Home / মনের জানালা / ”মেয়েটা” পর্ব-২

”মেয়েটা” পর্ব-২

meyeta২।
প্রচুর বই পড়তাম। এখনো পড়ি। লেখালেখির হালকাপাতলা অভ্যাস আছে। ব্লগে, বিভিন্ন পেইজে লেখালেখির একটা চেষ্টা করি। বন্ধু বান্ধবের সাথে আড্ডা দিতে প্রায় জেলা শিল্পকলায় যাওয়া হয়। একদিন আবিষ্কার করলাম সেখানে লেখালেখির একটা কর্মশালা হচ্ছে। পরিচালনায় হাসান হাফিজ। সাংবাদিক, কলাম লেখক। চিনি উনাকে। দারুন লিখেন। আমি তো মহাখুশি। ফরম কিনে জমা টমা দিয়ে দিলাম। সাতদিনের কর্মশালা। প্রথম দিন হাজির হলাম। গিয়ে দেখি শুধু একটা ছেলে এসেছে। বসলাম তার পাশে। নাম জামিল। সে নাকি একটা ফান ম্যাগাজিনে কাজ করে। খুবই রসিক। ছেলেটা প্রথমেই বলল ‘ভাই দেখবেন কেউ আসবে না। লেখালেখির প্রতি কারও মন নাই। সবাই ফেসবুক আর টুইটার নিয়ে ব্যাস্ত। দেশটা গেছেরে ভাই।’ আমি সামনের দিকে বসাতে, পেছনে আরও কে কে আসছে দেখি নাই। একটু পর একটা ছেলে এসে বলল, ‘আপনারা এই আটজন। আর কেউ ফরম কিনে নাই। একটু বসেন। পাঁচ মিনিট পর হাফিজ স্যার আসবেন।’ আটজন কে কে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে গিয়ে মাথাটাই ঘুরে গেল। ছয়টা ছেলে। আর দুইটা মেয়ে। একটা মেয়ে একটু বয়স্ক। ধারণা করলাম বিবাহিত। আরেকটা মেয়ে হল নিউমার্কেটের সেই সুন্দরী। সে আমাকে দেখে চোখ চোখ বড় বড় করে ফেলল। আমার বলতে ইচ্ছা করল, ‘কি ব্যাপার সানগ্লাস দেন নাই ক্যান?’
নির্দিষ্ট সময়ে স্যার আসলো। সবার নাম ধাম জিজ্ঞাসা করল। খুবই চমৎকার ভরাট গলার স্বর। বললেন, “বিখ্যাত লেখকদের লেখালেখি শুরুর গল্প পড়বা। তাহলে উৎসাহ আসবে। যেমন হুমায়ূন আহমেদ ‘বলপয়েন্ট’ উপন্যাসে তার লেখা শুরুর গল্প করেছেন। এছাড়া তার ভাই জাফর ইকবাল ‘হিমঘরে ঘুম ও অন্যান্য’ নামের একটা বইয়ে তার লেখালেখির কথা বলেছেন। প্রথমে তাদের বই বিক্রি হত না। আজ উনারা কত জনপ্রিয়। এইসব পড়বে। মনের জোর তাতে বাড়বে।” এইভাবে বিভিন্ন কথায় তিনদিন গেল। চারদিনের দিন ঘটল ঘটনা। স্যার বলল, ‘তোমাদের একটা গ্রুপ করে কাজ দিব। তোমরা আটজন, দুইজন করে মোট চারটা গ্রুপ হবে। তোমাদের বাসার ঠিকানা দেখে আমি কাছাকাছি যারা থাকে তাদের নিয়ে গ্রুপ করেছি।’ গ্রুপের নামগুলি বললেন। কানে কম শুনছি নাকি বুঝি নাই। আমি পড়লাম সেই সুন্দরীর সাথে। আমার বাসার আশেপাশে নাকি তার বাসা। আমাদের একটা টপিক দেয়া হল। ঐটার উপর দুইজন আলোচনা করে লিখে আনতে হবে। সেদিনের ক্লাস করে বের হতেই জামিল আমাকে বলল, ‘ভাই ঈদ মোবারক!’ আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘ঈদ তো অনেক আগেই চলে গেছে।’
‘আরে যে মেয়ের সাথে গ্রুপে পড়ছেন। এখন তো আপনার প্রতিদিন ঈদ।’
আমি হেসে বললাম, ‘কি যে বলেন। জামিল আপনার গার্লফ্রেন্ড নাই?’
সে বিমর্ষ মুখে বলল ‘ভাই আর বইলেন না। ফান ম্যাগাজিনে কাজ কইরাই ধরা খাইছি। ঐদিন ভার্সিটির এক মেয়েকে প্রপোজ করলাম। সে কি করল জানেন?’
‘কি করল?’
‘মাথায় চাটি মাইরা বলল, যা ব্যাটা ফান করিস না।’
আমি হো হো করে হেসে ফেললাম।
‘আরে ভাই হাইসেন না। এখন ভয় লাগে। দেখবেন কোনদিন হাসপাতালে পইরা আছি। বন্ধুদের ফোন কইরা বলব, রক্ত লাগবে, ব্যবস্থা কর। ওরা বলবে যা ব্যাটা ফান করিস না। আমি মইরা ভূত হইয়া থাকমুরে ভাই।’
আমি হাসতে হাসতে বিদায় নিলাম। দেখি সামনেই সুন্দরী দাঁড়িয়ে আছে। কারণ স্যার বলে দিয়েছে ক্লাস শেষে যেন নিজ গ্রুপের সদস্যের সাথে আলোচনা করে সব ঠিক করে নিই। আহারে, মেয়েটা মনে হয় আমার গ্রুপে পরার শোক এখনো সামলে উঠতে পারছে না। ঠিক করলাম খুব ভদ্র ভাবে কথা বলব।
‘আপনার সময় থাকলে আমরা কোথাও বসে ঠিক করি।’
‘শিউর।’ খুব নিচু স্বরে সায় দিল সে।
শিল্পকলার পাশে খুব দারুন একটা কফিশপ আছে। সেখানে বসলাম।
প্রথমে আমিই শুরু করলাম। ‘আমাদের টপিকটা আগে নেট এ সার্চ করে কিছু তথ্য নিয়ে নিব। তারপর লিখব। কি বলেন?’
‘না না। আগেই নেট ঘাঁটলে লেখাটার মধ্যে যান্ত্রিক ভাব চলে আসবে। আগে যা মনে আসে লিখে ফেলব। তারপর নেট থেকে তথ্য নিয়ে লেখাটা আরও সমৃদ্ধ করা যাবে।’
‘এক্সসেলেন্ট!’ বলতেই দেখি মেয়েটার মুখে একটা খুশির আভা খেলে গেল। প্রশংসা করলে নাকি মেয়েরা খুশি হয়। কোথায় যেন পড়েছিলাম। ‘যতই পড়িবে, ততই শিখিবে।’ মুরব্বীরা এসব কথা কি এমনি বানাইছে? সেদিন দুইজন হেটে হেটে ফিরলাম। ওর বাসার ঠিকানা, কোথায় পড়ে সব জানলাম। আমারটাও জানালাম। দুইজনেই একবারও সেই নিউমার্কেটের কাহিনী মুখে আনলাম না।
এর মধ্যে মেয়েটার সাথে ফোনে, ফেসবুকে আমাদের লেখা, লেখার বাইরের বিষয় নিয়ে অনেক আলোচনা হত। এইভাবে কর্মশালার শেষ দিন চলে এল। কোন গ্রুপের লেখাটা সেরা স্যার ঘোষণা করবেন। অবাক হয়ে শুনলাম আমরাই পেয়েছি প্রথম পুরস্কার। পাশ থেকে জামিল আমার কানে ফিসফিস করল। ‘এই রকম একটা মেয়ে গ্রুপে থাকলে বদি ভাইও ফার্স্ট হয়তো।’
আমিও ফিসফিস করে বললাম, ‘বদি ভাই কে?’
জামিল বলল, ‘আমাদের পাড়ার। ঝালমুড়ি বিক্রি করে।’
আমি অনেক কষ্টে হাসি চেপে রেখে বসে থাকলাম।
বইমেলায় শিল্পকলার প্রকাশিত একটা বইয়ে আমাদের দুইজনের লেখা ছাপা হবে। এটাই পুরস্কার। সেটার জন্যে দুজনকে প্রায় শিল্পকলায় আসতে হল। দুইজনের মধ্যে খুব ভাল বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। এরপর যা হওয়ার তাই হল। হ্যা ঠিক পাঠক। আপনারা যা ভাবছেন তাই হল। আমাদের মধ্যে অন্যরকম একটা সম্পর্ক হল। এইভাবে প্রায় তিনবছর চুটিয়ে প্রেম, ঝগড়া, খুনসুটি করে অনেক সমস্যার পর মেয়েটার সাথে আমার বিয়ে হল। সেই সমস্যাগুলির গল্প আরেকদিন হবে।

লিখেছেনঃ Sakawat Hossain Munna

About uddin rokon

Check Also

ভাত, কাপড়, ভালবাসা

( ভুমিকায় বলে নেই, গল্পের বক্তা চরিত্রটির মত আমিও নারীবাদি নই।আমি মানি নিয়তি নারী পুরুষ …