Home / মনের জানালা / সময় চুরি

সময় চুরি

somoyঅবন্তীর স্টেশনে এসে পৌছোতে বেশ কিছুটা দেরী হয়ে গেল। আশার সময় বেশ তাড়াহুড়া করে আসতে হয়েছে। অবন্তীর বাবা বাসা থেকে টেলিগ্রাম পাঠিয়েছেন। খুব জরুরী খবর। কিছুটা উড়া ভাবে অবন্তী জরুরী খবরটা পেয়ে গেছে। অবন্তীর বিয়ে ঠিক হয়েছে। ছেলে খুব সম্ভবত আমেরিকান সিটিজেন। আমেরিকার পাত্রকে অবন্তীর বাবা সহজে হাতছাড়া করবেন বলে মনে হয় না। কিন্তু অবন্তীর মনে হচ্ছে ছেলের ভেতর ভেজাল আছে। তা না হলে এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করতে চাইত না।

স্টেশনে এসে দেখল ট্রেন এখনও ছেড়ে যায় নি। অবন্তী মোটামোটি হাফ ছেড়ে বাচল! আজকে আর কোন ট্রেন নেই। কাজেই এই ট্রেন মিস হলে সে যে কি বিব্রত অবস্থায় পড়ত তা আর বলার অপেক্ষা নেই। অবন্তী আসতে করে টিকেট কেটে ট্রেনে উঠে পড়ল। উঠার পর তার মনে হল কি যেন একটা হোস্টেলে রেখে এসেছে। কিন্তু কি রেখে এসেছে তা সে কিছুতেই মনে করতে পারল না।

জানালার পাশের সিটে বসা অবন্তীর সখ। কিন্তু সেখানে বসে আছে রোগা, হ্যাংলা একটা ছেলে। একমনে পেপার পড়ছে। অবন্তী পাশে এসে বসলেও ছেলেটি পেপার থেকে মাথা তুলল না। ছেলেটির এই নির্লিপ্ততায় অবন্তী কিছুটা বিষ্মিত হল। যদিও এখানে বিষ্মিত হওয়ার মত তেমন কিছু ঘটে নি।

ট্রেন চলতে শুরু করেছে। জানালা খোলা। কাজেই পাগলা হাওয়া এসে অবন্তীর চুলগুলো এলোমেলো করে দিচ্ছে। সে তারাশঙ্করের একটা বই বের করার জন্য ব্যাগ খুলল। ব্যাগ পুরো খুঁজেও বইটা পেল না। তাড়াহুড়া করে আসার সময় সে বইটা ব্যাগে ঢুকাতে গিয়েও ঢুকায় নি! সমগ্র ব্যাগ খুঁজে অবন্তী পেল একটা ম্যাগাজিন! ম্যাগাজিনটা পড়তে শুরু করল।

পড়ার সময় পাশে চোখ যেতেই অবন্তী দেখল বুড়ো মত একটা লোক হা করে অবন্তীর গায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। দেখেই ঘৃণায় অবন্তীর মন ভরে উঠল। মেয়ে মানুষ দেখলেই এইগুলার কোন হুশ থাকে না। অবন্তী ম্যাগাজিনের দিকে মন দিতে পারছে না। তার কেবলই মনে হচ্ছে লোকটা একদৃষ্টিতে তার শরীরের দিকে তাকিয়ে আছে। অবন্তী আড়চোখে লোকটার দিকে চাইল। যা ভাবছিল তাই! শয়তানটা এবার অবন্তীর দিকে তাকিয়ে হাসছে। পান খাওয়া লাল দাঁত দেখে অবন্তীর ভিরমী খাওয়ার যোগার। সে আস্তে করে পাশে বসা রোগা ছেলেটাকে বলল, “আপনি কি একটু কষ্ট করে জানালার পাশ থেকে সরে বসবেন? আমি একটু আপনার সিটে বসতাম।” ছেলাটা কথা না বাড়িয়ে উঠে বসল।

জানালার পাশে বসে বেশ কিছুক্ষণ অবন্তী চোখ বন্ধ করে রইল। একবার সে ভাবল ছেলেটিকে ধন্যবাদ জানায়। পরে আবার ভাবল ধন্যবাদ দিলে হয়ত ছেলেটি তাকে ছ্যাবলা এবং গায়ে পড়ে কথা বলা টাইপ মেয়ে মনে করবে। আসলে অবন্তী সেরকম না। কাজেই সে কিছুক্ষণ চুপ থাকল।

বেশিক্ষণ চুপ থেকে পারল না। কিছু পরেই ছেলেটি যখন পেপার পড়া বন্ধ করল ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বলল, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। ছেলেটি অত্যন্ত অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, আমাকে বলছেন? ধন্যবাদ কেন? অবন্তী বেশ খানিকটা হকচকিয়ে গেল। সামলে নিয়ে পরক্ষণেই বলে উঠল, না মানে ইয়ে সিট থেকে উঠার জন্য আর কি! ছেলেটি আলতো করে হেসে উঠে জিজ্ঞাসা করল, কই যাচ্ছেন? অবন্তী বলল, আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। মজিদপুর স্টেশনে নামব। আমার বাবার বাসা। ছেলেটি চমকে উঠে বলল, মজিদপুরে তো আমিও যাচ্ছি! আপনি কোন বাসায় যাচ্ছেন? অবন্তী বলল, হাসান মাস্টারের বাসা। ছেলেটি চমকে উঠে বলল, স্যার তো আমাকে আগে খুব পছন্দ করতেন। কিছু হলেই আনিস, আনিস। শুরু করল বিশাল গল্প। অবন্তীর মনে হল সে ইচ্ছে করেই এ ধরণের গল্প করে যাচ্ছে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার মনে হল আনিস ওরকম না মনে হয়! স্টেশন থেকে নেমে আনিস যে কথাটি বলল তাতে একটু অবাকই হয়ে গেল অবন্তী। আনিস বলল, আপনার বিয়েতে কিন্তু আমি অবশ্যই আসছি। স্যারের সাথেও দেখা হয়ে যাবে এই ফাঁকে!

অবন্তীর বাবা মাকসুদ সাহেব আজ ক্লীন শেভ করেছেন। ক্লীন শেভ করতে গিয়ে কানের নিচে লতির সামান্য অংশ কেটে গেছে। জিনিসটা কতটুকু অশুভ সেটা নিয়েই তিনি চিন্তা করছেন। মাঝখানে অবন্তীর মা চা নিয়ে এসে উনার স্বামীর কড়া একটা ঝাড়ি খেলেন। এদিকে মাকসুদ সাহেব চিন্তা করলেন হঠাত করেই মেয়েকে না জানিয়ে এভাবে বিয়ে দিয়ে দেওয়া ঠিক কি না কে জানে! কিন্তু এ ছাড়া তাঁর অন্য কোন পথও খোলা নেই। কারণ, ছেলের মামা বলেছে বিয়ে না দিলে তার পাওনা টাকা কড়ায়-গণ্ডায় নিয়ে নিবে। মাকসুদ সাহেব জানেন তাঁর পক্ষে ত্রিশ হাজার টাকার ঋণ শোধ করা এ মুহূর্তে একেবারেই সম্ভব না। বিষয়- সম্পত্তি সব বিক্রি করে দিয়ে পথে বসতে হবে! ছেলের স্বভাব একটু খারাপ, এটা তেমন কোন সমস্যা না। বিদেশে থাকা ছেলে-পুলেদের এই টাইপ সামান্য সমস্যা থাকতেই পারে।

অবন্তী বাসায় ঢুকে যতটা অবাক হওয়ার কথা ছিল ততটা হল না। কারণ সে ধরেই নিয়েছিল আজ তার গায়ে হলুদ বা বিয়ের কথা হবে। কিন্তু এসে বুঝল যে আজই তার বিয়ে! বাসায় আসতেই অবন্তীর মা তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন। অবন্তীর বাবা বলল, এত ছেলে মানুষের মত কান্না-কাটির কি আছে!
অবন্তীর বোন উপমা এসে জড়িয়ে ধরে বলল, আপু আজ তোর বিয়ে। হঠাতই অবন্তীর নিজ বাড়িতে কেমন যেন অচেনা মনে হতে লাগল। এই বাড়ি, কত দিনের সঙ্গী। কত মায়া, কত হাসি-কান্না। সব ছিড়ে আজ চলে যেতে হবে। এমন একটা মানুষের সাথে থাকতে হবে যাকে জীবনে কোন দিন দেখেওনি। মানুষটা কেমন হবে? পাষণ্ড নাকি ভাল? ভাল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম! তাও আর কিছু করার নেই। অবন্তী ভাগ্যের হাতে নিজেকে ছেড়ে দিল।

ঠিক সন্ধ্যায় হালকা সাজে সজ্জিত হল অবন্তী। পাত্র-পক্ষ কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে যাবে। মাকসুদ সাহেব বুকের মধ্যে চাপা একটা যন্ত্রণা পেতে লাগলেন। তিনি একবার ভাবলেন, এ আমি কি করলাম? টাকার জন্য কি নিজের মেয়েকে বিক্রি করে দিলাম না?

রাত আটটার সময় হঠাত করেই অবন্তীর একমাত্র চাচা জামিল চৌধুরী এসে বাসায় বিরাট হৈচৈ শুর করলেন। টাকার জন্য মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি তার ভাইকে বকতে লাগলেন। অবন্তী সব শুনল। কিন্তু কাউকে কিছুই বলল না।
হঠাত করেই বাড়িতে এসে উঠল আনিস। জামিল চাচা আনিসের হাত ধরে বলল, বাবা তুমি অবন্তীকে বিয়ে কর। তা না হলে মেয়েটার জীবন শেষ হয়ে যাবে। আমি তোমার হাত ধরছি।

আনিস জীবনে এতটা অবাক আর কোনদিনই হয় নি। তার হাতে তখনও অবন্তীর বিয়ের জন্য উপহার হিসেবে কেনা একটা শাড়ি ছিল। অবন্তীকে জামিল চাচা লুকিয়ে বাসা থেকে বের করে আনলেন। জামিল চাচা তার বাসায় অবন্তীকে লুকিয়ে নিয়ে গেলেন এবং সেখানেই তার সাথে আনিসের বিয়ে দিয়ে দিলেন। ঘটনা এত দ্রুত ঘটতে লাগল যে আনিস কিছুই বুঝতে পারল না।

আনিস তার বাসায় অবন্তীকে নিতে পারবে না। ঢাকায় পরদিন নিয়ে যাবে। কিন্তু রাতটা অবন্তী থাকবে কই? ঠিক হল অবন্তী সে রাতেই জামিল চাচার বাসায়ই থাকবে। আনিস অবন্তীর হাত ধরে ধরা গলায় বলল, “আমি তোমাকে কখনো বিন্দুমাত্র দুঃখে থাকতে দেব না।” অবন্তী কিছু না বলে মৃদু হাসি দিল।
আনিস তার কথা ভালভাবে রাখতে পারে নি। একটি মেয়ের জীবনের সবচেয়ে আনন্দদায়ক রাত হচ্ছে বাসর রাত। অথচ অবন্তীর বাসর কাটছে একা একটি ঘরে! এর চেয়ে দুঃখের আর কিছু কি হতে পারে?
আনিস বাসায় যাওয়ার সময় মনে মনে বলল, “অবন্তী, তোমার বিয়েতে আমি কিছুই করতে পারি নি, কিন্তু তোমার সন্তানের বিয়েতে আমি তোমার আক্ষেপ ঠিকই পূরণ করব!”

ঠিক ২৫ বছর পরের কথা। দেখতে দেখতে কতটা সময় চুরি হয়ে গেল! আনিসদের বিশাল বড় বাড়িটিতে আজ প্রচণ্ড উৎসবের আমেজ। অবন্তীর একমাত্র মেয়ে স্পর্শিয়ার আজ গায়ে হলুদ। বাড়িতে বিশাল ব্যাণ্ড পার্টি। লোকজনের আনন্দে বাড়ি মুখরিত। স্পর্শিয়া অনেকগুলো শাড়ি থেকে চয়েস করতে পারছে না কোনটি পড়বে। সে ছুটে তার মার রুমে চলে গেল। দেখল তার মা তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে বাচ্চাদের মত কাঁদছে। স্পর্শিয়া প্রচণ্ড অবাক হল। সে তার মাকে জীবনে কখনও কাঁদতে দেখে নি……

লিখেছেনঃ Tanvir Saad

About Ontohin

Check Also

ভাত, কাপড়, ভালবাসা

( ভুমিকায় বলে নেই, গল্পের বক্তা চরিত্রটির মত আমিও নারীবাদি নই।আমি মানি নিয়তি নারী পুরুষ …