Home / মনের জানালা / “আলোর ছায়া” পর্ব-৩

“আলোর ছায়া” পর্ব-৩

aloor chayaফুরফুরে মন নিয়েই বাসায় ফিরল মিনহাজ।কিন্তু তারপরও মনের ভিতর কি জন্য একটা খচখচ করছিল।সে ভাবছিল দু বছর পর ফিরে লাবণ্য তাকে মনে রাখবেতো?কিন্তু পরক্ষনেই মনের সব সন্দেহ ও জুজু কাটিয়ে ঠিক করলো,বিয়ে সে করবেই এবং সেটা শুক্রবারেই।কিন্তু অসুস্থ মায়ের মুখ,দরিদ্র বাবার অভাবি চেহারা তাকে অন্যমনস্ক করে দিচ্ছিল।বিকালে মিনহাজ রেডি হচ্ছিল কাজী অফিসে যাবার জন্য। বিধাতা বোধহয় তার এই রেডি হওয়া দেখে নীরবে মুচকি হেসেছিলেন।

ঠিক ওই দিন বিকালে মিনহাজের মা মারাত্মক শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে আইসিউতে ভর্তি করা হল। দিশেহারা মিনহাজ কি করবে বুঝতে পারছিল না। শেষে ঠিক করল লাবণ্যের বাসায় ফোন করে তার মায়ের অসুস্থতার কথা জানিয়ে দেবে। কিন্তু তার আগেই বাসা থেকে বেড়িয়ে যাওয়ায় ফোনে লাবণ্যকে পেল না।অসহায় বোধ করল সে।কিভাবে অসুস্থ মাকে আইসিইউতে রেখে ৪২ কিমি দূরের কাজী অফিসে যায়?নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে ঠিক করল রাতেই লাবণ্যকে জানিয়ে দেবে আগামীকাল সকালেই তারা বিয়ে করছে।কিন্তু বিধাতা বোধহয় আবারো মুচকি হাসলেন ।রাতে লাবণ্যের প্রচণ্ড জ্বর থাকায় ওর সাথে মিনহাজ কোনভাবেই যোগাযোগ করতে পারল না। চূড়ান্ত দুর্ঘটনা হল শনিবার সকালে।রবিবার হরতাল থাকায় শনিবার সকালের ফ্লাইটেই লাবণ্যরা সপরিবারে ফ্রান্সে চলে গেল।দুনিয়াটা যেন অন্ধকার হয়ে আসছিল মিনহাজের।কি করবে বুঝতে পারছিল না সে।লাবণ্য যে তার প্রতি একটা বাজে ধারনা করেছে এই ব্যাপারে তার কোন সন্দেহ রইল না।তারপরও তার আশা ছিল রাগ ভেঙ্গে লাবণ্য হয়ত তার সাথে যোগাযোগ করবে।কিন্তু মিনহাজের আশা পুরন হল না।দুবছর পর খবর পেল লাবণ্য চট্টগ্রাম মেডিকেলে চান্স পেয়েছে। মিনহাজ একবার ভাবল গিয়ে সরাসরি দেখা করবে।কিন্তু সাহসে কুলালো না। তীব্র অপরাধ তাকে একেবারে আছন্ন করে ফেলল। ফোন,মোবাইল,ইমেইল কোনটাই লাবণ্যের অভিমান ভাঙ্গাতে পারল না। মিনহাজ হারিয়ে ফেলল জীবনের প্রতি সকল আগ্রহ…………………….
………..

৩৫ বছর পরের কথা। প্রখ্যাত মেডিকেল স্পেশালিষ্ট ডা মিনহাজের ওপেন হার্ট সার্জারি হবে। ফ্রান্স থেকে কার্ডিয়াক সার্জন আসছেন।ওটি টেবিলে শুয়ে ডা মিনহাজ ভাবছিলেন তার দীর্ঘ ৫৫ বছরের জীবনে পাওয়া না পাওয়ার কথা।এই জীবনে তিনি যা চেয়েছেন তা সবই পেয়েছেন্‌,শুধু একটা জিনিস পাননি।মিনহাজ ভাবছে অপারেশন সাকসেস না হলে এই অপুরনতা নিয়েই হয়তো মারা যেতে হবে।এই কথা যখন ভাবছিল তখন বিখ্যাত মহিলা কার্ডিয়াক সার্জন ওটিতে এসে পৌঁছেছেন।উনি এসেই মিনহাজের হাত ধরে কুশল জিজ্ঞেস করে বলল,’আমি ডা লাবণ্য হায়দার,আপনি ভাল আছেন?’সহকারি ডাক্তাররা তখন মিনহাজকে অ্যানসথেসিয়া দিচ্ছিল।৩৫ বছর পর হলেও মিনহাজ লাবণ্যকে চিনতে একটুও ভুল করলো না।আবেগতাড়িত মিনহাজ কোন জবাবই দিতে পারল না,শুধু একপলকে তাকিয়ে রইল। এদিকে অ্যানসথেসিয়ার প্রভাব শুরু গেছে।পুরোপুরি চেতনা হারানোর আগে মিনহাজ শুধু বিড়বিড় করছিল,’আমি কি কার সাথে কথা বলছি’,…এই কথা শুনে কানে যেতেই ডাঃ লাবণ্য চমকে ঘাড় ঘুরিয়ে মিনহাজের দিকে।তিন যুগ হারিয়ে যাওয়া ভালবাসাকে চিনতে একমুহূর্তও দেরি হল না লাবণ্যের।দুফোটা অশ্রু চোখের বাধ ভাঙছিল তখন সহকারি সার্জন বলল ‘আসুন ম্যাডাম অপারেশন শুরু করি।ওদিকে মিনহাজের মনে হলো লাবণ্যের মুখটা আস্তে আস্তে অনেক দূরে সরে যাচ্ছে, রঙ্গিন মুখটা আস্তে আস্তে সাদা তারপর ধুসর তারপর একসময় মিলিয়ে গেল।পুরোপুরি চেতনা হারানোর আগে মিনহাজের মনে হল,এখন সে মারা গেলেও তার কোন আক্ষেপ থাকবেনা্‌, কেননা ভালবাসার মানুষের হাতে মৃত্যুতেও তার আপত্তি নেই।

লিখেছেনঃ মাহমুদ হাসান

About Borhan Uddin

Check Also

ভাত, কাপড়, ভালবাসা

( ভুমিকায় বলে নেই, গল্পের বক্তা চরিত্রটির মত আমিও নারীবাদি নই।আমি মানি নিয়তি নারী পুরুষ …