Home / মনের জানালা / কেশকন্যা

কেশকন্যা

keshএক দেশে একটা মেয়ে ছিল।
মেয়েটা খুব মিশুক ছিল।
সবার সাথে মিশত, কথা বলত। হাসাতো। স্কুলে কলেজে পরিচিত মুখ ছিল।
সব বিভাগের স্টুডেন্ট টিচাররা তাকে চিনত।
মেয়েটা পাড়ার ছেলেদের সাথে ক্রিকেটও খেলত!
সবাই ডাংকাবাজ বলত। মেয়েটি সত্যিই ডাংকাবাজ ছিল, একবার চড় মেরেছিল ইভটিজারকে।
দুরন্ত মেয়েটি পড়াশোনায় সেরা, পাশাপাশি গান-নাচও করত টুকটাক। কলেজের ফাংশনের উপস্থাপনা সে-ই করত।
সেই মেয়েটির একটি খুব প্রিয় জিনিস ছিল।
তা হল তার নিজের ঘন কাল চুল।
কোমর অবধি সেই ঢেউ খেলানো চুলের জন্য তাকে “কেশকন্যা” বলে ডাকা হত।
তার সেই চুলগুলো মাঝে মাঝে তার বোন এলেমেলো করে দিত, মেয়েটি ঝগড়া করত সেটা নিয়ে।
ঘুমালে নিচের থেকে একটু চুল কেটে দিত, সেটা নিয়ে রাগ করে দুদিন কথা বলত না মেয়েটি।
মা বলত, ‘সব চুল কেটে ন্যাড়া করে দিব তোর। চিরুনী করিস না কেন চুলে?’
বান্ধবীরা চুলে টান দিত কলেজে-প্রাইভেটে।
ঠিক পিছনের বেঞ্চের মেয়েগুলো শয়তানি করত কেশকন্যার ঘন কেশ নিয়ে।
.
কিন্তু বিধাতা সেটা চাইত না বোধোহয়।
মেয়েটির এলার্জি হল মাথায়। চুলের তেলে তার সমস্যা হতে শুরু করল।
সে মাথায় তেল দিতে পারত না, শ্যাম্পু করতে পারত না। স্পেশাল শ্যাম্পু ব্যবহার করতে হতো। তেল না দিতে পারায় চুলগুলো একদম সোজা থাকত না, একটু কুঁকড়ে থাকত।
.
তার কেশের প্রেমে পড়েছিল এক বালক।
মেয়েটিও ভালবাসত তাকে।
ছেলেটি মেয়েটির থেকে বেশ দূরে থাকত। মাঝেমাঝে ফটো দেখত মেয়েটির। নতুন ফটো চাইত তার কাছে।
মেয়েটি ফটো দিত। সেই কেশকন্যার কেশ দেখে প্রতিবার নতুন করে প্রেমে পড়ত ছেলেটি। কেন জানি তার মায়াবী মুখটাও অদ্ভুত রকমের ভাল লেগে যায় ছেলেটির!
সে ভালবেসে ফেলে কেশকন্যাকে, কেশকন্যার সত্ত্বাকে।
.
একদিন ছেলেটি সত্যিই দেখা পেয়েছিল সেই চুলের। সুন্দর সেই কেশ, একদম নিচের দিকে একটু কোকড়ানো।
মেয়েটি বলেছিল, নিচের খানিকটা চুল কেটেছে। শুনে ছেলেটি অবাক হয়েছিল, তার প্রতিফলন ঘটেছিল তার বাকহীন মস্তিষ্কে!
ছেলেটি সুন্দর চুলগুলো পুরোটা দেখা জন্য বলেছিল, “বৌ, তোমার রাবার ব্যান্ডটা খুলে দেই?”
মেয়েটি একটু হেসেছিল।
খুলে দিয়েছিল তার চুলের ব্যান্ডটা। মেলে দিয়েছিল ভাসামেঘের মত কালোকেশ।
.
হঠাৎই কিছু কালমেঘের আগমন ঘটল।
তাতে বৃষ্টি হল খুব।
বৃষ্টির পানি একটুকরো সোনাজমির ছোট ছোট চারাগাছগুলোর জন্য বড্ড বেশি ছিল। তাই অতিবৃষ্টিতে সেই চারাগাছগুলোর বিনাশ হয়ে গেল।
অঙ্কুরেই বিনাশ না হলেও চারাগাছে বিনাশ ছিল ব্যাপারটা।
.
হঠাৎই আরেকটা কালমেঘ এগিয়ে আসল কেশকন্যার দিকে। কালবৈশাখি মেঘের মত কালমেঘ, সাথে ঘূর্ণি বাতাস।
মেয়েটির মাথাতে একটি অপারেশন করানো খুব দরকারি হয়ে পড়ল। মেয়েটি এতে খুব কান্নাকাটি করতে থাকল, নিয়মিত খাওয়া-দাওয়া করা ছেড়ে দিলো।
কেননা, কেশকন্যার সুন্দর কেশ যে ফেলে দিতে হবে সেই অপারেশনে! যেমন আবর্জনা জমলে ফেলে দেয়া হয়, অপারেশনের জন্য সেই সুন্দর কেশগুলো হয়ে উঠল আবর্জনাস্বরূপ!
.
এক বিকাল।
কেশকন্যা জানালার পাশে বসে আছে।
আকাশে কিছু ঠান্ডা বাতাস, যা কিনা একই সাথে ভাল এবং খারাপ কিছু হবার ইংগিত বহন করে বলে শোনা যায়।
কেশকন্যা সেই বাতাসে তার কেশ ওড়াচ্ছে, আর মনটাকে ঠান্ডা স্পর্শ দেবার চেষ্টা করছে।
তার সুন্দর কেশ কাঁধের উপর দিয়ে বুকের ওপর এলিয়ে পড়েছে, হাতদুটো পড়ে রয়েছে তার কোলে।
ঠিক “হৈমন্তী” গল্পের হৈমন্তীর মত!
আকাশে “সাত ভাই চম্পা” পাখি উড়ছে।
ঠিক পাখি নয়, পাখিগুচ্ছ।
একসাথে ৭ টি পাখি।
কেশকন্যা শরীরে বাতাস মাখছে, আর পাখি দেখছে।
পাখিগুলোও কেশকন্যাকে দেখল। তারা একটু অবাক হল!
হ্যাঁ, আজ যে অপুর হৈমন্তীর মত বালকের কেশকন্যার মনটাও বড্ড খারাপ।
বড্ড ভারী…

লিখেছেনঃ ফারহান ফাহিম

About Ahsan

Check Also

ভাত, কাপড়, ভালবাসা

( ভুমিকায় বলে নেই, গল্পের বক্তা চরিত্রটির মত আমিও নারীবাদি নই।আমি মানি নিয়তি নারী পুরুষ …