Home / মনের জানালা / চোখের বৃষ্টি

চোখের বৃষ্টি

chokher briistyতখন টুকটাক একটু আধটু লেখালেখি করি। লেখালেখি মানে ফেসবুকে নোট লেখা আরকি। নিজের নোটে আর দু একটা পেজে গল্প আর কবিতা লেখি। কেউ প্রশংসা করলে ভালই লাগে। একদিন হঠাত্‍ ফেসবুকে ঢুকে দেখি ইনবক্সে নতুন একটা মেসেজ। মেসেজটা খুলে কিছুটা ধাক্কাই খেলাম। অপরিচিত একটা মেয়ের মেসেজ। কন্যার নাম হৃদিতা তাবাসসুম।

লিখেছে,
“এই যে সাহেব, লেখেন তো ভালই। কিন্তু আপনার সব লেখাগুলো এত মন খারাপ করা কেন? আমাকে এরকম একটা গল্প লিখে দিতে পারবেন যেটা পড়লেই মন ভাল হয়ে যায়?”
আমি কি উত্তর দিয়েছিলাম মনে পড়ছেনা। তবে এটা মনে আছে গল্প দিয়ে নাহলেও অন্য কোনভাবে তার মন ভাল করার চাকরিটা নিয়েছিলাম। তারপর থেকে টুকটাক মেসেজ পাঠানো। হাই, হ্যালো, হাউ আর ইউ এইসব আরকি!

এমনভাবেই চলছিল, হয়ত আরো কিছুদিন চলত যদি ঐদিন অমনভাবে বৃষ্টি না হতো।
একদিন সকালে খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। শ্রীকান্ত, নিয়াজ মহম্মদ আর রবীন্দ্রনাথের সাথে টিনের চালে বৃষ্টির ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। এতসব ছেড়ে বিছানা থেকে উঠতে ইচ্ছা করছিল না। তাই বিছানায় শুয়ে বৃষ্টির শব্দ আর গান শুনছিলাম। ঘোর কাটল একটা অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন পেয়ে।”হ্যালো, আমি হৃদিতা।”

আমি একেবারে আকাশ থেকে পড়লাম। ঠিক আকাশ থেকে পড়লাম বললেও কম করে বলা হবে, একেবারে সৌরজগতের বাইরে থেকে পৃথিবীতে এসে পড়লাম। হৃদিতা আমার ফোন নম্বর পাবে কোথায়? ওপাশের কন্ঠস্বর আবারো শুনতে পেলাম।
-হ্যালো, শুনতে পাচ্ছেন?
-হ্যা, হৃদিতা। কেমন আছ?
-আমার খুব মন খারাপ। আপনাকে একটা গল্প লিখতে বলেছিলাম যা পড়লে মন ভাল হয়ে যায়। আপনি লিখলেন না যে? এখন কথাবলে আমার মন ভাল করে দিতে হবে।
-হৃদিতা, আমি তো কথা বলে কারো মন ভাল করতে পারিনা। আমার সাথে কিছুক্ষণ কথা বললে মানুষের মন আরো খারাপ হয়ে যায়।
-তাহলে আমার মন আরেকটু খারাপ করে দিন।

সেই শুরু। তারপর অপরিচিত নম্বরটা খুব পরিচিত হতে সময় লাগলনা। ওই প্রায় সময় ফোন করত। বেশিরভাগ সময় বৃষ্টি হলেই ফোন করত। একদিন ঠিক করলাম দেখা করবো। ঠিক হলো, যেদিন খুব বৃষ্টি হবে সেদিন ওর হলের সামনের রাস্তায় আমি কদম ফুল নিয়ে অপেক্ষা করবো। আর ও নীল শাড়িপড়ে আসবে।
দিন চলে যায়, বৃষ্টি আর হয় না। তারপর হঠাত্‍ একদিন তুমুল বৃষ্টিতে চারচোখের মিলন হলো। সেদিন অনেকক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজলাম। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে ফুসকা খেলাম। বৃষ্টি শেষে রোদ উঠল, ভেজা কাপড় শুকিয়ে গেল। কিন্তু গল্প ফুরোয় না।

প্রায়ই দেখা হত, ফোনে কথা হত আগেরচেয়ে অনেক বেশি। একদিন বৃষ্টির মধ্যে ফোন করে বললো, “এই আমার না খুব কদম ফুল পেতে ইচ্ছা করছে।” শরীর কিছুটা খারাপ ছিল। কেয়ার করলাম না। অনেক কষ্টে বৃষ্টিতে ভিজে কদম ফুল জোগাড় করলাম। তারপর বৃষ্টিতে ভিজেই ওকে দিয়ে আসলাম। সেদিন বাসায় ফিরে প্রচন্ড জ্বর শুরু হল। শুনে ও অনেক কান্নাকাটি করল। আমি এত করেই বুঝাই কিন্তু ওর কান্না শেষ হয় না। ওর কান্না শেষ না হলেও আমার শখের বৃষ্টিতে ঐদিনই শেষ হয়ে গেল। এরপর বৃষ্টি হলেই ও ফোন করে বলতো, “এই, একদম বৃষ্টিতে ভিজবে না। বৃষ্টিতে ভিজে আবার যদি জ্বর বাধাও, তাহলে কিন্তু তোমার সাথে তিন দিনে কথা বলব না।”

এভাবে ভালই কেটে যাচ্ছিল। পৃথিবীটাকে স্বর্গ মনে হত। প্রতি মুহুর্ত বেঁচে থাকাটাকে আনন্দের মনে হত। ওর অম্লমধুর শাসন আর অভিমান গুলো বিধাতার বিশেষ মেহেরবানি মনে হত।
গল্পটা এভাবে শেষ হলে ভাল হত। কিন্তু না, গল্পটা ট্রাজেডি হয়ে গেল।
ফেসবুকে অধরা নামে আরো একটা মেয়ে আমাকে মেসেজ পাঠাত। তার সাথে সম্পর্কটা ছিল মূলত বন্ধুত্বের। অধরা মেসেজে প্রচুর ফান করত। আমিও ফান করেই রিপ্লাই দিতাম। হৃদিতার সাথে রিলেশনশীপ স্ট্যাটাস দেখে ও একদিন মেসেজ পাঠালো, “এই,এইটা তুমি কি করলা? তুমি না আমাকে ভালবাস? ঐ মেয়েটা আবার আসলো কোথা থেকে?” আমিও ফান করে লিখেছিলাম, “আমি আসলে তোমাকেই ভালবাসি। অন্যসব ভুয়া।” পরে অবশ্য ফোনে অধরাকে সব বুঝিয়ে বলেছিলাম। তবে মেসেজে ঐ ধরণের ফান চলতেই থাকত।
একদিন হৃদিতার কাছে ফোন রেখে আমিআইসক্রিম কিনতে গিয়েছিলাম।

ফিরে এসে দেখি ওর মুড অফ। হলে ফিরে যেতে চাইল। বাসায় ফিরে একটা মেসেজ পেলাম, “তুমি আর কক্ষণো আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে না। কোন কারন জিজ্ঞাসা করবেনা। শুধু একটা ব্যাপার, যদি তুমি কোন রকম যোগাযোগের চেষ্টা করো তাহলে কিছু একটা করে ফেলব আমি।”
আমি তো পুরো হতভম্ব হয়ে গেলাম। ফোন করলাম, ফোন বন্ধ। ব্রাউজার হিস্টোরি চেক করে দেখি অধরার মেসেজগুলো। আবার কল করতে গিয়ে কললগে দেখলাম অধরা ফোন করেছিল। অধরাকে ফোন করলাম। জিজ্ঞেস করলাম আগেরবার ফোন করে কি বলেছে। ও বললো শুধু বলেছে,”জান তুমি কই?” আমি কথা না বলে ফোন রেখে দিলাম। অধরার কথাটা হৃদিতাকে বলেছিলাম। কিন্তু ও মেসেজগুলোর কথা জানতো না। বুঝলাম মেসেজে আর ফোন, দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে ও আমাকে অনেকখানি ভুল বুঝেছে।….সারারাত নির্ঘুম কাটিয়ে পরদিন ওর হলে যোগাযোগ করে জানলাম ও খুব সকালে কুমিল্লায় ওদের নিজেদের বাড়িতে চলে গেছে। কেউ ঠিকানা দিতে পারলো না।
তারপর আর ওর সাথে দেখা বা কথা হয়নি। ওর ফোনটা সবসময় বন্ধ থাকে, ভার্সিটিতেও আর আসেনা। সুন্দর এই পৃথিবীটাকে আমার অসহ্য মনে হয়।

এখনো মাঝে মাঝে বৃষ্টি হয়। আমি ভিজতে সাহস করি না। মনেহয় ও এখনই ফোন করে বলবে, “এই,একদম বৃষ্টিতে ভিজবে না। আবার যদি জ্বর বাধাও, তাহলে তোমার সাথে তিনদিন কথা বলবো না কিন্তু।”
জানি ও কখনোই আর ফোন করবে না। তারপরও আনমনে বৃষ্টির দিনে হঠাত্‍ ফোন বেজে উঠলে দৌড়ে যাই। কাপা কাপা কন্ঠে বলি, “হ্যালো, আমাকে শুধু একটিবার সুযোগ দাও। আমি তোমাকে সব খুলে বলব। প্লীজ,মাত্র একটিবার।” ও পাশের কন্ঠস্বর শুনে সম্বিত ফিরে পাই।

মেঘের বৃষ্টিতে আমার কখনোই ভেজেহয় না। আমি চোখের বৃষ্টিতে ভিজি।

লিখেছেনঃ JaaJaabor Tashin

About Aurthohin

Check Also

ভাত, কাপড়, ভালবাসা

( ভুমিকায় বলে নেই, গল্পের বক্তা চরিত্রটির মত আমিও নারীবাদি নই।আমি মানি নিয়তি নারী পুরুষ …