আঁধারের।।

লিখেছেনঃ Ashes Tz

About Ontohin

Check Also

ভাত, কাপড়, ভালবাসা

( ভুমিকায় বলে নেই, গল্পের বক্তা চরিত্রটির মত আমিও নারীবাদি নই।আমি মানি নিয়তি নারী পুরুষ …