Home / মনের জানালা / মায়াবিনী

মায়াবিনী

mayabiniএখন শীতকাল। সকাল ৯.০০ টা,
বিরক্ত হয়ে ঘুম থেকে উঠলাম। আব্বু বাজারে যাচ্ছে তাই দরজা বন্ধ করার জন্য ডাকছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে দরজা লাগিয়ে লেপের নিচে ঢুকে পরলাম।
মহানিদ্রা প্রায় চোখের কাছে এসে পরেছে এমন সময় বিকট শব্দে মোবাইলের রিং-টোন বেজে উঠল। মেজাজ খারাপ করে কল রিসিভ করলাম। ওপাশ থেকে বলা হল-
-হ্যালো।
-হেলতে পারব না। শুয়ে আছি। কি চাই ?
-আজকে হরতাল, ঘর থেকে বের হবে না। চুপচাপ ঘরে বসে থাকবে, ওকে ?
-কুইনাইন খাইসো ?
-মানে ?
-আমি রাতে কি বললাম ? আমি বললাম না যে আমি ১২টা পর্যন্ত ঘুমাব আজকে ? আমার ঘুমটা ভাঙ্গালে
কেন ?
-ওহ, সরি। ভুলে গিয়েছিলাম।
-হুম। ফোনটা রাখো।
-রাগ কোরো না প্লিজ।
-হুম। ফোনটা রাখো।
-সরি।
-ফোন রাখো।
-সরি বললাম তো!
-ঐ ছেমড়ি চুপ! তোর সরির থোড়াই কেয়ার করি আমি! ফোনটা রাখতে বলছি কানে যায় না ??? ফোন রাখ। আর একবারও ফোন দিবি না। পেত্নি কোথাকার।
বলে আমি নিজেই ফোন বন্ধ করে দিলাম ঘুম।
ঘুম ভাঙল এগারটায়।
উঠে যাবতীয় কাজকর্ম সেরে খেতে বসলাম। হঠাৎ সকালের ঘটনার কথা মনে পরল। সাথে সাথে মাথায় বাঁশ। হায় হায়! একি করলাম! ঐ মেয়ে নিশ্চয়ই রেগে ফায়ার হয়ে আছে। তাড়াতাড়ি হাত ধুয়ে কল করলাম ওকে। যান্ত্রিক এক রমণী শুনিয়ে দিল “আপনার ডায়ালকৃত নাম্বারটি এই মুহূর্তে বন্ধ আছে, কিছুক্ষণ পর আবার ডায়াল করুন, ধন্যবাদ!” কিন্তু আমারতো কিছুক্ষণ পরে ডায়াল করলে চলবে না। এর আগেই কিছু একটা করতে হবে। নাহলে আজ কেয়ামত হয়ে যাবে। দ্রুত একটা প্ল্যান বানিয়ে গ্যারেজ থেকে গাড়িটা নিয়ে বের হয়ে পরলাম। সামনে একটা ফুলের দোকান পেয়ে বিভিন্ন ফুলসহ বেশ কয়েক রঙের গোলাপ কিনলাম। পাশে একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ঢুকে একটা বিগ সাইজ ডেইরি মিল্ক কিনলাম। এইবার চললাম মিশন ইম্পসিবলকে পসিবল করতে। বেশ কয়েক জায়গায় ভাঙ্গা গাড়ি দেখে মনে পরল যে আজ হরতাল। কিন্তু এখন সেদিকে নজর দিলে আমার চলবে না। হরতালের থোড়াই কেয়ার করে এগিয়ে চললাম। মায়ার বাসা কমলাপুরে। বনানী থেকে ওদের বাসায় পৌঁছুতে পাক্কা ৩ ঘণ্টা সময় চলে গেল। যাইহোক অবশেষে ওর বাসার নিচে এসে কলিংবেল টিপে দিলাম। এর আগে সুন্দর করে ফুলগুলো একটা বক্সে সাজিয়ে নিলাম। দরজা খুলে দিল আমার একমাত্র ক্লাস ফোর এ পড়ুয়া শালা মীর। মীর আমার পুরো নেওটা। তাই আমাকে দেখেই চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিল, তাড়াতাড়ি ওর মুখে হাত চাপা দিয়ে থামালাম। বললাম,
-যা জানতে চাইব ঠিক তাই বলবি, বাড়তি আওয়াজ করবি না। ঠিক আছে ?
মীর মাথা নাড়ল। আমি মুখ থেকে হাত সরিয়ে নিলাম।
-বাসায় কে কে আছে ?
-আমি আর আপু।
-আনটি কই ?
-আম্মুতো তোমাদের বাসায় গেছে।
-গুড। এইনে তোর ঘুষ, এটা নিয়ে চুপচাপ সামনের রুমে বসে থাক। এই বলে ওর হাতে ডেইরি মিল্কটা ধরিয়ে দিলাম। আর সে খুশিতে নাচতে নাচতে সামনের রুমে চলে গেল। বলে রাখা ভাল, আমার আর মায়ার ৭ বছরের প্রেমের কথা দুজনের পরিবারই জানে এবং খুশির সাথে মেনেও নিয়েছেন। আমাদের বিয়ের দিনও ঠিক হয়ে গিয়েছে। সামনের সপ্তাহেই আমাদের বিয়ে। সেটা নিয়ে ২ বুড়ি সকাল বিকেল নানান রকমের পরিকল্পনা বানান, আজও তাই করছেন নিশ্চয়ই। আমি বাসায় কল করে আম্মুকে বলে দিলাম আনটিকে আজ বাসায় রেখে দিতে, কারন হরতালে বের হওয়া ঠিক হবে না। শুনতে পেলাম আমার শাশুড়ি আমার বিচক্ষণতার প্রশংসা করছেন। আমি মুচকি একটা হাসি দিলাম, কিছু বললাম না। আম্মু আমাকে সাবধানে থাকতে বলে ফোন রেখে দিলেন। তো এখন আমার পথ ক্লিয়ার। বিড়ালের মত নিঃশব্দে পা ফেলে মায়ার ঘরের দরজায় পৌঁছে গেলাম। আস্তে করে দরজা খুলে দেখি আমি যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই হচ্ছে। মায়া রাগ করে বারান্দায় বসে ইয়ারফোনে গান শুনছে। আমার দিকে পিঠ দিয়ে থাকায় আমাকে দেখতে পায়নি। ওকে রাগ করলে আরও অনেক বেশী মায়াবী লাগে। কিছুতেই নজর সরানো যায় না। তাই আমি মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করে ওকে রাগিয়ে দেই। এখন আমি বহু কষ্টে নিজেকে সামলে ওর দিক থেকে নজর ফেরালাম। তারপর আমি চুপচাপ আমার কর্মে লেগে গেলাম। বাক্স থেকে ফুলগুলো বের করে ঘরটাকে সুন্দর করে সাজালাম। ২০ মিনিট পর নিজের কর্ম দেখে নিজেই গর্বিত। এইবার নিঃশব্দে ওর পিছনে দাঁড়িয়ে ওকে জড়িয়ে ধরলাম। আশা করছিলাম ও ভয় পাবে, কিন্তু ও একটুও ভয় পেল না। শুধু নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। এরপর আমার দিকে ফিরে মুখ ঝামটা দিয়ে বলল,
-এতো পিরিতি দেখাতে হবে না। সুন্দরী কোন মেয়েকে গিয়ে পিরিতি দেখাও। আমার মত পেত্নীকে না
দেখালেও চলবে।
-দেখ ১০টা না ৫টা না ১টা মাত্র বউ আমার, এরকম করলে চলে ? আমি ভীষণ সরি! প্লিজ মাফ করে
দাও। আর কখনও এইসব বলব না। প্রমিজ।
-সেটা নাহয় বাদই দিলাম। হরতালে দিয়ে বের হতে নিষেধ করলাম, এরপরও বের হলে কেন ?
-দেখ ১০টা না ৫টা না ১টা মাত্র বউ আমার, সে রাগ করলে আমি কিভাবে থাকি? তাই চলে এলাম।
তাছাড়া আনটিও আজ আমাদের বাসায় থেকে যাবেন তাই ভাবলাম তোমাকে একটু সঙ্গ দেই এসে।
-হুম। আর কোন কাজ নাই তার! আমাকে জ্বালাতে আসছে।
এইসব বলে গজগজ করতে করতে ও ঘরের ভিতর ঢুকল এবং ঘরের চেহারা দেখে পুরো থমকে গেল। এইবার ফিনিশিং টাচ দিয়ে ষোলকলা পূর্ণ করলাম। একটা কালো গোলাপ নিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে ওর দিকে বাড়িয়ে ধরলাম। ও চিৎকার দিয়ে সব রাগ ভুলে আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমিও হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। হঠাৎ কাবাবের হাড্ডি হয়ে হাজির হল মীর। আমাদের অবস্থা দেখে ফিক করে হেসে দিয়ে চলে গেল। আমি তাড়াতাড়ি মায়াকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম,
-তোমাদের বাসায় খাওয়ার কিছু আছে ? থাকলে দাও। আমার ভীষণ খিদে পেয়েছে।
-হায় হায়! আমিতো এখনও রান্নাই করিনি। আসলে সব দোষ তোমার। আমার মেজাজ খারাপ না করালে
আমি কখন রান্না করে ফেলতাম।
-সরি বললাম তো।
-ঠিক আছে। তুমি বস, আমি কিচেনে গেলাম।

এরপর আমি আর মীর প্লে-স্টেশনে ডুয়েল খেলতে লাগলাম আর মায়া কিচেনে আমাদের জন্য রান্না করতে চলে গেল। খেলতে খেলতে মায়ার নামে হাজারটা নালিশ দিতে লাগলো মীর। আর এসব শুনে মায়া কিচেন থেকে ওর সাথে ঝগড়া করতে লাগলো। আর আমি ওদের খুনসুটি দেখে হাসতে লাগলাম। যতই ঝগড়া আর মারামারি করুক না কেন আসলে ওদের গলায় গলায় মিল। খেতে বসে ২ ভাইবোন মিলে খাওয়াতে খাওয়াতে আমার ওজন ২ কেজি বাড়িয়ে দিল। খাওয়ার পর ৩ জনে কিছুক্ষণ গল্প করলাম। তারপর মায়া মীরকে ঘুম পারিয়ে দিল। ঘুমন্ত মীরের দিকে তাকিয়ে ছিল মায়া। আর আমি তাকিয়ে ছিলাম ওর দিকে। হঠাৎ দেখি ওর চোখে পানি। আমি কিছু না বলে মায়াকে ওর রুমে নিয়ে এলাম। দেখি তখনও ও নিরবে কাঁদছে। আমি জানতে চাইলাম,
-কি ব্যাপার মায়াবিনী ? কাঁদছো কেন ?
-মীরকে ছেড়ে থাকতে আমার ভীষণ কষ্ট হবে জাবির। আমি জানি ওরও অনেক কষ্ট হবে।
-আরিহ! আমি কি তোমাকে নিয়ে পরপারে যাচ্ছি নাকি ? আমিতো তোমাকে শুধু আমার বাসায় নিয়ে
যাচ্ছি। আর সেখানে মীর যখন খুশি যেতে পারবে। মন খারাপ করার দরকার কি ?
-হুম।
এরপরও ওর মন ভাল হচ্ছে না দেখে আমি উঠে গিয়ে সাউন্ডবক্সে গান ছাড়লাম এবং মায়াকে কাছে টেনে নিলাম। ও একটু লজ্জা পাচ্ছিল। তাই ওকে সহজ করার জন্য আমি বললাম,
-অবশ্য একটা কাজ করা যায়।
-কি ?
-আমি তোমাদের ঘর জামাই হয়ে যেতে পারি।(শয়তানি একটা হাসি দিলাম।)
-হাড্ডিগুলো সব ভেঙ্গে রেখে দেব। শয়তান! গ্ররররররর……
এবার আমি হা হা করে হেসে দিলাম। ওর মুখেও হাসি ফুটে উঠল। ধীরে ধীরে আমরা গানের তালে তালে নাচতে শুরু করলাম। অস্তগামী সূর্যের লাল আভা এসে মায়ার ঘরটিকে আলোছায়ার খেলায় ভাসিয়ে দিল।
বাতাসে ছিল ফুলের সৌরভ, চোখে ছিল অদম্য ভালবাসা, কানে ভাসছিল মুগ্ধ করার মত গান, ঐ মুহূর্তে মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুখি পুরুষ আমি।
Everywhere I’m looking now
I’m surrounded by your embrace
Baby I can see your halo
You know you’re my saving grace
You’re everything I need and more
It’s written all over your face
Baby I can feel your halo
Pray it won’t fade away
I can feel your halo halo halo
I can see your halo halo halo
হঠাৎ এই আবেগঘন মুহুর্তে আমাকে জড়িয়ে ধরল মায়া। বলল,
-কখনও আমাকে ছেড়ে যাবে নাতো জাবির ? আমাকে সবসময় এভাবেই ভালবাসবেতো ?
-বাসব মায়াবিনী, বাসব। কোথাও যাবনা তোমায় ছেড়ে।
অস্তগামী লাল সূর্যের আলোতে দেখলাম ওর চোখে পানি চকচক করছে। কিন্তু আমি মুছে দিলাম না। কারন এ কান্না সুখের কান্না, এ কান্না আনন্দের কান্না, এ কান্না সফলতার কান্না, এ কান্না ভালবাসার মানুষটিকে কাছে পাওয়ার কান্না। এরপরের ঘটনাগুলো খুব দ্রুত ঘটে গেল। আমাদের বিয়ে, বউ ভাত সহ আরও যত কাজকর্ম ছিল সব হয়ে গেল। এরপর আমি আমার মায়াবিনী মায়াকে নিয়ে সুখের সংসার গড়ে তুলি। মাঝেমধ্যে মীর আমাদের বাসায় এসে থাকে। সব মিলিয়ে আমরা একটি সুখী পরিবার। তবে আমাদের মধ্যেও ঝগড়া হয়, খুনসুটি হয়। তাই বলে একজনের প্রতি আরেকজনের ভালবাসা কমে না। কখনও কমবেও না। কারণ প্রকৃত ভালবাসা কখনও মুছে যায় না, হারিয়ে যায় না, কমে যায় না। আমরা ভালবাসি তাই, ভালবেসে যাই…

লিখেছেনঃ Abandøned Warriør Jamesbøy

About Ashiq Mahmud

Check Also

ভাত, কাপড়, ভালবাসা

( ভুমিকায় বলে নেই, গল্পের বক্তা চরিত্রটির মত আমিও নারীবাদি নই।আমি মানি নিয়তি নারী পুরুষ …