Home / মনের জানালা / সুপ্ত ভালবাসা

সুপ্ত ভালবাসা

supto va;obashaআজ একটু তাড়াতাড়িই ঘুম ভেঙেছে শুভ’র । হাতে চা’এর মগটা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পুকুর পাড়ের দিকে এগোচ্ছে আর ফুলের সুবাস উপভোগ করছে । আজ সকালের আবহাওয়াটা একটু অন্যরকম লাগছে। আকাশে জায়গায় জায়গায় মেঘ জমে আছে কিন্তু বৃষ্টি নেই । ঠান্ডা একটা বাতাস বইছে আর মাঝে মাঝে বাতাসটা একটু জোরে হওয়াতে মেঘটা সরে সরে যাচ্ছে ।

– এই ভাইয়া, সাবধানে যা ! কই যাচ্ছিস পুকুর পাড়ে ? পিছন থেকে নুহার সতর্কবানী ।
শুভ’র ছোট বোন নুহা এইচ.এস.সি পরীক্ষা দিয়েছে । বাবা মা কেউ নেই। নুহার যখন ৭ বছর তখন অ্যাক্সিডেন্ট এ মারা যায় ।

– আয় না, এখানে একটু বস্ আমার পাশে। একটা গান শুনাতে পারবি ?
– পারব না, নুহা ঢঙ-করে বলল তারপর গাইতে শুরু করল
– “এসো নিপুবনে, ছায়াবিথী-তলে এসো কর স্নান নবধারা জলে”
– চল ভাইয়া তোকে স্কুলে দিয়ে আসি না হলে দেখা যাবে বাচ্চারা এসে অপেক্ষা করতে করতে চলে গেছে ।
একটা গানের স্কুলে শুভ বাচ্চাদের গান শেখায়। প্রথমদিকে স্টুডেন্ট কম থাকলেও শুভ এখন বেশ পপুলার। গান গাওয়ানো শেষ হলে স্কুলের বারান্দায় খানিকটা সময় কাটায় শুভ । সামনে একটা ফুলের বাগান আছে, সেখানে অনেক ফুল । বিভিন্ন ফুলের সুবাসে মনটাকে ভরিয়ে নিচ্ছে শুভ।

– Excuse me ! একটা কথা জিঞ্জেস করতে পারি ?
– কে ? একটু ইতস্ত শুভ।
– জ্বী আপনি আমাকে চিনবেন না, আপনি আমাকে বলতে পারবেন যে, এখানে সকাল ৭ টায় কে গান করান?
– কেন বলুন তো ?
– Actually আমি প্রতিদিন সকালে এই রাস্তা দিয়ে হাঁটি আর ওনার গান শুনি, খুব ভাল লাগে । অদ্ভূত সুন্দর গান করেন উনি ।
_ জী, শুনে ভাল লাগল, আমিই আসলে গান করাই ।
_ ও ! তাই ! আসলে আমি আমার ভাইঝি (টুশি) কে গান শেখাতে চাই । আপনি কিন্তু না করতে পারবেন না ।
– আচ্ছা পাঠিয়ে দেবেন কালকে থেকে । আর তাছাড়া এটা তো আমার Duty
– না আ আ ফুফুর বেশি বকবক করার শাস্তি ও তো ওকে পেতে হতে পারে বলেই দুষ্টু হাসি হাসল জয়িতা ।
– আচ্ছা আপনার নামটা ?
– জ্বী, আমি জয়িতা, জয়িতা রহমান—-
– আমি শুভ, শুভ চ্যাটার্জি ।
– আপনাদের কারও ফোন নাম্বারটা দিন । যদি কখনো ক্লাস নিতে না পারি ফোন করে জানিয়ে দিব ।

বাসায় এসে ছুঁড়ে দিল ব্যাগটা খাটের উপর। খুশি যেন আর ধরে না জয়িতার। যার গান শোনার জন্য সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে হাঁটতে যায় তাকে আজকে দেখে এসেছে । অসম্ভব সুন্দর স্মার্ট, জোড়া ভুরুর এই ছেলেটি যেমন সুন্দর দেখতে, গান করে যেমন , তেমনি আবার সুন্দর করে কথাও বলেন ।

“তুমি নির্মল কর, মঙ্গল করে-
মলিনু মর্ম মুছায়ে
তব পূর্ণ কিরণ ও দিয়ে যাক মোর-
মোহ কালিমা খুচায়ে”
গানটি করছিল শুভ । আর টুশিকে স্কুলে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে স্নিগ্ধ সকালে মন কাড়া এই গানটি শুনছিল জয়িতা আর আকাশের দিকে তাকিয়ে গানটির বিশালতা উপভোগ করছিল । আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালই লাগছিল জয়িতার ।

এভাবে প্রতিদিন সকালে জয়িতা আসত আর নানা অজুহাতে শুভ’র সাথে টুকিটাকি কথা বলার চেষ্টা করত ও জয়িতা নিজেও জানে না কোন এক অজানা ভাল লাগা ওকে ঘিরে আছে ।

শুভ একদিন হঠাৎ ফোন করে বলল যে ও আজকে অসুস্থ পড়াতে পারবে না ২-৩ দিন । টুশি যেন ফোন না দেওয়া পর্যন্ত স্কুলে না আশে । জয়িতার মন ছটফট করতে লাগল শুভ’র গান না শুনে আর ওকে না দেখতে পেরে। ২-৩ দিনের কথা বললে ও ৭দিনের বেশি হয়ে গেল শুভ’র দেখা নাই। জয়িতা অনেক কষ্ট করে দিন গুনছে। ওর কিছুই ভাল লাগছে না, শুভকে প্রচন্ড ভালবাসে জয়িতা । ওর ভাল লাগা গুলো সাদা পায়রার মত আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে কখন যে শুভ’র বুকের খাঁচায় বন্দী হবে । ১০ দিন হয়ে গেল । না পেরে স্কুল থেকে শুভ’র বাসার টিকানা যোগাড় করে জয়িতা । বাসায় যেয়ে শুনতে পায় সে ও বাসাই আছে । এক অপূর্ব সুন্দর রমনী যার চোখে কাজল, কালোটিপ, পড়নে নীল শাড়ি দেখে নুহার চোখ কপালে উঠল ।

– আপনাকে তো চিনলাম না ?
– আমি জয়িতা, শুভ’র সাথে দেখা করতে এসেছি ।
– তুমি নুহা নিশ্চয়ই । টুকিটাকি আলাপের মাঝে এই নামটা শুনেছে জয়িতা ।
ভিতরে যেয়ে দেখল শুভ শুয়ে আছে । চুড়ির শব্দে টনক নড়ল । কে ? কে ওখানে ?
– আমি জয়িতা
– আপনি ? বাসার ঠিকানা কোথায় পেলেন ?
– মনের টান থাকলে সব খুঁজে নেওয়া যায় ।
– জয়িতা আমি জানি আপনি কেন এসেছেন ?
– আমি নীল শাড়ি পরে এসছি ।
– শাড়ির রঙের জন্য নয় । আমি জানি আপনি আমার জন্য দূর্বল । আমাকে ভালবাসেন । তবে কিন্তু আপনি জানেন না যে, এসব রং আমার কাছে বর্ণহীন, অর্থহীন ।
– কথাগুলো অনেক কঠিন করে বলল শুভ । শুনে চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে এসেছে জয়িতার । তারপরও নিজেকে সামলে নিল জয়িতা ।
– তাহলে আপনি কি আমাকে ভালবাসেন না ?
– দেখুন জয়িতা আমার এই অভিশপ্ত জীবনের
– মানে ? কাঁপা গলায় শুভকে থামিয়ে দিল
– মানে আমি অন্ধ । আপনার সাথে কথা বলেই আমি বুঝেছি যে আপনি আমাকে ভালবাসেন একটা দূর্ঘটনায় আমি আমার বাবাকে আর এই চোখ দুটো হারাই । আমি চাইনা আমার সাথে জড়িয়ে আপনি নিজের জীবন নষ্ট করুন ।
– জয়িতার চোখ লাল হয়ে আছে । অশ্রুগুলো যেন জমে লাল হয়ে আছে । চোখ মুছে জয়িতা সিক্ত গলায় বলল , আমার জীবন তখনই নষ্ট হবে যখন সে জীবনে তুমি থাকবে না । বলেই শুভ’র হাত চেপে ধরল জয়িতা, আমি কিছু জানি না আমি শুধু জানি আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না ।
– কিভাবে সম্ভব জয়িতা ? তোমার আমার ধর্মের ও মিল নাই । আমি তো অনাথ কিন্তু তোমার Family?
– আমার মাও হিন্দু । বাবা ভালবেসে বিয়ে করেছে মাকে । তুমি আমাকে আর ফিরিয়ে দিওনা ।
– জয়িতার ভালবাসা বাধ্য করল শুভকে
– জয়িতার মাথা নিজের বুকে টেনে নিল আর অচেনা সুখকে বলল অশ্রু হয়ে ঝরতে ……

লিখেছেনঃ Ishty ava

About Ashiq Mahmud

Check Also

ভাত, কাপড়, ভালবাসা

( ভুমিকায় বলে নেই, গল্পের বক্তা চরিত্রটির মত আমিও নারীবাদি নই।আমি মানি নিয়তি নারী পুরুষ …