Home / অন্যান্য / মিষ্টি শিল্প

মিষ্টি শিল্প

misty1

টাঙ্গাইল জেলায় অনেক মিষ্টি তৈরি হয়। যেমন- চমচম, দানাদার, রসগোল্লা, আমৃত্তি, জিলাপী, সন্দেশ, বিভিন্ন প্রকার দই, খির, নই, টানা, খাজা, কদমা বাতাসা ইত্যাদি। কিন্তু টাঙ্গাইলের মিষ্টি শিল্পের কথা বলতে গেলে প্রথমেই পোড়াবাড়ির চমচমের কথা বলতে হয়। মিষ্টির রাজা বলে খ্যাত টাঙ্গাইল জেলার পোড়াবাড়ি নামক স্থানের এই চমচম স্বমহিমায় মহমান্বিত। স্বাদ আর স্বাতন্ত্রের ও এর জুড়ি মেলে না। যার নাম শুনলেই অতুলনীয় স্বাদ ও অর্পূব গন্ধের কথা মনে করে জিহবায় পানি এসে যায়। এই সুস্বাদু ও লোভনীয় চমচম মিষ্টি ও টাঙ্গাইলের একটি অন্যতম ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্যপ্রায় ২শ বছরের প্রাচীন। অর্থাৎ ব্রিটিশ আমল থেকে অবিভক্ত ভারতবর্ষসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পোড়াবাড়ির চমচম টাঙ্গাইলকে ব্যাপক পরিচিত করেছে। বাংলা, বিহার, ছাড়িয়ে ভারতবর্ষ তথা গোটা পৃথিবী জুড়ে এর সুনাম রয়েছে। মিষ্টির জগতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন আকারের চমচমের বৈশিষ্ট অতি চমৎকার এর বাইরেরটা দেখতে পোড়া ইটের মতো। লালচে রংয়ের এই সুস্বাদু চমচমের উপরিভাগে চিনির গুড়ো থাকে এর ভিতরের অংশ রসাল নরম। লালচে গোলাপী আভাযুক্ত ভেতরের নরম অংশের প্রতিটি কোষ থাকে কড়া মিষ্টিতে কনায় কনায় ভরা। এই সুস্বাদু চমচম তৈরির মূল উপাদান খাঁটি দুধ, চিনি, পানি, সামান্য ময়দা ও এলাচ দানা হলেও টাঙ্গাইলের চমচমের স্বাদ মূলত টাঙ্গাইলের পানি উপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ টাঙ্গাইলের চমচম তৈরির মূল রহস্য এখানকার পানির মধ্যে নিহিত। দেশের অনেক জায়গা থেকেই টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির কারিগর নিয়ে অনেকেই টাঙ্গাইলের চমচম তৈরির চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সফল হতে পারেনি। এই ঐতিহাসিক চমচমের গুণেই মূলত টাঙ্গাইল এটি জেলা হিসেবে জন্ম লাভের পূর্বেই বিশ্ববাজারে পরিচিত লাভ করে।

গবেষকদের মতে দশরথ গৌড় নামে এক ব্যক্তি বৃটিশ আমলে টাঙ্গাইলের যমুনা নদীর তীরবর্তী পোড়াবাড়িতে আসেন। আসাম থেকে আগত এই দশরথ গৌড় যমুনার সুস্বাদু মৃদুপানি ও এখানকার খাঁটি গরুর দুধ দিয়ে প্রথম চমচম তেরি করেন। অতঃপর এখানে ব্যবসা শুরু করেন। তখন পোড়াবাড়ি টাঙ্গাইলের অন্যতম নদী বন্দর ছিলো। ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে মোঘল সুবেদার ইসলাম খাঁ হযরত শাহ জামানকে আতিয়া পরগনার শাসক নিযুক্ত করলে তিনিই পোড়াবাড়ি গ্রামকে নদী বন্দর হিসেবে গড়ে তোলেন। সেই সময়কালে ধলেশ্বরীর পশ্চিম তীরে গড়ে উঠে ছিলো জমজমাট ব্যবসা কেন্দ্র পোড়াবাড়ি বাজার। তখন পোড়া বাড়ি ঘাটে ভিড়তো বড় বড় সওদাগরী নৌকা, লঞ্চ, স্টিমার। ক্রমে ক্রমে পোড়াবাড়ি যখন জনসমাগমে প্রাণ চঞ্চলতায় ভরপুর- তখনই এখানে সুস্বাদু চমচম অর্থাৎ মিষ্টি শিল্প গড়ে ওঠে। রসগোল্লা আবিস্কারে মিষ্টান্ন শিল্পের আসে নবজাগরণ, সমসাময়িককালে পোড়াবাড়ির চমচম ও মুক্তা গাছার মন্ডার সুখ্যাতির শুরু। মন্ডার সাথে পাল্লা দিয়ে শুরু হয় চমচমের ঐতিহ্যের যুগ।

টাঙ্গাইল জেলা সদর থেকে মাত্র ৩ মাইল পশ্চিমে একদা ঘাট ছিল, এর নাম তালান ঘাট। সেখানেও ভিড়তো সউদাগরী নৌকা, জাহাজ ও লঞ্চ। সে সময় দেশী বিদেশী ব্যবসায়ীদের পদচারনায় পোড়াবাড়ি ছিল ব্যস্ত এক ব্যবসাকেন্দ্র। তখন চমচমের ব্যবসাও ছিল জমজমাট। প্রতি সপ্তাহে ১৫০ থেকে ২০০ মন চমচম তৈরি হতো পোড়াবাড়িতে। আবার কারো মতে সে সময় প্রতিদিন প্রায় এক দেড়শমন চমচম তৈরি হতো পোড়াবাড়িতে। উত্তরোত্তর সাফল্য ও চাহিদার কারণে তখন পোড়াবাড়িতে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ টি চমচম তৈরির কারখানা গড়ে উঠে যার সাথে প্রায় তিন শতাধিক পরিবারের জীবন ধারা আবর্তিত হয়। সে সময় চমচম মিষ্টি তৈরির সাথে জড়িত ছিল দশরথ গৌড়ের পর পরই রাজারাম গৌড়, কুশাইদেব, নারায়ন, কাকন হালুই, শিবশংকর গৌড়, প্রকাশ চন্দ্র, মদন গৌড় ও মোহন লাল প্রমূখ। তার পরবর্তী প্রজন্ম অর্থাৎ চলমান সময়ে খোকা ঘোষ এবং গোপাল চন্দ্র দাসের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এরা চমচম মিষ্টির ব্যবসায় সাফল্য লাভ করেন। বর্তমানে টাঙ্গাইল শহরের পাঁচ আনি বাজার এই মিষ্টি শিল্পের জন্য বিখ্যাত।

চমচম এখন একটি উপাদেয় মিষ্টান্ন যা যে কোন বয়সের লোকের কাছে লোভনীয়। বিয়ের অনুষ্ঠান, পূজায়, জন্ম দিনে, পরীক্ষায় ফলাফল হলে, চাকরির প্রমোশন হলে, নির্বাচনে জয়ী হলে, নতুন চাকরি হলে, শ্বশুড় বাড়ি বা আত্মীয় বাড়ি যাওয়ার সময় এই চমচম দিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় এখনো সর্বমহলে প্রচলিত।misty2

কালের আবর্তে যমুনার শাখা নদী ধলেশ্বরীর বুকে অসংখ্য চরজেগে উঠে। এতে বন্ধ হয়ে যায় পোড়াবাড়ির নৌপথের ব্যবসা বাণিজ্য। ক্রমে ক্রমে জনবহুল পোড়াবাড়ী হতে থাকে জনশূন্য। এ ঐতিহ্যবাহী চমচম শিল্পকে কেন্দ্র করে এতো লোক জীবিকা নির্বাহ করতো, তারা বেকার হয়ে পড়ে। বেঁচে থাকার তাগিদে তারা অন্য পেশায় চলে যায়। পোড়াবাড়ি বাজারের অবস্থা খুবই করুন। এই বাজারের ৪ থেকে ৫টি ভাঙ্গা চোড়া চমচমের দোকান রয়েছে। যা কেবল মাত্র ঐতিহ্যের স্মৃতি বহন করে চলেছে। বাজার এবং আশে পাশে কয়েকটি বাড়িতে এখনো মিষ্টি তৈরি হয়। তারা ঐ মিষ্টি রাজধানী ঢাকা তাছাড়া দেশের বিভিন্ন শহরে তা সরবরাহ করে থাকে। জয়কালী মিষ্টান্ন ভান্ডার, গোপাল মিষ্টান্ন ভান্ডার ও টাঙ্গাইল পোড়াবাড়ি মিষ্টি ঘরে এখনো নির্ভেজাল পোড়াবাড়ির চমচম পাওয়া যায়।

বর্তমানে টাঙ্গাইলের পাঁচ আনী বাজার ছাড়াও টাঙ্গাইল জেলার বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি তৈরিও বিক্রি হচ্ছে। যেমন আমির্তি, রসমালাই, রসগোল্লা, সন্দেশ, কালোজাম জিলাপী খাজা বাতাসা, কদমা, নই, টানাবাদাম ইত্যাদি। মির্জাপুর উপজেলা জামুর্কীর সন্দেশ বিখ্যাত। নলিন বাজারের রসগোল্লার খ্যাতি রয়েছে। বাসাইল উপজেলার ফাইলা পাগলার মেলায় কদমার সুনাম আছে। এ ছাড়া টাঙ্গাইলের ঘোষেরা ওপাল সম্প্রদায়ের লোকেরা দানাদার, দই ও ঘি তৈরি করেন। এ দইয়ের খ্যাতিও কম নয়। বগুড়ার দইয়ের চেয়ে স্বাদে ও গন্ধে কোন অংশে কম নয়। বরং কোন কোন ঘোষের দই বগুড়ার দইয়ের চেয়েও ভালো। যেমন- আলমনগরের নীল কমলের দই, ফলদার খোকা ঘোষের দই ও ভূঞাপুরের রমজানের দইয়ের খ্যাতি রয়েছে।misty3

ঐতিহ্যের পোড়াবাড়ির চমচম আজ নানা প্রতিকূলতায় সম্মুখীন। এই মিষ্টি নির্মাতারা ও ব্যবসায়ীরা আর্থিক লাভ থেকে বঞ্চিত হয়ে এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। এমনি করে চলে গেলে আমাদের ঐতিহ্যবাহী পোড়াবাড়ির চমচম একদিন বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

মিষ্টি শিল্পে টাঙ্গাইলের ঘোষ ও পাল সম্প্রদায় বংশানু ক্রমিকভাবে নিয়োজিত আছে। তবে দে, নাগ ইত্যাদি উপাধিধারীদের কোথাও কোথাও মিষ্টান্ন তৈরিতে নিয়োজিত দেখা যায়। টাঙ্গাইলের মোদক উপাধি প্রাপ্তরাও মিষ্টি শিল্পের সাথে জড়িত ছিল, এখনো আছে। মোদক উপাধিধারী হিন্দুরা বংশগতভাবে গুড়, তেল, ময়দা ইত্যাদি দিয়ে তৈরি করে জিলাপি, কদমা, বাতাসা, গজা, খাজা, নই, টানা এবং চিনি সহযোগে খোরমা, মিস্ত্রী, চিনি বা গুড়ে সাজ, মুড়ির মোয়া, ঢেপের মোয়া, ঝুরি, জোয়ারের খইসহ বিভিন্ন উপদানের তৈরি নাড়ু ইত্যাদি।

দুগ্ধজাত দই, ক্ষীর, ঘি, মাখন ইত্যাদি মিষ্টি দ্রব্য তৈরিতে টাঙ্গাইলের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য আছে। যে কথা আগেও বলা হয়েছে। টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতির নরদই, দেউপুর, নিচনপুর ও এলেঙ্গা। ভূঞাপুরের ফলদা ও ভূঞাপুর সদরে এবং গোপালপুরের মিষ্টি পট্টি আলমনগর ও নলিন বাজরের সুস্বাদু এবং উত্তম দই, ক্ষীর, ঘি, মাখন তৈরি উল্লেখযোগ্য স্থান।

About Ontohin

Check Also

অ্যাপলের সিইও টিম কুক এখন ভারতে

অ্যাপল কম্পিউটার ইনকরপোরেটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) টিম কুক ছিলেন চীনে। দেশটির এক নতুন ব্যবসায় …