Home / মনের জানালা / “জোনাকিরা কথা বলে” পর্ব-২

“জোনাকিরা কথা বলে” পর্ব-২

junakir kotha
দৈনিক প্রভাত আলোর অফিসে বসে আছে হাসান ।
মাহমুদ সাহেব একগাদা ফাইলের স্তুপের মধ্যে এলোমেলো ভাবে বসে আছেন, দুটো ফাইল হাতে, সামনে আরও ৩ টা। ফাইল থেকে চোখ না সরিয়েই তিনি বললেন, পারলে তাহলে শেষ করতে?
দেরীই করে ফেললাম মাহমুদ ভাই এবার, শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। হাসান চায়ের কাপ হাতে নিল।
ফাইনাল চেক করেছ? নাকি আবার করতে হবে?
নাহ, সব ঠিক আছে।
লিখেছ কিসের ওপরে ?
আত্মজিবনী ধরনের।
ফাইল থেকে মুখ তুলে চশমার ওপরে দিয়ে তাকালেন মাহমুদ, এগুলো এখন আর কেউ পড়তে চায়না হাসান, পাঠক চায় প্রেমের গল্প। যে সময়ের যে চাহিদা।
পারলাম না এবার, মাথা একদম শূন্য, পারলামই না। হাসানের মাথার পেছনের ব্যাথাটা আবার শুরু হয়েছে। আশে পাশের সব কিছু আঁকা বাঁকা হতে শুরু করেছে।
কালকের মধ্যেই সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে। কালকে সন্ধ্যায় একটা কল দিও আমাকে।
মাথা নাড়ে হাসান, তার ব্যাথা বেড়েই চলেছে।
তোমার শরীরর কি খারাপ ? চোখ মুখ এমন শুকনো কেন?
হাসান উঠে দাঁড়ালো,তেমন কিছু না। শুধু মাথা ব্যাথা, ঘুম হলেই ঠিক হয়ে যাবে।
ভালো একটা ডাক্তার দেখাও, আমার পরিচিতি একজন আছে, তুমি আজকেই পারলে যাও, আমি বলে দেব।
আচ্ছা যাব, আজকে যাই মাহমুদ ভাই।কালকে কল দেব আপনাকে।

পৌষের ক্লান্ত বিকেল।
হাসান এলোমেলো ভাবে পা ফেলছে। তার মনে হচ্ছে সে বাসা পর্যন্ত যেতে পারবে না,রাস্তা বেঁকে যাচ্ছে পায়ের নিচে। শুকনো পাতা পায়ের নিচে পড়তেই অদ্ভুত একধরনের শব্দ হচ্ছে। ঝরা পাতার দিনগুলো এমনই হয়, বছরের অন্য সব সময় থেকে আলাদা। প্রকৃতি এসময় নিজেকে রহস্যের চাদরে ঘিরে ফেলে, বৃত্তবন্দী হয়ে যায় সে।

লীনার বাসায় যাওয়া দরকার। হাসান জানে তার কোনো ব্যবহারে মেয়েটা অনেক কষ্ট পেয়েছে, কিন্তু কি সেটা বুঝতে পারছে না সে। ডাক্তারের কাছেও যাওয়া দরকার। চোখের অবস্থা খারাপ তার, দেরী করে হলেও বুঝতে পেরেছে সে। আশেপাশের মানুষগুলো কেমন অদ্ভুত ভাবে তাকাচ্ছে তার দিকে, ভাবছে এত শীতে পাতলা একটা শার্ট গায়ে কিভাবে। তার ঠাণ্ডা লাগছে না, সে শুধু ক্লান্ত। প্রচণ্ড ক্লান্তি

তার শরীরকে অবশ করে দিচ্ছে। সে একটু ঘুমোতে চায়, প্রশান্তির একটা ঘুম।


পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দ্রুত কিছু ঘটনা ঘটলো।
লীনার বিয়ে আচমকাই ঠিক হয়ে গেল। পাত্রপক্ষ এসেছিল দেখতে, কিন্তু মেয়ে তাদের এতই পছন্দ হলো যে আংটি পরিয়ে যাবে না, পরের শুক্রবার আকদ। লীনা পাগলের মত খুঁজছে হাসানকে। তার মোবাইল ফোন বন্ধ। শেষ বারের মত কিছু বলবে সে হাসানকে। জানে এতে কাজ হবে না, কিন্তু নিজের কোনো ভুলের কারণে সে তার জীবনটা নষ্ট হতে দেবে না।
হাসান চোখের যে টেস্টগুলো করিয়েছিল,রিপোর্টে ২ দিনের মধ্যে অপারেশান করানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে।তার দুচোখেরই রেটিনা ৮০ ভাগ ছিঁড়ে গিয়েছে।এধরনের সার্জারিতে সাফল্যের ভাগ খুব কম, তাও তারা চেষ্টা করবে যাতে চোখের আলোটা ধরে রাখা যায়।
মাহমুদ সাহেব দুবার হাসানের খোঁজে বাসায় লোক পাঠিয়েছেন, তাকে পাওয়া যায়নি। কোথায় কেউ বলতে পারছে না। শেষে দরজার নিচে থেকে চিঠি রেখে রেখে এসেছেন।

ঘটনাক্রমে রিপোর্ট আর চিঠি দুটোই লীনার হাতে পড়লো।

আজ হাসানের অপারেশান ।

হাসপাতালের সাদা বিছানায় নিজেকে কেমন যেন বেমানান লাগছে ওর। কিছুক্ষন আগেই সুন্দর মত একজন ডাক্তার এসে তার চোখের প্রেসার মেপে গেলো। চোখে ড্রপ দিতে দিতে বলল, মাইনর সার্জারি, একদম চিন্তা করবেন না।

হাসানের চোখ বন্ধ, সে মৃদু হাসল।
আপনার সাথে কেউ নেই, কাউকে কি খবর দিতে হবে?
কেউ সাথে থাকা কি জরুরী? চোখের পাশ দিয়ে পড়তে থাকা পানি সে মুছতে মুছতে বলে হাসান।
না, আমাদের এখানে নার্সিং খুবই ভালো, তারপরেও আপন কেউ থাকাটা ভাল।
এমন কেউ নেই, স্বাভাবিক গলায় বলে হাসান।

সে জানলো না যেতে যেতে ডাক্তার কেমন অদ্ভুত চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে।

হঠাৎ করেই খুব চোখ জ্বলছে, শুকিয়ে আসছে গলা। সিগারেট খেতে পারলে ভালো হত, সেটা কোনো ভাবেই সম্ভব না। এরা আর যাই দিক সিগারেট দেবেনা, তাও আবার সার্জারির ঠিক আগে। চিন্তাগুলোক মনে হচ্ছে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। আচ্ছা লেখাটা কি শেষ পর্যন্ত ছাপা হবে? না হওয়ারই কথা, আসলেও আজকাল কেউ আর আত্মজীবনী পড়ে না। ছাপা হলে লীনা কি কিছু বুঝতে পারবে? পারবে বুঝতে যে হাসান চেয়েছিল সারা জীবন শুধু তার সাথেই জোছনা দেখতে? চেয়েছিল সেই মুখটি দেখতে জোনাকির আলোয়, তার প্রিয় মুখখানি।

চোখ বন্ধ করলো হাসান। ক্রমশ সব কিছু ঘোলাটে হয়ে আসছে।এমন একটা অন্ধকার জগতে সে প্রবেশ করতে যাচ্ছে যেখানে দ্বিতীয় কারো অস্তিত্ব নেই।

লীনা হাসানের ঘরে বসে আছে।
আজকে তার বিয়ে, সে একেবারে চলে এসেছে। তার হাতে রিপোর্ট আর মাহমুদ সাহেবের চিঠি। সব শেষে সে চিঠিটা খুলল।

হাসান,
তোমার লেখা এবছর প্রথম হয়েছে, সামনের সংখ্যায় তোমার সাক্ষাৎকার যাচ্ছে। সাথে চলতি সংখ্যার একটা কপি দিয়ে দিলাম।
জানতাম তোমার পথ একদিন তুমি ঠিকই বের করে নেবে।

দোয়া রইলো।
মাহমুদ হাসান

পুনশ্চঃ একজন প্রকাশক যোগাযোগ করেছেন, ওনারা তোমার লেখা নিয়ে বই করতে চাচ্ছেন সামনের বই মেলায়। ঠিকানা দিলাম, যোগাযোগ করে নিও।

লীনা ছাদে বের হয়ে এল। তার শরীর থর থর করে কাঁপছে। সে নিজেকে সামলাতে পারছেনা। জোনাকির আলো তার চোখের পানিতে পড়ে চিক চিক করছে, সব জোনাকিরা আজ কথা বলছে যেন।
——————————————————————————–
*** হাসান আর কোনো দিন লিখতে পারেনি, অপারেশানের তিন মাস পর দুটো চোখই হারায় সে। জোনাকির আলোয় তার প্রিয় মুখটা তার আর দেখা হয়নি। লীনা হাসানকেই বিয়ে করে। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর তারা জোনাকির সাথে কথা বলে, এসময় লীনা শক্ত করে হাসানের হাত ধরে থাকে।

লিখেছেনঃ শুভ্র

About Ashiq Mahmud

Check Also

ভাত, কাপড়, ভালবাসা

( ভুমিকায় বলে নেই, গল্পের বক্তা চরিত্রটির মত আমিও নারীবাদি নই।আমি মানি নিয়তি নারী পুরুষ …