নূপুর

nupurচিলেকোঠার ঘরটা খুব বেশি বড় নয়।
ছোট একটা জানালা আছে ঘরে। সেটা দিয়ে শেষ বিকালের মৃদু আলো যেন চুঁইয়ে পড়ছে ঘরের মেঝেতে।
ঘরটার এক কোণে অণু পা ছড়িয়ে বসে আছে। খানিকটা এলোচুল বুকের উপর এসে পড়ায় “হৈমন্তী” গল্পের হৈমন্তীর মত লাগছে তাকে। হাত দুটোও ঠিক সেভাবে কোলের উপরে ফেলে রাখা।
“আচ্ছা, খুব বেশি কি পাপ করে ফেলেছিলাম শখের বশে? মা নাচতে শিখিয়েছিল, শখের বশে নাচতাম। সেটা কি পাপ ছিল? নাকি সেই কথাটাকে অগ্রাহ্য করার ফল, যেদিন বাবা বলেছিল, ‘রোহিণী, অণুকে নাচতে শিখিও না। তোমারটাকেই মেনে নিতে পারেনি আমার পরিবার, অণুকেও তারা নাচতে দেখলে তারা তুলকালাম কান্ড ঘটাবে।’ নাকি আমার নাচটাই অপয়া, যা কিনা কিছু মানুষের পয়া কাজকে…”
ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে অণুর ভাবনায় ছেদ পড়ে। দরজা খুলে একটা ছায়া এগিয়ে আসে। মেঝেতে একটা থালা আর গ্লাস রেখে কর্কশ কন্ঠে বলে ওঠে, “এই যে নর্তকী অণু, খেয়ে নেন। আপনার তো আবার ক্ষুধা বেশি, একবেলা না খেয়ে থাকতে পারেন না। কি মেয়েরে বাবা, কাজ-কাম কিছুই পারে না, তার আবার ক্ষুধার বাহার দেখলে মানুষের হয়ে আসে। ওঠ হারামজাদি, খেয়ে নে… ”
“অণু” শব্দটা শুনতেই পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে যায় অণুর। মা রেখেছিল তার এই নামটা। অদ্ভুত এক যুক্তি দিয়েছিল তার মা।
“পদার্থের ক্ষুদ্রতম অংশ হল অণু। অনেক অণু মিলে গড়ে তোলে পদার্থ। আমাদের অণুও তেমন আমাদের সব সুখ-শান্তি গড়ে তুলবে। একটা অণুই অনেকগুলো অণু হয়ে আমাদেরকে সুখের পদার্থে পরিণত করবে।”
অণুর বাবা মুচকি হেসেছিল।
“রোহিণী, পদার্থের ক্ষুদ্রতম অংশের নাম তো পরমাণু!”
কটমট করে চেয়েছিল অণুর মা।
“তোমার পিছনে লাগা স্বভাব আর গেল না। পরমাণু কোন নাম হতে পারে? ঢং যত্তসব। অণু নামটা কত সুন্দর! আর কোথায় পরমাণু! আকাশ-পাতাল তফাত।”
তারপর কিছু সময় রাগে গজগজ করেছিল অণুর মা।
আজকের গজগজানিটা সেরকম না। গজগজ করতে করতে কন্ঠটা অণুর চুলের মুঠি চেপে ধরে।
“কি রে নর্তকী, কথা কানে ঢোকে না তোর? কতখন দাঁড়িয়ে থাকব এখানে? ঢং দেখে মনে হয় গলাটা টিপে দেই।”
ঠাস করে একটা চড়ের শব্দ হয়।
দরজাটা বন্ধ হয়ে যায়। পায়ের শব্দটা সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে স্তিমিত হতে থাকে।
.
রোহিণী দেবীর খুব ইচ্ছা ছিল, মেয়েকে ভারতনাট্যমে নাচতে শেখাবেন। কিন্তু শুরু করার কিছুদিনের মাথায়ই সব এলোমেলো হয়ে যায়। ক্যান্সার ধরা পড়ে অণুর মায়ের। ক্যান্সারের নূপুর পায়ে গলিয়ে খুব বেশিদিন নাচা হয়নি রোহিণী দেবীর। খুব শীঘ্রই তার সৎকারের ছাইগুলোর নদীতে ভেসে যাওয়ার দৃশ্য দেখতে হয় অণুকে।
“নদীর ম্রোতগুলোও কত নিষ্ঠুর! ওরা এতদ্রুত আমার মা’কে আমার কাছ থেকে দূরে নিয়ে গেল!”, অণু সেদিন ভেবেছিল। আর সমস্ত ভাবনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিল তার দু’চোখ।
তার বেকার বাবা ক’দিন পরই বিধবা প্রিয়া দত্তকে বিয়ে করে ঘরজামাই হয়ে যায় দত্ত পরিবারের। সৎমা অণুর জীবনে কাঁটাময় নূপুর হয়ে আসে, যা কিনা ক্ষতবিক্ষত করে দেয় অণুর নাচের সত্ত্বাকে।
.
কঙ্কা দিদি প্রতিদিন নাচ শেখাতে আসত মাধবীকে। অণু দেখত মাধবীর নাচ, সৎমার ভয়ে কখনও নিজে নাচতে যায়নি মাধবীর সামনে।
মাধবীর নূপুরগুলো দেখে নিজের মায়ের দেয়া নূপুরজোড়া বের করত পুরান ট্রাংক থেকে। হাত বুলিয়ে দেখতো সেটায়, মায়ের স্পর্শ খুঁজে ফিরতো।
সেদিনই বিকেলে সৎমা বাইরে যাওয়ায় নিজের নূপুরজোড়া বের করে পায়ে গলিয়ে ফেলে অণু। একটু শখের নৃত্যের ছোঁয়ায় সেদিন মধুর হয়ে বেজেছিল নূপুরের শব্দ।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সেই নিক্বণের শব্দ শুনেছিল কঙ্কা দিদি। অণুর পিঠ চাপড়ে দিয়েছিল।
“মাধবী সুন্দর নাচে। কিন্তু নৃত্য অণুর সত্ত্বায় মিশে আছে, বুঝলেন প্রিয়া দেবী? আপনার এই মেয়েটার দিকেও একটু নজর দিন। এমন সুন্দর যে নাচে, সে তো দেশের উজ্জ্বল সম্পদ। বহুদিন পর কাওকে এমন সুন্দর করে ভারতনাট্যমে নাচতে দেখলাম।”
হ্যাঁ, সৎমা নজর দিয়েছিল অণুর উপরে।
তার পায়ের তালু, গোড়ালি, আংগুলের ফাঁকা জায়গা পুড়িয়ে দিয়েছিল গরম খুন্তির ছ্যাঁকা দিয়ে।
“কি লো নর্তকী হারামজাদি, তুই নাকি খুব ভাল নৃত্য করিস? নাচ না এবার, নাচ। শুনে রাখ, মাধবীই এবার প্রতিযোগিতায় প্রথম হবে। ওকে সবাই চিনবে। কত বড় বড় লোকের সাথে পরিচয় হবে ওর! আমাকেও সবার মাধবীর মা হিসেবে একনামে চিনবে।”
অণুর নূপুরজোড়া কে আছাড় মেরেছিল সৎমা। ছড়িয়ে পড়েছিল ঘুঙুরগুলো। ঠিক যেন “অণু” হয়ে গিয়েছিল নূপুরজোড়া।
অণুর চোখের জলের দাম দিতেই হয়ত প্রতিযোগিতার দিন নাচের মুদ্রায় গন্ডগোল করে ফেলে মাধবী। প্রতিযোগিতা শেষে সৎমা আবার ফুঁসেছিল।
“সব তোর দোষ ডাইনি মেয়ে। তোর জন্যই আজ এরকম হয়েছে। তোর বদদুআর জন্যই তো আজ এরকম হলো।”
অণু আটকে পড়ে চার দেয়ালের সৎমার শাসনে। তার বাবা সবকিছু দেখেও চুপ করে থাকতো। ঘরজামাই হওয়ার সাথে সাথে তিনি যেন বিকিয়ে দিয়েছিলেন নিজের সমস্ত মায়া-মমতাকেও। অণুর বাবা টাকালোভী ছিল। সে প্রিয়া দেবীর সম্পত্তি ভোগ করতে গিয়ে অণুর দিকে খেয়াল দিত না, ঠিক সেভাবে প্রিয়া দেবীও অণুকে নির্যাতন করতে গিয়ে খেয়াল করতো না নিজের মানবিকতার দিকেও।
দু’দিন আগেই মাধবীর নূপুরজোড়া হাতে নিয়ে দেখছিল অণু। পুরোনো স্মৃতির ধাক্কায় খেয়াল করেনি, সৎমাও তাকে ঠিক সেভাবেই দেখছে।
“তোর নাচার খুব শখ, তাই না রে? চল, তোকে নাচের ঘরে নিয়ে যাই। তিনদিন থাকবি তুই সেখানে।”
.
কা কা শব্দে হঠাৎই বাস্তবের জগতে ফিরে আসে অণু। উঠতে চেষ্টা করে সে। বহু কষ্টে হাঁচড়ে-পাঁচড়ে ভাতের থালার কাছে এগিয়ে যায় অণু।
মা’র কথা আবার মনে পড়তেই হুঁহুঁ করে কেঁদে ওঠে অণু। খাবারের থালার পান্তাভাত দেখে মা’র হাতের খিচুড়ির কথা মনে পড়ে যায় তার।
“আচ্ছা মা, আমিও তো নাচতে পারি। তুমি সেই নূপুরটা পরলে, কিন্তু আমাকে কেন পরালে না? আমাকে পরালেও তো আমি ছাই হয়ে ভেসে যেতাম নদীর সেই স্রোতে।”
অণু জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়।
একঝাঁক বাদুড় দিনশেষে বাড়ির পথ ধরেছে।
অণু ভাবতে থাকে, তার সুখের বাড়ির পথ ধরে কবে সে বাদুড়গুলোর মত উড়তে পারবে! বাদুড়গুলোর মত উড়তে উড়তেই নাচতে পারবে।
কিন্তু এখনও যে অণু সময় নামের নর্তকীর দেয়া উপহার “কাঁটার নূপুর” পায়ে ক্রমাগত নেচে চলেছে!
শখের ভারতনাট্যম নাচ…

লিখেছেন – ফারহান ফাহিম

About Abid

Check Also

ভাত, কাপড়, ভালবাসা

( ভুমিকায় বলে নেই, গল্পের বক্তা চরিত্রটির মত আমিও নারীবাদি নই।আমি মানি নিয়তি নারী পুরুষ …