Home / মনের জানালা / “জোনাকিরা কথা বলে” পর্ব-১

“জোনাকিরা কথা বলে” পর্ব-১

junakir kotha
মোবাইলটা একটানা ভাইব্রেট করেই চলেছে।
এত ভোরে তাকে কেউ কল দেয়ার কথা না। ভাইব্রেশানের শব্দ মাথা ব্যাথা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে হাসানের। কয়েকদিন ধরেই ভোতা এক ধরনের ব্যাথা ভারী করে রাখছে মাথার পেছনটা। মনে হয় না আর ঘুম আসবে। ভোর ছটার আগে কোনো দিনই বিছানায় যেতে পারেনা সে,ইনসমনিয়া আছে তার। সারা রাত ছাদেই হাঁটাহাঁটি করে সময় পার করে।
দোতলা বাড়ির ছাদের ছোট্ট এই ঘরটাতে সে গত দুই বছর ধরে আছে, দরজা খুললেই খোলা ছাদ। তার লেখালেখির জন্য আদর্শ জায়গা।বিরক্ত করার কেউ নেই, শহরের যান্ত্রিক কোলাহল থেকে দূরে। যখন সন্ধ্যা নামে, আরও নিস্তব্ধ হয়ে যায় জায়গাটা যেন। বাড়ির দক্ষিন দিকের পুরোটা ছোট জঙ্গলের মত, ছাদের এক পাশ ঘেঁষে আরেক পাশে চলে গিয়েছে ঝোপের মত গাছগুলো। রাত বাড়ার সাথে সাথে সেখানে জোনাকির আলো দেখতে পাওয়া যায়। মাঝে মাঝে হাসানের মনে হয় জোনাকিগুলো তার কথা বুঝতে পারে, যখনি সে বের হয়, আলোগুলো কেমন যেন একটা ছন্দে চলে আসে, যেন তারা কথা বলছে।
ঘুমটা এখন খুব বেশী দরকার ছিল। কাল সারা রাতেও সে লেখাটা শুরু করতে পারেনি। অথচ গত সপ্তাহে লেখা জমার শেষ তারিখ ছিল।প্রভাত আলোর মাহমুদ ভাই নিতান্ত তাকে পছন্দ করেন বলে আগামী মঙ্গলবার পর্যন্ত সময় দিয়েছেন, যেখানে ছাপাই হবে শুক্রবারে। সে যে লিখতে পারছে না শুধু তাই না, তার চিন্তাশক্তির ক্ষমতা কমে গিয়েছে বলে তার ধারণা ।শেষ দশ দিন ধরে কাগজ কলম নিয়ে শুধু বসে থাকে, চোখে শূন্য দৃষ্টি, তাকিয়ে থাকে সাদা কাগজ গুলোর দিকে। মাথা কাজ করে না তার।
৩২ টা এসএমএস।
একটানা ভাইব্রেশান এর কারনটা বোঝা গেল। না দেখেই বুঝতে পারছে কে করেছে, এধরনের কাজ একজনই করতে পারে। লীনা জহুরুল ইসলাম মেডিকেলে শেষ বর্ষে পড়ছে। অনর্গল কথা বলতে পারে যে একটা মানুষ, এটা তাকে দেখলে বোঝা যায়। হাসান আজ পর্যন্ত তাকে কোনো বিষয়ে সিরিয়াস হতে দেখেনি। দেখা যাবে সে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে, কিংবা সবার সামনে হঠাৎ করেই এমন কিছু বলবে যেটা কেউ বলার কথা ভাবতেও পারেনা। মানুষকে বিব্রত করাই তার প্রথম লক্ষ্য। হাসানের মনে আছে একবার শুধু তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, আচ্ছা, তুমি পড়ো কখন? যখনই তোমাদের বাসায় আসি, দেখি তুমি হয় থাকো মোবাইলে নয়তো গল্পের বই হাতে।
আপনার কি ধারণা মোবাইলে আমি কারো সাথে প্রেম করি হাসান ভাই? আচমকা লীনার পাল্টা প্রশ্নে থতমত খেয়ে যায় হাসান আর বুঝতে পারে প্রশ্নটা করা কত বড় বোকামি হয়েছে।
আপনি যদি ভাবেন আমি প্রেম করছি, একদম ঠিক ভাবছেন। যে কোনো সময়, কাজী অফিস থেকে আপনাকে কল দেব, আমার একজন সাক্ষী শর্ট আছে। লীনার চোখে চাপা কৌতুক।
হাসান চুপ করে থাকে, কিছু বলার পায়না। লীনার সাথে কথাতে না জড়ানোই ভাল, অযথা কে হেনস্থা হতে চায়।
ঘুমাতে চেষ্টা করে হাসান, লীনার এসএমএস নিয়ে তাকে বিচলিত মনে হয়না। তার মেসেজের কোনো অর্থ থাকে না কখনই,একই মেসেজ বার বার দিয়ে যায় সে। “আপনার জোনাকিরা আজ কথা বলেছে?”, “আজকে কোথায় ছিলেন সারাদিন?” সে কোথায় ছিল সারাদিন এটা জানার জন্য পঞ্চাশ বার মেসেজ দেয়ার কি আছে এটা তার মাথায় আসেনা।
হাসান উঠতে চেষ্টা করলো। মাথাটা যেন বিছানায় আটকে আছে, এত ভারী। মোবাইল হাতে নিল সে। তার ধারণাই ঠিক। লীনা লিখেছে “আজকে বাসায় আছেন?” এটা বত্রিশবার পাঠানোর মানে কি? লেখাগুলো হঠাৎ করে মনে হল বাঁকা হয়ে যাচ্ছে। মনের ভুল নাতো, ঘুম না হওয়াতে সবকিছু মনে হয় এলোমেলো দেখছে।
দরজায় কি টোকা পড়ছে ? নাকি এটাও বিভ্রান্তি?
এত সকালে কেউ আসার কথা না।


লীনা আজ ক্লাস ফাঁকি দিয়েছে।
সে এখন দাঁড়িয়ে আছে হাসানের ঘরের সামনে। জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলছে ,তার কিছু কথা বলা দরকার হাসানকে। আজকে যে করেই হোক সেটা বলে যাবে। প্রথমবার টোকা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল, তেমন সকাল হয়নি। তার ওপর আজকে কুয়াশা একটু বেশী, দুহাত দূরের কিছু দেখা যাচ্ছে না। এমন সময় কারও জেগে থাকার কথা না , সে জানে হাসানের রাত জাগা অভ্যাস আছে।
আবার টোকা দিতেই খুলে গেল দরজা, খোলা ছিল কিন্তু সে খেয়াল করেনি।
বাইরে থেকেই লীনা দেখতে পেল হাসানকে, বিছানায় কেমন অদ্ভুতভাবে যেন শুয়ে আছে।
আপনি যে আমার একটা মেসেজেরও উত্তর দিলেন না? ঘরে ঢুকেই খুব স্বাভাবিক ভাবে জিজ্ঞেস করে লীনা।
হাসান চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে থাকে। সে এখনও বাঁকা দেখছে। লীনার মাথা যে শরীর থেকে বেঁকে যেন পাশে সরে গিয়েছে। এটা ভুল না, সত্যি সত্যি সে সব কিছু বাঁকা দেখছে।
আপনার কি শরীর খারাপ নাকি? চেহারা এমন দেখাচ্ছে কেন? লীনার মেজাজ আস্তে আস্তে খারাপ হচ্ছে, সে বুঝতে পারছে ইচ্ছা করেই হাসান তার মেসেজের উত্তর দেয়নি, সে জেগেই ছিল।
এবারও জবাব দিলনা হাসান, নিশ্চিত হল আসলেও সে বাঁকা দেখছে সব কিছু।হঠাৎ করেই মাথাটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে,মনে হচ্ছে লীনা কিছু বলছে, সে শুনতেও পাচ্ছে, কিন্তু বুঝতে পারছে না কথাগুলো।
আপনি আমার কথার উত্তর দিচ্ছেন না কেন? শীতল কণ্ঠে বলে লীনা।
আমি বুঝতে পারছি না, কি জানতে চাও তুমি?
আপনার কি শরীর খারাপ?
না, ঘুম হচ্ছেনা ঠিক মত, ঠিক আছি আমি।
মেসেজের উত্তর দেননি কেন আমার? দয়া করে কোনো সস্তা অজুহাত দেবেন না। হঠাৎ করেই লীনার প্রচণ্ড কান্না পাচ্ছে।
টাকা ছিল না মোবাইলে, একটু আগেই দেখলাম।
জানতাম এর থেকে ভাল অজুহাত আপনার কাছে নেই। চোখ এমন লাল কেন আপনার? জ্বর নাকি?
কিছু হয়নি লীনা। তুমি বলো কি জন্যে এসেছ? উঠে বসার চেষ্টা করে হাসান।
আজকে ক্লাস হবে না, বাসা থেকে বের হয়ে পড়েছিলাম। ভাবলাম আপনার এখানে আসা যায়। নির্বিকারে মিথ্যা বলে লীনা।
কি বলবে বুঝে পায়না হাসান।
আপনি কি আমার একটা কথা শুনবেন?
তাকিয়ে থাকে হাসান। তার চোখ ঘোলা।
আজকেই ডাক্তারের কাছে যাবেন আপনি, আজকেই। আমি কিছু জানিনা আপনাকে আজকেই যেতে হবে।
তুমি অযথাই চিন্তা করছো। ঘুম হলে ঠিক হয়ে যাবে।
না, আজকেই যেতে হবে, এখনই। আমি আপনাকে নিয়ে যাব। বলেই হাসানের হাত ধরে লীনা, তার কি হয়েছে সে বুঝতে পারছেনা, এত ছেলেমানুষি করছে কেন সে?
হাসানের মাথা ব্যাথা তীব্র হচ্ছে। হাত সরিয়ে নিল সে।
থমকে গেল লীনা।
শুয়ে পড়লো হাসান। সব কিছু আঁকাবাঁকা দেখছে সে । একবার মনে হলো যেন দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল লীনা। বিছানা দুলছে,দরজাটা যেন ভেঙ্গে পড়ে যাচ্ছে। সেদেখলোনা যাওয়ার সময় লীনার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।

লিখেছেনঃ শুভ্র

About Ashiq Mahmud

Check Also

ভাত, কাপড়, ভালবাসা

( ভুমিকায় বলে নেই, গল্পের বক্তা চরিত্রটির মত আমিও নারীবাদি নই।আমি মানি নিয়তি নারী পুরুষ …