ক্ষমা

1ছোট বেলা থেকেই খুব দুরন্ত ছিলাম। মা বাবার কথা শুনতাম না। মন যা চাইতো, তাই করতাম। কখনো কারো কথা ভাবিনি। জীবন সম্পর্কে ছিলাম উদাসীন। প্রায় ই বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়াতাম। খেলাধূলায় বেশ ভালই ছিলাম। তাই বলতে গেলে সারা দিন মাঠেই থাকতাম। স্কুল ফাকি দিয়ে মাঠে পড়ে থাকতে আমার যে কি ভাল লাগত…।।

আমরা যে মাঠে খেলতাম, তার পাশেই একটা girls school ছিল। একটু দুরন্ত হলেও কোন দিন কোন মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছি কিনা সন্দেহ।

মাঠে আমি ফুটবল ক্রিকেট ই খেলতাম বেশি। স্কুল ছুটি হওয়ার পর মঠের পাশের রাস্থা দিয়েই স্কুলের মেয়েরা যাতায়াত করত। আমি তাদের দিকে খুব একটা খেয়াল না করে খেলাতেই মনোযোগ দিতাম। আমার একটা বন্ধু ছিল, তুষার। সে একদিন আমাকে বলল, দোস্ত, একটা মেয়ে প্রত্যেক দিন স্কুল থেকে যাওয়ার সময় তোর দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি ভাবলাম ও মজা করছে, তাই হেসেই উড়িয়ে দিলাম।

পরের দিন মাঠ এ যাওয়ার পর বিষয় টি আমার খেয়াল ছিল। তাই ভাবলাম, একবার দেখেই নি তুষার সত্যি না মিথ্যে বলল। তো, স্কুল ছুটি হওয়ার পর আমি রাস্থার দিকে তাকিয়ে আছি। এমন সময় হঠাৎ লক্ষ করি, একটা মেয়ে আমার দিকে অনেক্ষন ধরে তাকিয়ে আছে। নাইন কি টেন এ পড়বে হয়তো। এমন সময় তুষার এসে বলল, তোকে যার কথা বলেছিলাম, এই মেয়েটিই সে। হঠাৎ রাস্থায় তাকিয়ে দেখি মেয়ে টা নেই। আমি তুষার কে বললাম, ধুর, ও এমনিতেই মনে হয় তাকিয়ে থাকে।

পরের দিন ও ঠিক একইভাবে মেয়েটিকে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখলাম। এভাবে বেশ কয়েকদিন হয়ে গেল। মেয়েটিকে দেখলাম একই ভাবে যাওয়ার সময় আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে। আমি একদিন ঠিক করলাম, দেখি তো, আমি একদিন মাঠে না থেকে অন্য কোথাও থেকে ওকে লক্ষ্য করি। যেই ভাবা, সেই কাজ। আমি পরের দিন রাস্থার পাশে একটি জায়গায় বসে রইলাম, যাতে ও আমায় দেখতে না পারে। সেদিন স্কুল ছুটির পর দেখলাম, মেয়েটি মাঠের দিকে কয়েকবার তাকিয়ে কয়েক বার দেখল। তার পর আপন মনে চলে গেল।

আমার কেন জানি মনে হল, ও আমাকে দেখতে না পেয়ে একটু দুঃখই পেল, অন্তত ওর মুখ দেখে তাই মনে হচ্ছিল। পরের দিন ছিল শুক্রবার। তাই সে দিন কেন যেন আমার ও মন খারাপ হয়ে গেল। ওর জন্য অজানা কোন এক টান অনুভব করলাম। তো, শনিবার আমি আবার মাঠে যাই। আজ খেলতে যাই নি, বরং ওকে দেখার জন্যই গেলাম। স্কুল ছুটি হল। অনেক্ষন রাস্থার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। কিন্থু ওকে দেখতে পেলাম না। হয়তো আজ স্কুল এ যায় নি… এই ভেবেই চলে এলাম। পরের দিনও ও আসলো না। আমার কখনো এতটা বিষণ্ণ লাগে নি, যতটা ওকে না দেখে লাগছিল। মনে মনে ভাবলাম, যদি এবার দেখা হয়, তাহলে ওর সাথে কথা বলবোই।

যাই হোক, পরের দিন আবারও রাস্থায় দাঁড়ালাম। হঠাৎ দেখলাম, ও আসছে। কোন এক অজানা খুশিতে আমার মন ভাল হয়ে গেল। ও কাছে আসতেই ওর সামনে গিয়ে বললাম… আমি প্রীতম, তুমি? ও প্রথমে আমায় দেখে কিছুটা অবাকই হল। তারপর বলল, আমি ঊর্মি।

আমি আর কিছু জিজ্ঞেস না করে তাড়াতাড়ি চলে এলাম। আমার এতটা খুশি কখনো লাগে নি যতটা না তখন লাগছিল। যাবার সময় লক্ষ করলাম, ও আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে। ওকে তখন কি অপূর্ব সুন্দর লাগছিল, বোঝাতে পারব না। তো, এই ভাবে বেশ কিছু দিন চলে গেল। আমি মনে মনে ওকে ভালবাসতে শুরু করলাম। আমাদের মধ্যে কোন কথা ও হতো না, হয় তো ওর বান্ধবীরা থাকত সাথে, তাই ও কথা বলতে চাইতো না।

তারপর ও ssc পাস করল। আমাদের এলাকার ই কলেজ এ ভর্তি হল। মনে মনে ওকে ভালবাসতাম, কিন্থু কোন দিন ওর বাসার ঠিকানা, ওর পরিচয় জানতে ইচ্ছে করে নি। আমি একদিন ঠিক করলাম যে, আজ ওকে বলেই দেবো আমার ভালবাসার কথা। তাই একদিন ওর কলেজ এর গেইটে দাড়িয়ে রইলাম। ও বের হল। আমি ওকে সোজাসজি বলে দিলাম, আই লাভ ইউ। ও হয়তো expect করে নি আমি ওকে এভাবে আমার ভালবাসার কথা ওকে বলব। ও মুচকি হেসে চলে গেল। পরের দিন আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম… ও হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়াল। আমার খুশি তখন দেখে কে। আমি যেন হাতে আকাশের চাঁদ পেয়ে গেলাম।

আমি ওকে বললাম, ফোন নাম্বার টা দেয়া যাবে? ও তখন একটা পেজ এ ওর ফোন নাম্বার লিখে দিল। আমি বাড়িতে এসেই ওকে ফোন দিলাম। আমার পরিচয় দেয়ার পর ই ও হাসতে লাগল। অনেক কথা বললাম। এভাবে চলতে থাকল। ও আমাকে ফোন করত না, আমিই ওকে ফোন করতাম। ও ফোন করলে আমি ফোন ধরতাম না, কেটে আমিই আবার কল করতাম। এই ভাবে বেশ কিছুদিন চলতে থাকল। আমাদের ভালবাসা যেন আরও গভীর হতে লাগল। আমরা প্রতিদিন কমপক্ষে ২ ঘণ্টা ফোন এ কথা না বললে শান্তি পেতাম না। ও নিজের কথা বলত আর আমি আমার কথা। আমি কোনদিন ওর পরিবার সম্পর্কে জানতে চাই নি, এমন কি ও ও চায় নি…

একদিন আমি ওকে বললাম যে আমি ওকে কোন উপহার দিতে চাই, কারন সেদিন ছিল ওর জন্মদিন। কিন্থু ও নিজেই ভুলে গিয়েছিল। আমি ভাবতে লাগলাম ওকে কি উপহার দেওয়া যায়… শেষে ঠিক করলাম ওকে ফুল আর চকলেট দেবো। কারন ও চকলেট খুব ভালবাসত। সেদিন ই ওর সাথে প্রথম বাইরে দেখা করলাম। আমার সারা দিন ওর সাথে খুব আনন্দে কেটেছিল। আমি কোন দিন ও ওই দিন টি ভুলব না, আমি ওকে বললাম। ও বলল, যদি আমি মারা যাই, তাহলে ও? আমি বললাম, তুমি মারা গেলে আমার মনে থাকবে কি করে? তখন তো আমিই পৃথিবীতে থাকব না…

খুব ভালবাসতাম ওকে। আমি জানতাম ও আমাকে ঠিক আমার মতই ভালবাসে।

এই ভাবেই চলে যাচ্ছিল দিন গুলো। ও hsc পাস করল। আমি hsc কমপ্লিট করার পর পড়াশোনা বাদ দিয়ে দেই। একদিন ফোন এ কথা বলছি। ও আমাকে বলল, ওর মা বাবা ওর বিয়ে ঠিক করেছেন। পাত্র বিদেশ এ থাকে, সেখানে ভাল চাকরি করে। আমি ওকে অভয় দিয়ে বললাম, ভয় পেয় না। আমি আমার বাবাকে বলে তোমাদের বাড়িতে সম্বন্ধ পাঠাবো। তার আগে আমি ওর বাবার নাম, বাড়ির ঠিকানা জিজ্ঞেস করলাম। ও যা বলল তাতে আমার স্তব্ধ হওয়া ছাড়া কোন উপায় ছিল না। ওর বাবার নাম ছিল গোপাল চন্দ্র। আমি ওকে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি হিন্দু??? ও বলল, কেন, তুমি হিন্দু নও?

আমার কথা বলার ভাষা হারিয়ে গিয়েছিল। আমি এতদিন যাকে ধরে ভালবাসি যে মেয়ে টা কে, আমি জানতাম না সে হিন্দু না মুসলিম!!! আমি ওকে বললাম যে আমি মুসলিম। ও কোন কথা বলছিল না। আমি ওকে কথা বলতে বললাম, কিন্থু ও ফোন টা কেটে দিল। তারপর অনেকবার ফোন করেছি ওকে, ও ফোন ধরেনি। শেষে নাম্বার ও বদলে ফেলে। ওর সাথে যোগাযোগ করার কোন উপায় ছিল না। শেষে ওর এক বন্ধুর কাছ থেকে ওর নাম্বার জোগাড় করি। ওকে অনেক বোঝাবার চেষ্টা করি। কিন্থু ও ওর মা বাবার মত এর বিরুদ্ধে

গিয়ে আমায় বিয়ে করতে পারবে না, ও আমাকে বলে দেয়। আমি ওকে যুক্তি দেই, আমরা পালিয়ে বিয়ে করব। পরে আমাদের বাড়ির লোকজন ঠিক ই মেনে নেবে। কেননা এটা খুব ই পরিষ্কার যে একটি মুসলিম ছেলের সাথে একটি হিন্দু মেয়ের বিয়ে সমাজ কখনো ভাল ভাবে মেনে নেবে না। অনেক বোঝানোর পর ওর অনিচ্ছা থাকা সত্তেও শুধু আমাকে ভালবাসে বলে ও রাজি হয়।

আমরা পালিয়ে বিয়ে করে এসে সবাই কে জানাব বলে সিন্ধান্ত নিলাম। তখনো আমাদের কারো ঘরের লোকজন ই আমাদের সম্পর্কের কথা জানত না।

একদিন রাতে আমি ওকে বললাম আমরা পালাব, তুমি তৈরি থেকো। আমি ওদের বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে একটা চায়ের দোকানে ওর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। বেশ কিছুক্ষন হয়ে গেল, কিন্তু ও এল না। আমি আরও অনেক্ষন অপেক্ষা করলাম। প্রায় ৩ ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর ও না আসায় আমি ওকে ফোন দিলাম। ফোন বেজেই যাচ্ছিল, কিন্তু কেউ ধরছিল না। ওর অপর আমার খুব অভিমান হল। ভাবলাম ওর বাড়িতে যাব। পরে অনেক কিছু ভেবে আর যাই নি।

সারারাত ওকে ফোন করি, কিন্তু কেউ ফোন ধরে নি। এক সময় ও ফোন বন্ধ করে দিল। খুব খারাপ লাগছিল আমার। মনে মনে খুব রাগ হচ্ছিল ওর ওপর। সারারাত ঘুমাই নি। সকালে ওর একটা বান্ধবি আমাকে ফোন দিয়ে যা বলল, তা শোনার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। ওর বান্ধবি বলল, গত রাতে ও রিকশায় করে কোথাও যাচ্ছিল, হঠাৎ এক বেপরয়া ট্রাক এসে সব কিছু শেষ করে দেয়। ও ঘটনাস্তলেই মারা যায়।

আমি আমার নিজের কান কে বিশ্বাস করতে পারলাম না। তরিঘড়ি করে ওর বাসার কাছে গেলাম, দেখলাম, ওকে পোড়ানোর জন্য শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমি সেখানেই অজ্ঞান হয়ে যাই……।

তার পর আর কিছু মনে নেই। ঠিক দুই দিন পর আমার জ্ঞান ফেরে…………

খুব ভালবাসতাম ওকে। ওকে বলেছিলাম, ওর আগেই আমি পৃথিবী ছেড়ে চলে যাব। কিন্তু, ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাকে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। জানি আমার দোষটি ক্ষমার অযোগ্য। তার পর ও যদি পার, আমায় ক্ষমা করে দিও।……

ওর মৃত্যুর জন্য আমিই দায়ী। আমি নিজেকে কখনো ক্ষমা করতে পারব না। কখনো না………………………।

*এটি সত্য ঘটনা… দিয়েছেন তাওকির…

About Kabir Hossain

Check Also

ভাত, কাপড়, ভালবাসা

( ভুমিকায় বলে নেই, গল্পের বক্তা চরিত্রটির মত আমিও নারীবাদি নই।আমি মানি নিয়তি নারী পুরুষ …