Home / মনের জানালা / মৃত্যুপুরী থেকে মৃত একজন

মৃত্যুপুরী থেকে মৃত একজন

mrittupuriহুম আজ আমি চলে গেছি তোমাদের ছেড়ে অনেক অনেক দূরে বহুদূরে।না ফেরার দেশে। চলে গিয়েছি বললে হয়ত ভুল হবে অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাকে তোমরা পাঠিয়ে দিয়েছো নাম না জানা দেশে। কিন্তু তোমরা কি জানো আমি যে এতটা তাড়াতাড়ি যেতে চাইনি।বিন্দু মাত্রও ইচ্ছা ছিলো না এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে কিংবা প্রিয় মানুষদের ভালোবাসাগুলোকে ভুলে গিয়ে একা একা থাকার। চেয়েছিলাম আরও অনেক দিন তোমাদের মাঝে তোমাদের ভালো বাসায় মিশে থাকতে।তবে কোন অপরাধে তোমরা এত বড় শাস্তি দিলে !! কোন দোষে এতটা হিংস্র ভাবে আগুনের তেজে পুরিয়ে ঝলসে দিয়ে পৃথিবীছাড়া করলে!!শুধুমাত্র তোমাদের এই নির্মমতার জন্যই বাকি জীবন এইভাবেই একা একাই থাকতে হবে!!

তোমরা কি জানো আজ আমি বাতাসের সাথে মিশে গিয়ে দেখে এসেছি আমার সেই ছোট্ট বাচ্চাটাকে যে কিনা একটা রাতও আমাকে ছাড়া ঘুমোয়নি।দেখলাম তার চোখ দিয়ে যেন সমুদ্রের জল বাধাহীন ভাবে গরিয়ে গড়িয়ে পরছিলো। আমি ছিলাম তার অনেক কাছেই। অনেক আদর করেছিলাম আমার মানিকটাকে। চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিয়েছিলাম।সে যেন আমার স্পর্শ টের পেয়ে কান্না থামিয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিলো। বিশ্বাস করবে তোমরা খুব ইচ্ছা হচ্ছিলো আমি ঐ মৃত্যুপুরী থেকে ফিরে আসি।মানিকটাকে কোলে তুলে বলি দেখো -‘তোমার মা আবারও তোমার মাঝে ফিরে এসেছে, মা আজ তোমায় কথা দিচ্ছে আর কখনই তোমায় ছেড়ে যাবেনা…” তোমরা কি বলতে পার কেন তোমরা এই বাচ্চাটাকে এতিম করে ফেললে?এই বাচ্চার মত আরও কত শত বাচ্চাকে বাবা মা হারা কেন করলে?? তোমাদেরও তো বাচ্চা আছে।এই মা বাবা ভালোবাসা ভুলে থাকা যে কত কষ্টের তোমরা কেন একবারও চিন্তা করলেনা? কেন তোমাদের মন পশুর চেয়েও অধম হয়ে গেছে???

বাচ্চার সেই মায়াবী মুখের দিকে ছিলাম বেশ অনেকটা সময়। ইচ্ছা হচ্ছিলো চিৎকার করে কান্না করি।কিন্তু মৃত মানুষ রা কি আর কান্না করতে পারে বল? দেখলাম আমার বাচ্চার বাবাটার অস্থিরতা।একটু পর পর এসে বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে আদর করছে আর বিলাপ করছে-‘কেন চলে গেলে?কি করে থাকবো তোমায় ছাড়া?’ জানো তোমাদের একটা মজার কথা বলি এই লোকটার সাথে আমার সবসময়ই ঝগড়া হত। টানাটানির সংসারে কি আর আহ্লাদ করলে চলে?? ভোর হলেই পেটের সন্ধানে দু জনই ছুটে যেতাম যে দিকে সুযোগ হত সেইদিকে। আজও আমি তার সাথে অনেক ঝগড়া করে বের হয়েছিলাম। কারন আর কিছুই না। ঘরে চাল নাই টাকা নাই। বাচ্চার খাবার নেই আরও কত কিছু। কিন্তু জানিনা আজ কেন যেন সে আমার সাথে এত টুকুও রাগারাগি করেনি। শুধু বলেছে একটু ধৈর্য ধর একটা চাকরী হবার কথা ।ওখানে চাকরী হলেই তোমাকে আর গার্মেন্টে যেতে দেবোনা। তুমি বাচ্চাকে দেখা শোনা করবে আর আমি শধু দু হাতে টাকা এনে তোমার হাতে দেব। আমাদের অনেক ঝগড়া হলেও এই ছোট্ট সংসারটা ভালোবাসা মাখামাখি হয়েছিলো। তার মাঝ থেকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার তার পাগলের মত কান্না করতে দেখে ইচ্ছা হচ্ছে দু হাত দিয়ে মুখটাকে আগলে ধরে বলি আমাকে ক্ষমা করে দিও…!!!শুধুই একটাই আফসোস যে মানুষটাকে এতটা ভালোবাসি তাকে আজ পর্যন্ত ভালবাসার কথা বলতে পারলাম না…!!

এবার আমার কথা রেখে বাকিদের কথা বলি।তোমরা আমার সাথে আরও যাদেরকে নিকৃষ্টভাবে পুড়িয়ে হত্যা করেছ তাদেরই এক জন আমার কাছে এসে হাউ মাউ করে কান্না জুড়ে দিল।বেচারা কাদতে পারছিলো না তারপরও শুধু বিলাপ করছিলো।তাকে শান্ত করে জিজ্ঞেস করলাম কেমন দেখে এসেছে পরিজনদের। নির্বাক হয়ে বলা শুরু করে মাত্র কয়েকমাস আগে নাকি তার বিয়ে হয়েছিলো। তার বউটা বার বার স্বামীর শোকে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে।আর তার বাবার অবস্থাও নাকি খুব খারাপ।হায়রে!! কি বলে তাকে সান্তনা দেবো আমার নিজেরও জানা ছিলোনা। তাকে শুধু এটুকুই বললাম ‘আমাদের যে কিছুই করার নেই’ !!

শুনলাম আমাদেরই একজনের ২ মাসের বাচ্চা যার কিনা এখনও কোন বুঝ হয়নি মাকে মনে রাখার মত সেও আজ আমাদের সাথে একই পথের পথিক।আরেকজন এসে বলল তার ছোট্ট মেয়েটার সাথে আজ কথা বলার সময় মেয়েটা অনেক আহ্লাদ করে বলছিলো আব্বু তোমাকে অনেক বেশি ভালোবাসি।হয়ত মেয়েটা বুঝতে পেরেছিলো খুব শীঘ্রই বাবাটা তার কাছ থেকে হারিয়ে যাবে।!! আরও কত কিছু শুনলাম।সবার আকুতি মিনুতি শুনলাম। শুনে শুনে নিজের কষ্টের পাল্লা ভারি করলাম! এইটা করা ছাড়া এখন আর কি করার আছে বল !!

ওহ শুনলাম আজ নাকি তোমরা শোক দিবস পালন করছো?? জানো এই খবরটা শুনে আমাদের এত দুঃখের মাঝেও প্রচন্ড হাসি এসেছিলো।আর সেই সাথে ক্রোধ আর ঘৃনাও কাজ করছিলো।কি হবে এই শোক পালন করে??? তোমরা কি ফিরিয়ে দিতে পারবে আমাদেরকে আমাদের ভালোবাসার মানুষদের কাছে??ফিরিয়ে দিতে পারবে হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে তার বাবা মায়ের কাছে??আদর স্নেহ মমতা দিয়ে ঘুচিয়ে দিতে পারবে নিষ্পাপ এতিম বাচ্চাগুলোর বাবা মার ভালোবাসার জায়গাটা?পূর্ন করে দিতে পারবে ভাই বোনের সেই মধুর সম্পর্কের বাঁধন?? পারবেনা কিছুই পারবেনা !! তবে কেন শুধু শুধু লোক দেখানো শোক দিবস পালন করছো? কেন আমাদের কষ্টের আগুনটা এই দিবস টিবস পালন করে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছো? কেন তোমরা যারা আমাদের পুড়িয়ে কয়লা করেছে তাদের খুঁজে বের করছোনা? কেন তাদের শাস্তি দিচ্ছোনা??? তবে কি ধরে নেবো আমরা যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে শরীরের রক্ত পানি করে দেশের উন্নতিতে নিজেদের সঁপে দিচ্ছি তাদের মৃত্যুতে তোমাদের কিছুই যায় আসেনা!!!

ধিক তোমাকে। ধিক তোমাদের মত পাষন্ড মানুষদের যারা আজ পশুর চেয়েও অধম হয়ে গেছো !!

শুধু অপেক্ষায় রইলাম যারা আজ আমাদের পুড়িয়ে মেরেছো তাদের ভবিষ্যতের করুন অবস্থা দেখার জন্য…

লিখেছেনঃ Salma Ahmed

About Aurthohin

Check Also

ভাত, কাপড়, ভালবাসা

( ভুমিকায় বলে নেই, গল্পের বক্তা চরিত্রটির মত আমিও নারীবাদি নই।আমি মানি নিয়তি নারী পুরুষ …