Home / মনের জানালা / সাজানো স্বপ্নের অপমৃত্যু (শেষ পর্ব )

সাজানো স্বপ্নের অপমৃত্যু (শেষ পর্ব )

opomrittuদুই বছর পর………
বাসায় বসে জিব্রান টিভি দেখছিলো হঠাৎ পকেটের মধ্যে কেমন যেন কম্পন অনুভব করলো।পরক্ষণে বুঝতে পারলো মোবাইল vibrate মোড এ কলের আভাস দিচ্ছে। কল রিসিভ করার পর অপর প্রান্ত থেকে খালার কণ্ঠ শুনতে পেলো। খালা জানালেন আগামী সপ্তাহে মামার বিয়ে তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আম্মুকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসতে বলল। পরদিন ট্রেনে করে ঢাকার উদ্দেশে আবার রওনা দিল।সময় কাটানোর জন্য কিছুক্ষন গান শুনছিলো জিব্রান, পরে ব্যাগ থেকে বই বের করে পড়া শুরু করলো। বই পড়তে পড়তে কাকতালীয়ভাবে হঠাৎ একটি শব্দে গিয়ে চোখ আটকে যায়। ফারিহা । হৃদয়ের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া নামটি এক মুহূর্তের জন্য যেন বুক চিরে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছিল। এত সময় অতিবাহিত হবার পর ভুলে যাওয়া পুরনো স্মৃতি খানিকটা আবেগী করে তুলছিল, তবে কেন যেন তার মনে হলো হয়ত অন্ধকার পথে আলোর দেখা পেলাম।

সৃষ্টিকর্তা হয়ত পুনরায় একটি সুযোগ দিচ্ছেন। এই ভেবে মনের সেই পুরনো আবেগকে আবার অগ্রাধিকার দিতে লাগল আর তাই বই পড়া বাদ দিয়ে ভাবতে থাকলো কিভাবে কি করা যায়। ঢাকা পৌঁছানর পর বাড়িতে ঢুকতেই ওর রুমের দিকে এক পলক উকি দিয়ে দেখল,নাহ!কেউ নেই।আম্মুর চোখে ধরা পরার ভয়ে জিব্রান নিজের আবেগকে বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রন করলো। বিয়ের দিন………………। সবার পাশাপাশি জিব্রানও কাজে ব্যস্ত। তবুও কাজের ফাঁকেফাঁকে ফারিহাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। হ্যাঁ, দীর্ঘ অপেক্ষা আর খোঁজাখুঁজির পর ফারিহাকে ওর বাবা-মার সাথে আসতে দেখল। ফারিহা আগের চেয়ে অনেকটা পাল্টে গিয়েছে । চুল আগের মতো খাটো নেই ; লম্বা ,ঘন ও আরও রেশমি হয়েছে।চেহারা আগের চেয়েও আরও দীপ্তিময় হয়েছে তবে চোখ গুলো এখনো আগের মতোই মায়াবী জাদুতে ভরা । ঐ দিন ওকে খুব সুন্দর লাগছিলো।

নিজের আবেগকে আর সামলাতে না পেরে চলে জিব্রান গেল কথা বলতে। “কেমন আছো ?” পেছন থেকে জিব্রান জিজ্ঞেস করল। প্রশ্নের জবাব দিতে পিছনে ফিরতে না ফিরতেই জিব্রানের চোখে ওর চোখ দুটো আঁটকে গেল।ফারিহা নিস্পলক আর নিশ্চুপ দাড়িয়ে আছে।আবার জিব্রানের তরফ থেকে প্রশ্ন, “ দীর্ঘ সময় পর দেখা হল, আমাকে চিনতে পেরেছ?” । জবাবে ফারিহা বলল, “ভুলে যাবার মতো মানুষ তুমি ছিলে না।ক্ষণিকের জন্য একটা দুষ্টু বন্ধু পেয়েছিলাম কিন্তু আমাকে বিদায় না জানিয়ে সে চলে গিয়েছিল”।আমি দুঃখিত,ঐ দিন সবার জন্য এতটাই খারাপ লাগছিল যে বিদায়টাও জানানো হয়নি(জিব্রান)। তারপর লোকচক্ষুর আড়ালে জিব্রানের সাথে ফারিহার দীর্ঘক্ষণ আলাপ হলো। জিব্রান ধারণা করছিল তারা একে অপরকে হয়তো ভালবাসে। কিন্তু কেউ কাউকে কখনো বলতে পারেনি।

ঐ দিন রাতে অনুষ্ঠান শেষে সবাই ঘুম,কিন্তু জিব্রান বসে আছে।না, ধ্যান করছিল না,জেগে জেগে স্বপ্নও দেখছিল না , চিঠি লিখছিল।মনের সকল অনুভূতি উজাড় করে লিখছিল বলে কোনদিকে সকাল হয়ে গেল বুঝতেই পারলো না। আবার যাবার পালা এলো। যাবার দিন ফারিহাকে দেখা করার জন্য আসতে বলেছিলো। তাই চলে যাবার আগমুহূর্তে ফারিহা জিব্রানের সাথে দেখা করলো । চেহারায় বলে দিচ্ছিল যে ফারিহারও মন খারাপ তখন,বিদায় দেয়ার মুহূর্তে হঠাৎ জিব্রান নিজ হাতে ফারিহার হাতের প্রথম স্পর্শ অনুভব করল।সে এমনি হাত ধরেনি বরং জিব্রানের হাতে একটি ঝিনুক গুঁজে দিল যাতে তাদের দুজনের নাম একটি ভালবাসার বৃত্তে খুদাই করা ছিল। আর দেরি না সাথে সাথে পকেট থেকে চিঠিটা বের করে দিয়ে দিল, সাথে মোবাইল নাম্বারটাও।জিব্রান ট্রেনে করে চট্টগ্রাম ফিরছিল আর ভাবছিল ফারিহা হয়ত ঐ মুহূর্তে চিঠিটি পরছে। এক সপ্তাহ পর………………পুকুরপাড়ে জিব্রান বসে আছে।

হঠাৎ একটি কল তারপর রিসিভ এবং শুনা গেল একটি মেয়েলি কণ্ঠ। বুঝতে দেরি হলো না যে এটা ফারিহা ।

জিব্রানঃ কেমন আছো,এতদিন ঘুমাচ্ছিলে নাকি(হাল্কা অভিমান),চিঠিটা……………?
ফারিহাঃ হ্যাঁ, পড়েছি।তবে আরও খুশি হতাম যদি নিজ মুখে এতগুলো কথা বলতে পারতে।ভীতুর ডিম,কাপুরুষ।
জিব্রানঃ হাহ হাহ হাহ (লজ্জার হাসি)! এত সহজে কি মনের কথা বলা যায়? তুমিও তো কম নিষ্ঠুর না,আমাকে এতদিন অপেক্ষা করালে যে?
ফারিহাঃ মনে করে নাও ওটা তোমার শাস্তি ছিল। হিঃ হিঃ হিঃ। পাগল,মোবাইল কি ভূতে এসে দিয়ে যাবে নাকি? এতদিন ভাবছিলাম কিভাবে কল দিবো ।শেষে আমি আমার আপুর নাম্বার থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে কল দিয়েছি, তারপরও কি বলবে নিষ্ঠুর?
জিব্রানঃ আচ্ছা ভুল হয়ে গেছে ম্যাডাম, দুঃখিত!!……………

কথা হলো আরও অনেকক্ষণ, হলো ভাবের আদান-প্রদান, কখনো ভালবাসা ,কখনো বা ঠাট্টা আবার কখনো রাগারাগি।এভাবে যোগাযোগ হতো তবে যোগাযোগের মাত্রা কম ছিল, কারণটাও অস্বাভাবিক নয়। ফারিহার বাবা টপ ক্লাসের বদমাশ লোক। সবসময় মেয়েকে চোখে চোখে রাখতেন আর একটু ভুলভাল হলেই কথার ঝারিতে গাঁয়ের চামড়া তুলে ফেলত। তার উপর একটা বদ অভ্যাস হলো মেয়েদেরকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দেয়া। ফারিহার বড় পাঁচ বোনের বিয়ে ১৭-১৯ বছরেই দিয়ে দেয়া হয়।এখন শুধু ফারিহাই বাকি। উফ!!!!! মরার উপর এ যেন অতিবিশালকায় খাঁড়ার ঘা।এমনিতেই ঝামেলা কম নয় তার উপর আরেক ঝামেলা যোগ হল। এভাবে কখনো ১ সপ্তাহ আবার কখনো ২ সপ্তাহ পর কথা হতো। দেখতে দেখতে পাঁচটি মাস চলে গেল। হঠাৎ একদিন ওর নাম্বার থেকে কল আসল আর জিব্রান অতি আনন্দের সাথে কল রিসিভ করার পর অপর প্রান্ত থেকে শুনতে পারল তার আনন্দের সমাপ্তির ঘণ্টা।

ফারিহার বাবা!!!!!! এত ভয়ানক মাপের গালিগালাজ আর হুমকি দিলেন যে জিব্রান বুঝতেই পারছিল না আসলে তিনি কি বলেছিলেন, কেনই বা বলেছিলেন। কলটা কেটে যাবার কিছুক্ষণ পর খালার নাম্বার থেকে কল এলো। খেল ২য় দফা গালি ,সাথে এটাও বলে দিলেন যে জীবনে কখনো যেন আর ঢাকা না যায়।প্রথমে ঘটনা বুঝতে পারেনি সে কিন্তু পরে জানতে পারলো ঘটনাক্রমে জিব্রানের দেয়া চিঠি ফারিহার বাবার হাতে পৌঁছে গেছে। হুম………! একটি দীর্ঘশ্বাস। ভাঙ্গা মন আর মস্তিষ্কের সাথে জিব্রান যুদ্ধ করছিল। আবার একটি কল এল।অনেক ভয়ে ভয়ে কল রিসিভ করলো।না, অন্য কেউ নয়, ফারিহা । ফারিহার উপর কি কি ভয়ানক শাস্তি গেল সব জানালো।তেলে বেগুনে জলে উঠা ফারিহার বাবার মাথা হয়ত পরে ঠাণ্ডা হয়েছিল কিন্তু ব্যাপারটাতো সবার মাঝে জানাজানি হয়ে গেল।

ঐ রাত জিব্রান আর ফারিহার মধ্য বিনিময় হওয়া প্রতিটি শব্দের মাঝে শোনা যাচ্ছিল বিচ্ছেদের আর্তনাদ।কথার শেষের দিকে ফারিহা শুধু এইটুকু বলল “ আমার আর তোমার মাঝে LOVE MARRIAGE হওয়া হয়তো সম্ভব নয়, যদি পারো তাহলে আমাকে ARRANGE MARRIAGE করো। আমি তোমার অপেক্ষায় থাকবো, I LOVE U…………………………………” ।

জীবনে প্রথম বারের মতো ফারিহার মুখ থেকে ভালবাসার শব্দ শুনতে পেরেছিল জিব্রান।আদৌ সে শব্দ কখনো শোনা যাবে কিনা তাও সে জানে না। ২য় বারের মতো চোখ দিয়ে আবেগি অশ্রু ঝরতে লাগলো। ভাঙ্গা স্বপ্নটা জোড়া লাগতে লাগতে একেবারেই ধ্বংস হয়ে যাবার উপক্রম।

জিব্রান মনে মনে ভাবছিল, ‘তোমার আর আমার মিলন অসম্ভব কারনঃ
১.আমাদের মধ্যকার দূরত্ব
২. যোগাযোগের অভাব
৩.আমাদের পারিবারিক শত্রুতা
৪.শেষ পর্যন্ত তোমার উদাসীনতা
ভেবেছিলাম যদি তুমিই নিজ ভালবাসায় অটল থাকো তাহলে হয়ত এই অসম্ভবও সম্ভব হত।কিন্তু না, তুমি তোমার ভয়ের কাছেই হার মানলে। আমিও পুরোপুরি তোমাকে দোষারোপ করতে পারব না।এখানে তোমার কিছুই করার ছিল না।

জিব্রান তাই এত গভীর চিন্তা হতে নিজেকে সরিয়ে বাস্তবতার আদলে নিজেকে মানিয়ে নেবার সিদ্ধান্ত নিল।জিব্রান জানেনা ফারিহাকে পাবে কিনা তবে তাকে হারানোর কষ্টটা কমিয়ে নেবার চেষ্টা করবে। ভাববে আর মনকে সান্ত্বনা দেবে এই ভেবে যে আল্লাহ্‌ যা করেছেন নিশ্চয়ই!তার ভালোর জন্যই করেছেন। জীবনে কখনো হয়ত অন্য কাউকে মন-প্রাণ আর এতো আবেগ দিয়ে ভালবাসতে পারবে না সে।কারণ বাস্তবতা যে তার জানা হয়ে গেছে।না,আর আবেগ নয়, বিবেক দিয়েই নিজের জীবনকে নিয়ন্ত্রনের সিদ্ধান্ত নিল জিব্রান।

তাই ভালবাসার এই কঠিন আবেগকে মন থেকে ঝেড়ে বিবেকের সাথে বাস্তবতাকে হাসিমুখে বরণ করার প্রয়াসে জিব্রান আজ স্বাভাবিক জীবন অতিবাহিত করছে।আল্লাহ্‌র রহমতে ভালই আছে,হয়তো বা আরও ভাল থাকবে যদি ফারিহা তার জীবনে আবার ফিরে না আসে। তবে তার জীবনে যত সত্য আছে তার মধ্য একটি বড় সত্য হল “ আমি তোমাকে ভালবাসি,ফারিহা”…..

লিখেছেনঃ অন্ধকারের রাজপুত্র

About Ashiq Mahmud

Check Also

ভাত, কাপড়, ভালবাসা

( ভুমিকায় বলে নেই, গল্পের বক্তা চরিত্রটির মত আমিও নারীবাদি নই।আমি মানি নিয়তি নারী পুরুষ …