Home / মনের জানালা / “ভালবাসার অনুরণন” পর্ব-১

“ভালবাসার অনুরণন” পর্ব-১

chokher bristyমন ছুঁয়ে যায় এমন কিছু না, মনটাকে হয়তো একটু দোলা দিয়ে যেতে পারে এমনি একটা কাহিনী বলব আজ। মেডিকেল কোচিং করতে এসে শুক্রাবাদের একটা বাসায় উঠেছিলাম। সেই সুবাদে বাড়িওয়ালার ছেলে জাহিদভাইয়ের সাথে পরিচয়। দেখতে সাধারন কিন্তু অসাধারন মানসিকতার এই মানুষটিরই গল্প বলব। জাহিদভাইয়ের সাথে পরিচয়ের সুত্র ধরেই ওনার ভাললাগার মানুষ সানজু আপুর সাথে আমার পরিচয়। গল্পটার কিছুটা অংশ ওনাদের মুখেই শোনা যাক।

সানজুআপুর কথা —
সানজিদা ইসলাম। সবাই আমাকে সানজু নামেই চেনে। বাবা আমাকে আদর করে এই নামেই ডাকতো। ছোটবেলা থেকে আমার বাবাই ছিল আমার পৃথিবী। বাবাকে আমি প্রচণ্ড ভালবাসতাম। পরহেজগারি বাবা এক কথার মানুষ ছিলেন। যা বলবেন তাই করতেন। আপনারা ভাবছেন বাবার এতো গল্প করছি কেন? কারণ পরমপূজনীয় বাবা আমার ২২ বছরের জীবনে ঝড় বইয়ে তছনছ করে দিয়েছিলেন।
ধানমণ্ডি লেক ঘেঁষেই আমাদের বাসাটা। বিকেলবেলায় কফি হাতে লেক-অভিমুখি জানালা দিয়ে বাইরের জগতটাকে দেখা আমার বহু পুরনো অভ্যাস। একটা লম্বাচুলো সদ্যজাগ্রত দাড়ির ছেলেকে প্রায়ই দেখতাম আমাদের বাসার কাছেই মাছ ধরত। সিগারেট মুখে হেঁড়ে গলার ইংলিশ গান গাওয়া ছেলেটাকে দেখলেই আমার গাটা ঘৃণায় রি রি করত। আস্তে আস্তে সেটাও কেমন চোখ সইয়ে গেল। কেমন যেন একটা ভাল লাগা অনুভুতি তৈরি হল। অনেক কষ্টের পর ছেলেটা যখন একটা মাছ পেত তখন আমার কিযে খুশি লাগতো তা ভাষায় বোঝাতে পারব না। ওর থেকে মনে হয় আমিই বেশি খুশি হতাম। ভালই কাটছিল দিনগুলো। হঠাত একদিন দেখি ছেলেটা নেই। আমার অস্থিরতা দেখে আমি নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম। ১৫দিন পার হয়ে গেল, আমার মনের খচখচানি কিছুতেই দূর হচ্ছে না। নিজের উপর নিজেই বিরক্ত হচ্ছিলাম, একটা চেংড়া ছেলের জন্য আমি কেনো অস্থির হচ্ছি। প্রতিটা বিকাল আমার চোখ শুধু ছেলেটাকেই খুজে বেড়াতো। দীর্ঘ ২২ দিন পর এক বৃষ্টিস্নাত বিকালে ওকে ছাতা মাথায় মাছ ধরতে দেখে আমার চোখের বৃষ্টি আটকাতে পারলাম না। মনটা কেমন অদ্ভুত শান্তিতে ভরে গেল। ওইদিনই ঠিক করলাম ওকে কাছ থেকে দেখবো। তারিখটা আজও মনে আছে। ৩রা জুন ২০০৬,খুব ভাল করে না দেখলে ছেলেটাকে বখাটে মনে হবারই কথা। তার চোখ কিন্তু অন্য কথা বলে। কিছুটা মায়া কিছুটা লজ্জা মিশানো চোখ দুটিতে তাকিয়ে চোখের পলক ফেলতে যেন ভুলেই গিয়েছিলাম। বেচারা লজ্জা পেয়ে নিজেই চোখ নামিয়ে নিল। বিশ্বাস করুন প্রতিটা বিকালে শুধুমাত্র ওইদুটি চোখ দেখার জন্য পাগলের মত ওখানে ছুটে যেতাম। বেচারা প্রতিবারই লজ্জায় কুঁচকে যেতো। মাঝে মাঝে মনে হতো ও যেন কিছু একটা বলতে চাচ্ছে।
এরপরই ঘটল আসল ক্লাইম্যাক্স। আমার নামে প্রায়ই কাজিনদের পাঠানো কুরিয়ার আসতো। একদিন কুরিয়ার রিসিভ করে ডেলিভারিম্যান এর দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলাম। ও যে কুরিয়ার নিয়ে আসবে তা স্বপ্নেও ভাবিনি। রিসিট উল্টে দেখি লেখা ,জাহিদ-০১৭১৭৬৪৬৩…ততক্ষনে সে হাওয়া। নয়-নয়টা দিন নিজের সাথে যুদ্ধ করে নিজেই হেরে গেলাম। একবিকালে ওই জানালায় দাড়িয়ে ওকে ফোন দিলাম। আমার ফোন ধরে যেই বুঝল আমি ফোন করেছি, তখনি ঘাড় ঘুরিয়ে আমাদের জানালার দিকে তাকাল। সে যেন জানত আমি ওখানেই দাড়িয়ে আছি। এরপর থেকে প্রতি বিকালেই জানালায় দাড়িয়ে মোবাইলে তার সাথে কথা বলতাম। একটা মাছ পেলেই আর কথা নেই,আমাকে দেখানো চাইই চাই। ওর শিশুসুলভ মনটাই আমাকে বেশি টানত।

ভালোয় ভালোয় দেড় বছর পার হল। বাসার সবাই আমার প্রেমের কথা জেনে গেল। যে বাবা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় বন্ধু, সেই বাবাই আমার জীবনটাকে চুরমার করে দিলেন। বাবার একটাই কথা তিনি প্রেমের বিয়ে মানবেন না। তাই ছেলেকে দেখার প্রয়োজনও বোধ করলেন না। অথচ এই বাবা জীবনে আমার কোন আবদার ফেলেন নাই। আমার পছন্দটাকে বাবা কোন গুরুত্বই দিলেন না। বুয়েট পাশ জাহিদের কি কম যোগ্যতা ছিল? বাবা যেরকম মানুষ তাতে তিনি কখনোই এই বিয়ে মানবেন না। একবার ভাবলাম পালিয়ে বিয়ে করি কিন্তু জাহিদ রাজি হল না। তার কথা, মানুষ বিয়ে করে সুখী হবার জন্য, কিন্তু এভাবে বিয়ে করে কখনো সুখী হওয়া সম্ভব না। এখন ভাবি, এমন বাবার মেয়ে হয়ে কেন প্রেম করতে গেলাম। আপনারাই বলুন প্রেম ভালোবাসা কি যুক্তির উরধে নয়? আমি যেন জিন্দালাশ হয়ে গেলাম। এখনো আমার দুটো বিকাল কাটে লেকের মাছ ধরা দেখে। শুধু আমার চোখ খুজে বেড়ায় সেই লজ্জা ও মায়া মেশানো চোখ দুটো কে………

লিখেছেনঃ Mahmud hasan

About Aurthohin

Check Also

ভাত, কাপড়, ভালবাসা

( ভুমিকায় বলে নেই, গল্পের বক্তা চরিত্রটির মত আমিও নারীবাদি নই।আমি মানি নিয়তি নারী পুরুষ …