Home / মনের জানালা / লেটার মফিজ

লেটার মফিজ

letter mofizনতুন স্কুল,আজ প্রথম দিন, স্বাভাবিক ভাবেই বিস্ময় এর চোখে এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে দারোয়ান আঙ্কেল এর সাথে ক্লাসের দিকে যাচ্ছি। দরজায় পা’ রাখার সাথে সাথে চোখে পরলো স্যার কেউ একজন কে রাম প্যাঁদান [পিটানি] দিচ্ছেন। খানিকটা আতঙ্কিত হয়ে মনে মনে ভাবতে থাকলাম এটা কোথায় এসে পরলাম রে বাপ। স্বাভাবিক ভাবেই কিছুটা ঘাবড়ে গেলাম। স্যার নামক এমন ধুলাই-ম্যান এর ক্লাসে ঢোকার চেয়ে চোখ বন্ধ করে পেছনের দিকে দৌড় দেয়াটাই হয়ত বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কিন্তু সেই বুদ্ধিমান গিরি দেখানোর আর কোন সুযোগ পেলাম না।

প্যাঁদানি কমপ্লিট। স্যার তার ব্রু দুটো কুঁচকিয়ে আমার দিক তাকাল আর জানতে চাইল আমিই রবিন কিনা। আমি আতঙ্কিত ভঙ্গিতেই হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালাম। স্যার কিছুটা এগিয়ে এসে আমাকে বসার জায়গা দেখিয়ে দিলেন। সস্থির নিশ্বাস ফেললাম। স্যার এর মুখের দিকে আমাকে আর তাকাতে হচ্ছে না। যতদূর জানি প্যাঁদানি দেওয়া যথেষ্ট স্বাচ্ছন্দ্যের কাজ তার পরেও কেন মানুষ এটা করার সময় তার ব্রু কুঁচকে রাখেন সেটাই আমার মাথায় ঢুকে না। যাক এসব কথা। সদ্য প্যাঁদানি খাওয়া ছেলেটি আমার পাশে এসে বসল। দেখতে বেশ চিকন চাকন গড়নের আর গায়ের রঙ ধবধবে অন্ধকার কালার। কৌতূহল বশত তাকে জিজ্ঞাসা করলাম-

:- স্যার তোমাকে এভাবে মারলেন কেন……???

ও আমার দিকে না তাকিয়েই কিছুটা বিজ্ঞ বিজ্ঞ ভাব নিয়ে জবাব দিল….

:- আরেহ হেড-ম্যাডাম এর মাইয়া আমারে প্রপোজ করছিল। পাত্তা দেই নাই, হেইডা হুইনা স্যার মনে হয় কষ্ট পাইছে।

ওর উত্তর শুনে আমি পুরাই হতবাক। অনেকটা টাস্কিত নয়নে ‘প্রায় হা’ অবস্থায় কিছু সময় ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম।

এই ‘প্রায় হা’ অবস্থায় মফিজ এর সাথে আমার প্রথম পরিচয়।

পরবর্তীতে জানতে পেরেছিলাম হেড-ম্যাডাম এর সুন্দরীতমা মেয়ে কে দ্বিতীয় বারের মত প্রেম পত্র ও ভবিষ্যতে বিয়ের প্রস্তাব দেয়ায় তাকে এই প্যাঁদানি উপহার দেওয়া হয়েছে। প্রথমে শালা কইসিলো মাইয়াই নাকি ওরে প্রেম নিবেদন কছে, শালা পার্ট নিসিলো।

এটা শুনে আমি খুব একটা অবাক হলাম না যখন জানলাম প্রেম পত্র দিয়ে ধরা খাওয়া প্রথম মেয়ে না এটা, এর আগেও একই ক্লাসের অন্য তিনজন কে দিয়ে ছিল। কিন্তু দুঃখজনক ভাবে কেউ ই তার এই ভালবেসে লিখা প্রেম পত্রের মর্ম বুঝল না। উল্টো স্যার এর হাতে তুলে দিয়ে রাম প্যাঁদানি খাওয়াল। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া অবস্থাতেই মফিজকে সবাই প্রেমিক পুরুষ ডাকা শুরু করল। এতে সে খুব একটা অখুশি বলে মনে হয় না। উল্টো ওর সামনে এই প্রেমিক পুরুষ শব্দটা উচ্চারিত হলে তার কালো চেহারায় ঝক্‌ঝকা সাদা দাঁত গুলো বেশ উজ্জ্বল হয়ে উঠে।

ধীরে ধীরে মফিজ এর সঙ্গ আমার ভাল লাগতে শুরু করলো। ভিন্ন চরিত্রের মানুষ গুলার উপর আমার আগ্রহ সব সময়ই একটু বেশি। আর মফিজ কে একটু ভিন্ন বললে হয়ত ভুল হবে এটা আলট্রা ভিন্ন বলা উচিৎ। ছেলে হিসেবে সে খুব একটা খারাপ না। দিল দরিয়া টাইপ। দিনে দুই তিনবার প্রেমে পড়া যেনতেন কথা না। বিশাল ক্রেডিট এর কথা। মানুষ জীবন জিন্দেগি পার করে দেয় একবার প্রেমে পড়তে পারে না। আর সে দিনে দুই তিনবার পড়ে। ক্রেডিট দিতেই হয়।

প্রাইমারি জীবন হেড ম্যাডাম এর কন্যা ইতিহাস দিয়েই শেষ হল। হাই স্কুলে পা রাখলাম। কিন্তু তাতে কি মফিজ এর প্রেমময় বিনোদনমূলক সঙ্গ আমাকে হারাতে হল না। অপ্রত্যাশিত ভাবে একি স্কুলে ষষ্ট শ্রেণিতে ভর্তি হলাম দুইজন। পনেরো বিশ দিন পরেই আবার মফিজের প্রেম পত্র লিখা শুরু হল। অষ্টম শ্রেণিতে উঠতে উঠতে তার সংখ্যা কত সেটা ঠিক হিসাব রাখা হয়নি তবে আর দুই একটা লিখে ফেললেই হয় তো সর্বোচ্চ প্রেম পত্র রচনায় গ্রিনিজ বুকে মফিজ এর নাম উঠে যেতে পারে। সে দিক থেকে সে প্রায় বিখ্যাত হবে হবে ভাব।

অষ্টম শ্রেণীতে উঠার প্রথম কিছু দিন বেশ শান্ত ভাবেই কাটল, হঠাৎ একদিন মফিজ আবার সেই পুরনো দৃশ্যে। ক্লাসে ঢুকেই দেখি স্যার ছোট দুইটা কাগজ হাতে দাড়িয়ে আছে আর মফিজ টিউবওয়েল এর মত কান ধরে অবিরত উঠবস করছে। ক্লাস রুমে বসেই কানে কানে পাশের টাকে জিজ্ঞেস করলাম কাহিনী কি রে। ও উত্তর দিল-

:- মফিজ ফের লাভ লেটার দিয়া ধরা খাইছে।

কিছু না বুঝার ভান করে আবার জিজ্ঞেস করলাম

:- ওহ স্যার বুঝি এই জন্যই কান ধরে উঠবস করাচ্ছে….?

ও কিছুটা গম্ভীর মুডে উত্তর দিল….

:- না এই জন্য না।

আমি কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

:- তাহলে……?

এবার ও আমার মুখের দিকে তাকিয়ে খানিকটা মুচকি হাসল। আমি বুঝতে পারছিলাম ও আমার আগ্রহ দেখে বেশ মজা পাচ্ছে। অনেকটা নিরুপায় হয়েই ওর উত্তর এর অপেক্ষা করতে করতে ভাবতে থাকলাম এমন কি হল যার জন্য স্যার লেটার এর বদলে সেটার জন্য কান ধরিয়ে উঠবস করাচ্ছে, আরও ভয়ানক কিছু করে বসে নাই তো! এমনটা ভাবতে না ভাবতেই পাশেরটা উত্তর দিল-

:- শালায় এক লগে দুইটারে লেটার দিতে গিয়া প্যাঁচ লাগায়ে ফেলছে। হাবিবা’রে লেখা চিঠি অনিকা’রে দিছে। আর অনিকা’রে লেখাটা হাবিবা’রে দিছে। বাট কাহিনী এইখানে না। কাহিনী হইল চিঠিতে “আই লাভ ইউ হাবিবা” লিখতে গিয়া…”আই লাভ ইউ হাবা” লিখে ফেলছে……। স্যার মুলত ঐ জন্যই বেশি ক্ষেপে গেছে। ব্যাটা তুই লাভ লেটার লিখতে গিয়ে নায়িকার নাম ই ভুল করস তোরে দিয়া প্রেম কেমনে হবে রে। ক্লাস এইট এর পোলা প্রেমিকার নাম হাবিবা লিখতে গিয়ে হাবা লিখে, একবার চিন্তা কর তুই, ব্যাটা কত্ত বড় একটা মফিজ।

ওর উত্তর শুনে আমি হাসবো না কাঁদবো পুরাই কনফু [কনফিউসড] খেয়ে গেলাম। আর এই বিশাল আকারে কনফু খাওয়ার অন্যতম কারণ হইল মফিজ এর লাভ লেটার দেয়া দুইটা সুন্দরীই তার দুই বছরের সিনিয়র আই মিন মফিজ পড়ে অষ্টম শ্রেণিতে আর তার লেখা প্রেম পত্র কন্যারা পড়ে দশম শ্রেণিতে। এই অষ্টম দশম হাবা কাহিনী পুরো স্কুলে জানাজানি হয়ে গেল। তাতে সে গ্রিনিজ বুকে নাম লেখানোর সুযোগ না পেলেও বিখ্যাত এক টাইটেল পেয়ে বসল। যেটা ওর নামের সাথে যোগ করলে পুরো ব্যাপারটা দাঁড়ায় লেটার+মফিজ = “লেটার মফিজ”। এই ঘটনার পর থেকে স্কুল আর এলাকায় তাকে চিনে না এমন কেউ নেই। শুধু মফিজ এর আগে পরে একবার লেটার যোগ করে দিতে পারলেই হয়।

এমন আরও বেশ কিছু ছোট ছোট ঘটনায় স্কুল জীবন শেষ হল। কলেজ জীবনও বেশ ভাল ভাবে কেটে গেল। পা রাখলাম ভার্সিটি লাইফে। এবার মফিজ এর সত্যি সত্যি একটা গতি হল। আর চিপায় পড়লাম আমি। প্রায় সুন্দরী এক মেয়ে এখন তার গার্লফ্রেন্ড। আর সেই প্রায় সুন্দরী গার্লফ্রেন্ড এর প্রশংসা শুনতে শুনতে আমার কান দুইটা এখন প্রায় সুনামি বিদ্ধস্ত হাইতি’র মত। মফিজ এর ভাষ্যমতে তার গার্লফ্রেন্ড এর রূপের ঝলক বর্তমানে ক্যাটরিনারও এক ডিগ্রি উপড়ে অবস্থান করতেছে। দুই দিন পরে তা কোথায় গিয়ে থামে সেটাই দেখার বিষয়। মহুয়া নামের এক মেয়ের সাথে টাঙ্কি মারতে গিয়ে সুমা নামের এই মেয়ের সাথে মফিজ এর পরিচয়। যত দূর জানি মফিজ এর আগেও এই মেয়ের আরও পাঁচ ছয়টা রিলেশন ছিল।

মফিজ নিয়মিত আমার সাথে যোগাযোগ করলেও প্রেমে হাবুডুবু খাওয়ার পর এই প্রথম তিন চার দিন হয়ে গেল কোন খবর নাই। পোলাপাইন এর কাছে শুনছি গার্ল-ফ্রেন্ড নিয়া নাকি হেব্বি মজাতে আছে। সিনেমা, পার্ক, রিকশায় ঘুরাঘুরি সব মিলিয়ে পুরাই উড়াধুরা অবস্তা। ফোন দিয়ে একটা খোঁজ নিবো ভাবতে না ভাবতেই মফিজ আমার বাসার সামনে। খানিকটা টাস্কিত হইলাম রাত প্রায় বারটা বাজে। ব্যাপারটা পরিষ্কার যে বিশেষ কিছু একটা ঘটে গেছে। অন্যথায় এত রাতে মফিজ আমার বাসার সামনে এসে উঁকিঝুকি করার কথা না।

:- কিরে কাহিনী কি….এত রাইতে আমার বাড়ির সামনে…?

মফিজ খানিকটা দেবদাস স্টাইলে উত্তর দিল

-: দোস্ত শালি তো আমারে পুরাই আবুল বানায়ে ছাইড়া দিছে।

ওর কথার ভঙ্গিমা দেখে কিছুটা হাসি পেলেও সেটা পরক্ষনই স্কিপ মারলাম

– কেন কি করছে…….??

– শালি তো এলাকার এক ছোট ভাই এর লগে ভাইয়া গেছে।

হাহাহাহা এবার আর হাসিটা থামাতে পারলাম না। সশব্দে অনেকটা বাংলা ছবির ভিলেন এর মত হু হু করে হেসে দিলাম।

– এমন কিছু একটা হবে তা তো আগেই বলছিলাম তোরে। যাক ব্যাপার না একটা গেছে আরেকটা আসবে এইটা নিয়া মাথা ঘামানুর দরকার নাই।

– আরেহ গেছে গা কোন দুঃখ নাই। মাগার দুঃখ হইল শালি আমার লাগেজ নিয়া ভাগছে।

– লাগেজ নিয়া ভাগছে মানে………!!!

– ও বলছিল বাড়ি থেকে ঝামেলা করতেছে। আমার সাথে পালিয়ে যাবে। আমিও অবলা ভাইবা রাজি হয়ে গেছিলাম। আজকে সন্ধ্যায় ভাগার কথা ছিল সেজন্য প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস পত্র কিনছিলাম আরকি। আর কিছু টাকা পয়সাও ছিল ওর কাছে। মাগার শালি যে আমারে আবুল বানায়ে আরেক পোলার লগে ভাইগা যাবে এইটা কে জানতো। মানইজ্জত তো সব গেল রে দোস্ত। কি করমু এহন একটু বুদ্ধি দে।

মফিজ এর সাড়ে ছয় ইঞ্চি মুখে প্রায় বত্রিশ ইঞ্চি দুঃখ দেখে এবার খানিকটা জ্ঞানী জ্ঞানী ভাব নিয়ে ওকে সান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করলাম…. শোন দোস্ত, প্রেম হইল নয় মাসের দুই দাঁত ওয়ালা বাবুর মত। তুই যতই ওর পেছন ছুটবি ও ততই তোর কাছ থেকে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করবে। আর যখনি তুই অবলা প্রাণীর মত চুপ চাপ নিজের জাগায় দাড়িয়ে থাকবি ও তখনি তোর কাছে এসে ঘেঁষাঘেঁষি করবে যেন ওর পিছনে ছুটিস। তখন তাকে তাড়িয়ে দিলেও সে তোর পিছু ছাড়বে না।

ও আমার উত্তর শুনে মনে হইল আকাশ থেকে পড়ছে। যদিও ওর মাথায় কিছুই ঢুকে নাই পুরাটাই প্রায় এক হাত উপর দিয়ে গেছে। তার পরেও ওকে আমি আর কোন কথা বলার সুযোগ দিলাম না। সোজা বাড়ি গিয়ে একটা ঘুম দিতে বললাম। আমি জানি ও খুব সহজে ঘুমাবে না। আমার কথার মানে খুজে বের না করা পর্যন্ত ওর ঘুম হারাম।

বেচারা এত পিরীত পিরীত করেও আসল পিরীত এর দেখা পাইল না। আর যারা পিরীত নামে কিছু একটা আছে সেটা পর্যন্ত বিশ্বাস করেনা তাদের অভাব হয় না। পিরীত এর এই এক্কাদোক্কা খেলাটা বড়ই জটিল। মফিজ এর মত সরল মানুষের মাথায় এটা ঢুকে না। আর ঢুকলেও সেটা বেশি সময় স্থায়ী হয় না। মস্তিস্ক নামক চিজ তার জায়গা পাল্টালেও মন নামক মূর্খ চিজটা স্থির ভাবে তার জায়গাতেই থেকে যায়। পাগল কে বোঝানো সম্ভব মন কে বোঝানো সম্ভব না। আর সেই মন ই কিনা পিরীত এর বাহক।

আজন্মকাল থেকে মফিজ এর যাত্রা এভাবেই হয়ে আসছে আর হতে থাকবে। ভালবাসা তার নিয়ম পাল্টাবে না। শুধু মাত্র রূপের পরিবর্তন হবে। বেস্ট অফ লাক মফিজ।

লিখেছেনঃ Nx Rößïn

About Aurthohin

Check Also

ভাত, কাপড়, ভালবাসা

( ভুমিকায় বলে নেই, গল্পের বক্তা চরিত্রটির মত আমিও নারীবাদি নই।আমি মানি নিয়তি নারী পুরুষ …