Home / মনের জানালা / “নীলিমার প্রান্তর” পর্ব-১

“নীলিমার প্রান্তর” পর্ব-১

nilimar prantor(১)
মাঝ রাতের কাছাকাছি।কিন্তু প্রান্তের চোখে এখনো ঘুম আসছে না।মোবাইলটা বালিশের তল থেকে বের করে টাইম দেখে আবার রেখে দেয়।পলকহীন চোখে তাকিয়ে আছে কালো ছায়ার আড়ালে লুকিয়ে থাকা আকাশটার দিকে।কয়েকটা তারা জ্বলজ্বল করছে আকাশটার বুকে।তন্ময় হয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

ফোনের আওয়াজে ধ্যান ভঙ্গ হল।করুণ একটা ভায়োলিনের টোন দেয়া।কয়েকদিন হল এই রিংটোনটা দিয়েছে সে।বালিশের তল থেকে ফোনটা বের করল।তাকিয়ে দেখে নীলিমা ফোন করেছে।বুকের বা পাশটাতে তীক্ষ্ন একটা ব্যাথা অনুভূত হচ্ছে।সারা শরীরে কেমন যেন একটা কাঁপুনির সৃষ্টি হয়েছে।কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা রিসিভ করল সে।

-কিরে ফোন রিসিভ করতে এতক্ষণ লাগে নাকি!ঘুমাচ্ছিলি নাকি?
-না,জেগেই আছি।
-কি করছিস এত রাতে?আর ঘুমাচ্ছিস না কেন?
-এমনিই ঘুম আসছে না।ফোন দিয়েছিস কেন তাই বল।
-আমার ইউ কে যাওয়ার ফ্লাইট ঠিক হয়ে গেছে।পরশু ফ্লাইট।তোকে জানানোর জন্য ফোন করলাম।
-ও আচ্ছা।

কথাটা বলে প্রান্ত চুপ করে থাকে।চোখের কোণে কয়েক অণু অশ্রু ভাসছে।পড়ে যাবে আর একটু হলেই।

-কিরে কথা বলছিস না যে?
-আরে এটাতো অনেক ভালো খবর।
-তুই কি খুশি হয়েছিস?

নীলিমার কথায় কেমন যেন একটা বিষন্নতার ছাপ।

-আরে এতে অখুশি হওয়ার কি আছে রে।
-কালকে একটু দেখা করতে পারবি?
কিছুক্ষণ চুপ থেকে প্রান্ত উত্তর দেয়
-পারব।বল কোথায় দেখা করবি?
-যেখানে আমরা সবসময় বসি।
-আচ্ছা।কয়টার সময়?
-বিকালের দিকে।এই ধর ৫ টায়।
-আচ্চা,এখন ঘুমাতে যা।কালকে দেখা হবে।বাই।
-বাই।

প্রান্ত ফোনটা রেখে নিজেকে আর সংবরণ করতে পারে না।কয়েক ফোঁটা অশ্রু গাল বেয়ে পড়ে যায়। শুয়ে শুয়ে পুরোনো স্মূতির পাতরে হাতড়ে বেড়াতে লাগল সে।

(২)
আজ প্রান্তের কলেজের প্রথম দিন।অনেক উত্তেজিত হয়ে আছে সে।নতুন একটা লাইফে প্রবেশ করছে সে।প্রান্ত আর তার কয়েকটা বন্ধু একি কলেজে ভর্তি হয়েছে।বন্ধুদের ডাকে নিচে নেমে আসল।একসাথে রওনা দিল কলেজের দিকে। নবীনবরণ উপলক্ষে কলেজটাকে অনেক সুন্দর করে সাজানো হয়েছে।এক স্যারকে জিঙ্গেস করতে তিনি তাদের অডিটরিয়ামে যেত বললেন।প্রান্ত বন্ধুসহ কলেজ অডিটরিয়ামে প্রবেশ করল।চারদিকে চোখ বুলাল সে।ডান পাশের দুসারিতে মেয়েরা আর বাম পাশের দুসারিতে ছেলেরা।মেয়েদের সারিতে তাকাতেই তার মনে হল আজ এখানে নবীণ বরণ না এখানে ফ্যাশন শো এর আয়োজন করা হয়েছে। প্রান্ত ছেলেদের সারির একেবারে কোণায় যেয়ে বসল।বন্ধুরা মিলে আড্ডা দিচ্ছে।হটাত্ একটা মেয়ের দিকে তার চোখ আটকে গেল।তেমন কোন সাজগোজ নেই।কিন্তু লম্বা চুল আর সবুজ আর হলুদ রংয়ের একটা পোশাকে তাকে অনেক সুন্দর লাগছে।মেয়েটা তার পাশের একটা মেয়ের সাথে গল্প করছে।কতক্ষণ যে এভাবে তাকিয়ে ছিল তা বলতে পারবে না।বন্ধুদের কথায় ধ্যান ভাঙ্গল তার।
-মামু,মেয়টা অনেক সুন্দর তাইনা!তোমার তো পছন্দ হইছে মনে হইতাছে।বাতচিতটা সাইরা আসি।
বলেই রাসেল মেয়েটার দিকে চলে গেল।প্রান্ত আঁটকাতেই পারল না।রাসেলের ওপর রাগ হল।ব্যাটা একটু বেশি বুঝে।কলেজের প্রথম দিনেই দিলো তে ব্যাটা খারাপ বানাইয়া। রাসেল মেয়টার কাছে যেয়ে কি বলল আল্লাই জানে।হটাত্ প্রান্ত দেখল মেয়েটা তার দিকে তাকিয়ে আছে।প্রান্ত দেখেই মাথা ঘুরিয়ে ফেলল।পুরা প্রেস্টিজ পাংচার।আইয়া ল ভুটকু রাসেল তোর খবর আছে।তোর মোটকু শরীর আইজকা মাইরা চিকনা বানাইয়া ফেলুম।মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় প্রান্ত। রাসেল হাসিমুখ নিয়ে প্রান্তর কাছে আসল।রাসেল বেঞ্চে বসার সাথে সাথেই প্রান্ত একের পর এক কিল দিতে লাগল।রাসেল যত বলে থামতে তত আরো মারে।হটাত্ প্রান্তর চোখ মেয়েটার দিকে পড়ল।দেখল মেয়েটা তার দিকে তাকিয়ে হাসছে।এটা দেখে প্রান্ত রাসেলকে মারা থামিয়ে দিল।

-মামু,তোমারে যদি আসল কথাটা কইতাম তাইলে আর এই মাইর দিতা না।
-চুপ থাক,ভুটকু।তুই ঐ মাইয়ারে যাইয়া কি কইছস।
-যা কওয়ার কইছি।মাইয়া তোরে যাওয়ার আগে দেখা করতে কইছে।
-শালা চাপা মারার আর জায়গা পাও না না।
-বিশ্বাস না করলে আমার কি!
-যদি তোর কথা সত্য না হয় তাইলে তোর খবর আছে।
-আগে তো দেখা কর।

প্রান্ত ঠিক করল মেয়েটা যেহেতু দেখা করতে বলেছে তাই সে দেখা করবে। অনুষ্টান শেষে প্রান্ত বাইরে বেরিয়ে আসে।মেয়েটাকে খুঁজতে থাকে।একসময় খুঁজে পেল।একটা গাছের নিচে একা একা দাড়িয়ে আছে।প্রান্তের বুকের হার্টবিট বেড়ে গেছে।মেয়েটার কাছে যায় সে।

-হাই!
-হ্যালো!
-সরি আমার বন্ধুটা আপনাকে….
-প্রথম দিনেই পছন্দ করে ফেললেন!
-আসলে আমি কিছু বলি নি ওকে।হটাত্ আপনার দিকে চোখ পড়ল,তাকিয়ে ছিলাম।ও দেখে মনে করেছে আমার ভালো লেগেছে তাই হয়তো আপনাকে কিছু বলেছে।
-ও….প্রেম করেছেন কয়টা? মেয়েটায় কথা শুনে প্রান্ত আকাশ থেকে পড়ল।বলে কি এ মেয়ে!প্রথম দিনেই কাউন্টার এটাক!
-জি না,আমার সাথে কারো রিলেশন নেই।
-ও এর জন্য প্রথম দিনেই পছন্দ করে ফেললেন আর রিলেশনে যেতে মনস্থির করে ফেললেন।
প্রান্ত বুঝশ মেয়টা তাকে পচানোর চেষ্টা করছে।
-আপনি যেটা মনে করছেন তা না।
-তাই নাকি!আচ্ছা আমি যাই এখন।
বলে মেয়েটা কয়েক পা সামনে এগুলো।তারপর পিছনে ফিরে তাকায়ি বলল
-আপনার নামটা জানা হলো না।
-আমি প্রান্ত।
-আমি নীলিমা।আচ্ছা যাই।
বলেই মেয়েটা চলে গেল।প্রান্ত কিছুক্ষণ ভ্যাবলার মত দাঁড়িয়ে রইল।এরপর সেও বাড়ির পথে রওনা দিল। এভাবেই প্রান্তের সাথে নীলিমার পরিচয়।এক সময় অনেক ভালো বন্ধুও হয়ে গেল তারা।একসাথে ঘুরতে যাওয়া,আড্ডা দেয়া,পড়াশোনায় একে অপরকে সাহায্য করা।দিনকে দিন তাদের বন্ধুটাও গাড় হতে থাকল।
ধীরে ধীরে প্রান্ত দুরবল হতে লাগল। এক্সময় সে বুঝতে পারল সে নীলিমাকে ভালোবেসে ফেলেছে।
।কিন্তু বলতে পারেনা।গভীর বন্ধুত্বটা যদি ভেঙ্গে যায়!তাই সাহস করে আর বলা হয় না। দেখতে দেখতে তারা কলেজ পাস করে ভার্সিটিতে ওঠে।তাদের বন্ধুত্বটাও শক্ত হতে থাকে।প্রান্ত অনেক চেষ্টা করেছে কিন্তু বলতে পারে নি।তাছাড়া প্রান্ত নীলিমার আচরণেও তেমন কিছুর ইঙ্গিত পায় নি।তাই অব্যক্ত কথা অব্যক্তই রয়েই যায।আর প্রান্ত বন্ধুত্বের আড়ালে ভালোবেসেই যেতে থাকে।

লিখেছেনঃ এম এস কে তাম্মিন

About Ashiq Mahmud

Check Also

ভাত, কাপড়, ভালবাসা

( ভুমিকায় বলে নেই, গল্পের বক্তা চরিত্রটির মত আমিও নারীবাদি নই।আমি মানি নিয়তি নারী পুরুষ …