ফেরা

feraaভোর সকালে পাখির কিচিরমিচির শুনতে মহা বিরক্ত লাগে।শীতের সকালের মিষ্টি ঘুম ভাঙার অপরাধে পাখির গলা টিপে দিতে ইচ্ছা হচ্ছে।বুঝিনা কবি সাহিত্যিকরা পাখির বিরক্তিকর গলায় ও কী খুজে পায়।
ঘুম ভেঙে বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগলো এটা বুঝতে,আমার ফোনটাই যে এত বিরক্তস্বরে ডেকে যাচ্ছে।
তারচেয়েও দশগুণ বিরক্ত হয়ে মুখটা বাংলার পাঁচ বানিয়ে কষ্ঠে বিরক্ত এনে ফোনটা রিসিভ করলাম।
-হ্যালো কে?
-আপনি কে?(মেয়েকন্ঠ)
-আমি কে মানে..!!ফাজলামী করেন?আমি কে সেটা না জেনে ফোন দিছেন কেন?যত্তসব…
ফোন কেটে দেয়ার সাথে সাথে আবার কিচির মিচির কন্ঠে ফোনটা বেজে উঠলো।এবার রিসিভ করে জাস্ট কানে ধরে রাখলাম।কিছু বললাম না।
-উপাশ থেকে বলল,ইশরাপু এত রাগ করো কেন?
-সিয়াইম্মা তুই..!!
-জি আমি।
-দাঁড়া এইবার আসার সময় তোর লাগি রাবুর একটা পুরান থ্রিপিস নিয়া আসুম।তোর চেহারাও তো মাশআল্লাহ সুন্দরী মেয়েরাও ফেল।তোর গলায় মেয়েলী স্বরটা তো সুপার আর খালা খালুরও মেয়ের শখ পুরা হইব।
-ইশরাপু আজকেই আসো না প্লিজ।
-মাথা খারাপ আজকে এগারো তারিখ।আইজ হরতাল।বিয়া শাদীই করলাম না।এত তাড়াতাড়ি মরার ইচ্ছা নাই।
-তুমি খালি প্রতিদিনই বলো আজকে না আজকে না।তুমি না বলছো পরীক্ষা শেষ হইলে একমাস আমাদের বাসায় থাকবা?মিথ্যুক একটা.এরজন্যই কোন ভার্সিটিতে চান্স পাও নাই।
-চাইছিলাম থার্টিফাস্ট নাইট তোদের বাসায় থাকমু।এহন আর আসুম না।যা ভাগ…
-আপু কালকেও কিন্তু একটা বিশেষ দিন।12-12-12 আসো না প্লিজ।অনেক মজা হবে।
-তোর 12-12-12 তুই গুলে খেয়ে ফেল।রাখি বলে,ফোন রেখে দিলাম।
ছোট খালার ছোট ছেলে সিয়াম।থার্টি ফাস্ট নাইট পুরান ঢাকায় ওদের বাসায় থাকব বলায় ডিসেম্বর আসার পর থেকে,প্রতিদিন একবার করে ফোন দিয়ে আমার আরামের ঘুম হারাম করে ফাজিলটা।আমার ঘুম ভাঙানোর অপরাধে ওরে একহাজার একটা বকা দিয়ে লেপটা টেনে নিয়ে আবার শুয়ে পড়লাম।এক বছরের জন্য এখন আমি অবসর।আমি তিনবেলার খাবার একবেলায় খাইলেও বাসার কেউ কিছু আর মনে করে না এখন।হাল ছেড়ে দিছে….

দ্বিতীয়বারের মত আম্মার চিল্লাচিল্লিতে ভয়ঙ্কর রকমের ভয় পেয়ে আমার ঘুম ভাঙল।আম্মা চিল্লাবে এটাই স্বাভাবিক,আম্মা না চিল্লালেই বরং আমি ভীত থাকি।সবচেয়ে অবাক করা এবং ভয় পাওয়া ব্যাপারটা হচ্ছে,আজ আম্মুর সাথে সাথে আব্বুও চিল্লাচ্ছে।
আসলে কোথাও চান্স না পাওয়াতে আমি আজকাল একটু বেশিই ভয়ে ভয়ে থাকি।যে যেই ভুলই করুক না কেন,ঘুরে ফিরে কেমনে জানি সব দোষ আমার ঘাড়ে চলে আসে।ভাবলাম আজও বোধ হয় ঘুমাই ঘুমাই তেমনি কোন বড় সাইজের অপরাধ করে ফেলছি।
ভয়ে ভয়ে বিড়ালের মত নিশ্বঃব্দে আমার ঘরের দরজাটা একটু খুলে জাস্ট মুখটা একটু বের করলাম।দেখি আম্মু বোরখা পরে বের হয়ে যাচ্ছে।আমি যে কী বুজলাম নিজেই বুঝলাম না।দৌড়ে গিয়ে আম্মুর হাত ধরে বলি,আম্মু যাইয়ো না প্লিজ।আম্মু হা করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো।পরে শুনি ঘটনা অন্য,সিয়ামকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
সকালে আমার সাথে ফোনে কথা বলে খেলতে বের হইছে।আর এখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল,এখনো বাসায় ফিরে নাই।

তারপর যা হয় আর কি,আত্মীয়স্বজনরা সব হরতাল উপেক্ষা করে পুরাণ ঢাকায় ছোট খালার বাসায় হাজির।সবাই রাস্তার এগলি ওগলি খুঁজে বেরাচ্ছে।ততক্ষণে ছোট খালার কান্নার মাত্রা বেড়ে গেছে “আমার ছেলে কোনদিন সন্ধ্যার পরে বাইরে থাকে না” ইত্যাদি ইত্যাদি।সন্ধ্যার পরপর একটা অচেনা নাম্বার থেকে খালুর ফোনে ফোন আসলো।ফোনে বলা হয়,সকাল দশটার মধ্যে বিশলক্ষ টাকা না দিলে সিয়ামকে মেরে ফেলবে।আরও অনেক হুমকি ধামকি দিল।কিন্তু কোথায় কিভাবে টাকা দিতে হবে সেসব ব্যাপারে কিছু না বলেই ফোন কেটে দিল।এতক্ষণ তো সবাই একটা স্বান্তনা নিয়ে খোঁজাখুঁজি করছিল,বাচ্চা মানুষ হয়তো কোথাও খেলায় মজে আছে।কিন্তু ফোনে মুক্তিপণ চাওয়ার পর থেকে স্বান্তনা খোঁজার রাস্তাটাও আর খোলা থাকলো না।তারপরের ঘটনা খুব দ্রুত ঘটলো,যা মোটামুটি সবারই জানা।রাত নয়টা সাড়ে নয়টার দিকে খবর আসলো সিয়ামকে পাওয়া গেছে।ও ভালো এবং নিরাপদেই আছে যাত্রাবাড়ি থানায়।ছোট খালু,আব্বু,ছোটমামা ওরে আনতে গেলো।আর বাসার ভিতর আমরা সবাই রূদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছি।ছোট খালু ছেলের চিন্তায়,দুই পায়ের দুই জুতা পড়ে বের হয়ে গেছে কোন খবরই নাই।

ওরে নিয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত দুইটা বেজে গেলো।ঘরে ঢুকে ওর আম্মুর চেহারা দেখে প্রথমবারের মত জ্ঞান হারালো আমার এই সাহসী পুচকা নায়ক ভাই।তখনো পুরা ঘটনা আমাদের কাছে পরিস্কার না।বাসায় নিয়ে আসার সময় আব্বু একবার জিজ্ঞেস করছিল বাট ভয়ের চোটে স্পস্ট কিছু বলতে পারে নি।শুধু ওর হাত পা আর মুখের কাছে ছিঁলে যাওয়া দাগ দেখতে পাচ্ছিলাম।
সবাইকে দেখে মোটামুটি আস্বস্ত হলো আমার ছোট্ট ভাইটা।সবাই ওকে টেনে গালে মুখে চুমো খাচ্ছিল।একটু নরমাল হওয়ার পর ছোট খালা ওরে গোসল করিয়ে খাইয়ে দিল।এরপর গোল হয়ে সবার মাঝে বসে ঘটনার যে বিবরন দিল,তা অনেকটা এমন-

খেলা শেষে বাসার গলিতে ঢুকছি তখন রাজুর(ভাড়াটিয়া)খালাত ভাইয়ের সাথে দেখা হয়।উনি নতুন একটা বড় একুরিয়াম কিনছে অনেক সুন্দর ওটা দেখাতে নিয়ে যেতে চাইলো।আমি প্রথমে বলছিলাম আম্মু বকবে।কিন্তু পরে যখন উনি বলছে বেশিসময় লাগবে না,তখন আমি উনার সাথে গেছি।আমারে যাত্রাবাড়িতে একটা চারতলায় ফ্লাটে নিয়ে দরজা আটকে দেয়।একুরিয়ামের কথা বললে আমাকে ধমক দেয়।তারপর চাপাতি আর ছুড়ি দেখিয়ে মুখে স্কচটিপ পেচিয়ে হাত পা দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলে।শব্দ করলে জবাই করে ফেলার হুমকি দেয়।তারপর বক্সখাটের ভিতরে ঢুকাই দিয়ে,খাটের উপর কাঠ আর জাজিম তোষক বিছাই দেয়।ওখানে বসে থাকা যায় না,আঁধশোয়া হয়ে ছিলাম।একটু পরে দরজা লাগানোর শব্দ শুনে বুঝি,দরজা বাইরে থেকে আটকে চলে গেছে।আমি মুখ অনেক নাড়ানোর চেষ্ট করি কিন্তু অনেক স্কচটিপ লাগানোর ফলে ব্যথা পাচ্ছিলাম।খাটের নীচে গরমে এক সময় স্কচটেপ ঘেমে হালকা হয়ে যায়।মুখটা উঠিয়ে খাটের কাঠের সাথে লাগিয়ে ঘষা দেই,স্কচটেপটা খুলে পরে যায়।অনেক কষ্টে মুখের কাছে হাত এনে অনেক দাঁত দিয়ে দড়ি কাঁটতে থাকি।একসময় দেখি দড়ি খুলে গেছে,তারপর হাত দিয়ে পায়ের বাঁধন খুলে ফেলি।মাথা আর হাত দিয়ে ধাক্কা দিয়ে খাটের কাঠ আর জাজিম তোষক সরাইছি।মাথায় অনেক ব্যথা পাইছি।কী করবো বুঝতে না পেরে দৌড়ে জানালার কাছে গিয়ে অনেক চিল্লাচিল্লি করছি, আলু পেয়াজ ছুড়ে দিছি।সবাই তাকায় কিন্তু কেউ আমার কথা বুঝে না।তখন চিন্তা করছি শয়তানটা যদি আবার এসে যায় আমারে মেরে ফেলবে।তাই আমিও দরজা ভিতর দিয়ে লক করে দিছি।তারপর কাগজ কলম খুজে বের করে অনেক গুলো কাগজে লিখছি,”আমি সিয়াম।আমাকে অপহরণ করে চারতলায় আটকে রাখছে।আমার আব্বুর নাম্বার 01714…..আম্মুর নাম্বার 01914….।আমাকে বাঁচান”।তারপর নীচে ছুড়ে দিছি।

এইটুকু বলে থেমে যায় সিয়াম।কিছু মনে করার চেষ্টা করে কিন্তু পারে না।অনেক ভয় পাইছে চেহারা দেখে বুঝা যায়।পরের ঘটনা বিভিন্ন পত্রিকা ও মিডিয়ার কারণে মোটামুটি সবারই জানা।কাউকে বলে দেয়া হয় নি কিন্তু আমরা সবাই সিয়ামের কথা শেষ সাথেসাথে হাততালি দিয়ে উঠি।বৃষ্টিপু(কাজিন) আদুরে গলায় বলে উঠলো আমার আদুরে ভাইটা রে।লজ্জা পেয়ে ছোট খালার আঁচলে মুখ লুকায় সিয়াম।পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য…..

উত্‍স্বর্গ ও কিছু কথা:উত্‍স্বর্গটা অবশ্যই আমার নায়ক ভাই সিয়ামকে।আসলে আমাদের ভাগ্য অনেক ভালো ছিল আর আল্লাহর রহমত ছিল তাই সিয়াম ফিরে আসতে পারছে।কিন্তু বেশিরভাগ সিয়ামদের পরিনতি হয় অনেক বেশি ভয়ঙ্কর।আমাদের অনেক বেশি সচেতন হতে হবে এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।তাহলেই হয়তো মায়ের আচল তলে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকবে সিয়ামরা….

লিখেছেনঃ Anzuman Esra

About Ashiq Mahmud

Check Also

ভাত, কাপড়, ভালবাসা

( ভুমিকায় বলে নেই, গল্পের বক্তা চরিত্রটির মত আমিও নারীবাদি নই।আমি মানি নিয়তি নারী পুরুষ …