Home / মনের জানালা / ভালবাসার প্রতিদান

ভালবাসার প্রতিদান

protidan১.
বেইলী রোডের নাট্যাঙ্গনে দুই তরুণ তরুণীকে দেখা যায় পাশের একটা ফাষ্ট ফুটের দোকানে কথার ফুলঝুরি ছড়াতে।কখনো তাদের হাতে থাকে স্যান্ডউইচ কখনো বা দুটো কোল্ড ড্রিংসের বোতল।অনেকের কাছেই এ দৃশ্য নতুন নয়।দোকানীর আগ্রহও একটু বেশী ওদের উপর।কারণ একটাই।অন্য সবাই আসে কালে ভদ্রে আর এ দু’টো পরিচিত মুখ তাদের নিয়মিত খরিদ্দার।সপ্তাহের দু’একটা দিন বেইলী রোডের এ দোকানটিতে তাদের আসা চাইই।দীর্ঘক্ষণ গল্পসল্প করে তারপর চলে যাবে নাটক দেখতে।যাওয়ার আগে দোকানীর বিলটা মেটাতে এগিয়ে যাবে মেয়েটা।ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একশত টাকার একটা নোট বের করে দেবে।দোকানী বিলটা নিয়ে বাকী টাকা এগিয়ে দিতে দিতে বলবে,আবার আসবেন আপা।নদী কোন উত্তর না দিয়ে ম্দু হেসে ফিরতি টাকাগুলো ভ্যানিটি ব্যাগে তুলে নিবে।সঙ্গের তরুণকে বলবে,চলো আকাশ নাটক বোধহয় এতক্ষণে শুরু হয়ে গেছে।এমনই ঘটে প্রতিনিয়ত।নদী আর আকাশ।এ দুই তরুণ তরুণী তাদের মেলামেশার জন্যে যে স্থানটি বেছে নিয়েছে সেখানেই দুটো নাট্যশালায় চলে ছুটির দিনে ভিন্ন ভিন্ন নাটক।সব নাটকই যে নদী আর আকাশ দেখে,তা নয়।ভালো লাগলে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সিটে বসে থাকে।তা না হলে দশ বিশ মিনিট পরই উঠে বেরিয়ে আসে।
নদীই বলে,ভেতরে বড্ড বোরিং লাগছে।তার চেয়ে চলো রমনা লেকের পাশে বসে সময় কাটিয়ে আসি।দ্বিরুক্তি করেনা আকাশ।নাটকের চেয়ে নদীর সাহচর্যই তার কাছে বেশী মোহনীয়।রমনা লেকের পাশে বসে গল্প করে দুই তরুণ তরুণী।একদিন বর্ষার মৌসুমে আকাশে মেঘ জমে উঠে।দু’এক ফোটা করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করে।আকাশ উঠতে চায়।নদীই বসিয়ে রাখে।আরো কিছুক্ষণ থেকে যায়।সবাই দেখ চলে যাচ্ছে।কাছে কোথাও রিক্সা পাবেনা।গেট পর্যন্ত অতদূর হেটে যেতে যেতে একদম ভিজে যাবে।নদী বলে,আমার কিন্তু বেশ লাগছে।অনেক দিন বৃষ্টিতে ভিজিনা।আজকে না হয় দু’জনে মিলে ভিজবো।সর্দিজ্বর হলে কিন্তু আমাকে দোষ দিতে পারবে না।একশো বার দিবো।আমার কোন ক্ষতি হলে সব দোষ তোমাকে দেব।বলতে বলতে নদী মাথাটা আকাশের বুকের মাঝে এলিয়ে দেয়।কি করছো নদী?কেউ যদি দেখে ফেলে?উহ্!তুমি খুব বেশি নার্ভাস।দেখনা বৃষ্টির ফোটা পরছে।সবাই চলে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত।এখানে বসে বসে কে ভিজছে তা দেখার মতো কারো আগ্রহ নেই।চারদিক তাকিয়ে আকাশ বুঝতে পারে কথাটা মিথ্যে বলেনি।পার্ক একদম খালি হয়ে গেছে।সবাই চলে যাচ্ছে বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্যে।এবার নিজেও সাহস ফিরে পায়।বুক থেকে দু’হাত দিয়ে নদীর বৃষ্টি ভেজা মুখটা তুলে নিজের মুখের সামনে নিয়ে আসে।তোমাকে অপরুপ লাগছে নদী।মুখ থেকে গড়িয়ে পড়া বৃষ্টির ফোটাগুলো মনে হচ্ছে মুক্তো হয়ে ঝরে পড়ছে।তুমি যতক্ষণ চাইবে আমি এভাবেই তাকিয়ে থাকবো তোমার বৃষ্টি ভেজা মুখের দিকে।আর তাকাতে হবে না।নদী এবার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটা গুটানো ছাতা বের করে বলে,চলো এখন উঠা যাক।একদিন ডিভি লটারী নদীকে পূরণ করতে বলে আকাশ।নদী অবাক হয়,এ ফরম পূরণ করে কি হবে?আমি কি তোমাকে রেখে আমেরিকা যেতে চেয়েছি?আমাকে রেখে যাবে কেন একসঙ্গে দুজনেরটাই পাঠাচ্ছি।যে কারো হয়ে গেলে তারপর দেখা যাবে।একজন আরেক জনকে নেয়ার ব্যবস্থা করে ফেলবো।নদী হাসে।তোমার সব অদ্ভুত।চিন্তা দেশে কিছু হচ্ছেনা বলে বিদেশে চলে যেতে চাচ্ছো।তাও আবার ভাগ্যের উপর নির্ভর করে।কি করবো বলো,মাস্টার্স শেষ করার পর গত এক বছর ধরে বসে আছি।দরখাস্ত করে করে ক্লান্ত হয়ে পরেছি।এখনও চাকরী নামের সোনার হরিণের খোঁজ পাচ্ছি না।একটা কিছু করতে না পারলে দুজনের সংসার করার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে।তা হবে না আকাশ।স্বপ্ন একদিন বাস্তবে রুপ নেবে।যতদিন চাকরী না হচ্ছে আমিতো আছি।তোমার উপর নির্ভর করতে আমার লজ্জা লাগে।এ ভাবে আর বেশি দিন চলাযায় না।কেন যাবে না।
যতদিন তোমার কিছু না হচ্ছে আমিই খরচ করবো।সময় হলে না হয় সুদে আসলে শোধ করে দিও।তাই করতে হবে।এ ছাড়া আমার অন্য কোন উপায়ান্তর নেই।তোমাদের টাকার অভাব নেই,আমার আছে।এমন একটা অসম অর্থনীতির উপর ভালোবাসার ভীত কতটুকু মছবুত হয় বলতে পারো?টাকা পয়সা দিয়ে ভালোবাসা মাপা যায় না আকাশ।ভালোবাসা মাপতে হয় হ্দয়ের আবেগ দিয়ে।তোমার সঙ্গে আমার হ্দয়ের মিল হয়েছে বলেই না এ কয়টা বছর ধরে দুজন দুজনকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছি।তা ঠিক।তবে ভয় হয় এভাবে আর কতদিন চলবে।যতদিন তোমার চাকরী না হয়।আমিতো বাসায় বলেই রেখেছি এখন বিয়ে টিয়ে করবো না।চাকরি আকাশের হয় না।থাকার একটা ব্যবস্থা হলেও নদীই বা কতদিন অপেক্ষা করবে?আকাশ মফস্বলের স্কুল মাস্টারের ছেলে।ভার্সিটির মেধাবী ছাত্র আর সুদর্শন চেহারার আকর্ষণে প্রেমে পড়ে যায় ধনীর তনয়া নদী।গত কয়েকটা বছর স্বপ্নের ঘোরে থাকলেও আকাশ বুঝতে পারে বাস্তব দুনিয়া কত কঠিন।বাবার পছন্দ করা একটা মেয়েকে প্রত্যাক্ষাণ করে এসেছে।বাবাকে বলে এসেছে,সে একটা মেয়েকে ভালবাসে।তাকেই বিয়ে করবে।এর আগে নিজে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়।

২.
ঢাকায় ফিরলে নদী তাকে সুখব দেয় যে,তার ডিভি লটারীতে নাম এসেছে।আনন্দে উত্‍ফুল্ল হয়ে আকাশ বলে,খুব খুশির সংবাদ।তুমি আমেরিকার সিটিজেনশিপ পেয়ে গেলে আমাকে নিয়ে নেবে।কিন্তু তার আগে যে সিটিজেনশিপ পেতে হবে।সে পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করে থাকবো।ছেলেরা সিটিজেনশিপ পেয়ে বিয়ে করে মেয়েদের নিয়ে যায়।তুমি না হয় মেয়ে হয়ে আমাকে নিয়ে যাবে।ব্যপারটা উল্টো হলেও দুজনের জন্যেই সুখের।তুমি যখন বলছো তা হলে আমার যেতে আপত্তি নেই।বাবা মা’ও রাজী আছে।নদী সত্যি সত্যি একদিন চলে যায় সুদূর আমেরিকায়।এদিকে আকাশের অপেক্ষার দিন শেষ হয় না।প্রথম প্রথম দু’একটা চিঠি পেয়েছে নদীর কাছ থেকে।তারপর হঠাত্‍ করেই চিঠি আসা বন্ধ হয়ে যায়।আকাশ লিখলেও উত্তর আসে না।এর মাঝে একটা আন্তর্জাতিক হোটেলে রিসেপশন অফিসারের চাকরী পেয়ে যায় সে।নদীর জন্যে অপেক্ষা করে চলে।মাঝে মাঝে মনে হয় মিথ্যা আশ্বাস দিয়েছিল তাকে।আমেরিকা যেয়েও সব ভুলে গেছে।আকাশকে আর প্রয়োজন নেই।কাছে থাকলে যাকে আপন মনে হয় দূরে চলে গেলে তাকে বোধহয় সহজেই ভুলেথাকা যায়।নতুন জয়েন করেছে রিসেপশনিষ্ট কেয়া।দেখতেও যেমন মনকাড়া চেহারা কথাবার্তা চলনে বলনেও তেমনি এক সদা উত্‍ফুল্ল চঞ্চলা হরিণী।আকাশের সাথে নিজ থেকে এসেই আলাপ করতে চায়।গায়ে পড়ে এসে ঘনিষ্ঠতা দেখার।আকাশের এসব ভালো লাগে না।সে অপেক্ষা করছে নদীর।
হয়তো একদিন চলে আসবে।না হলেচিঠি লিখে জানাবে আকাশকে নেয়ার সব ব্যবস্থা করে ফেলেছে।একদিন থিয়েটারের একটা কার্ড আকাশের হাতে দিয়ে কেয়া বলে,স্যার আপনি দেখলে খুশি হবো।নিজেও অভিনয় করছি কিনা।আকাশ বলে,আমিতো এখন থিয়েটার দেখিনা।আমার জন্যেনা হয় দেখবেন।সামনের শুক্রবার ছুটির দিন।তেমন অসুবিধা হবে না।এক সময়ে থিয়েটার আকাশের অসুবিধা হতো না বরং উত্‍সাহই বোধ করতো নদীকে নিয়ে সময় কাটাতে।তুমি যখন বলছ চেষ্টা করবো।চেষ্টা নয় স্যার।আপনাকে যেতেই হবে।আমার জন্য না হয় একদিন আপনার সময় নষ্ট হলো।আকাশ উপেক্ষা করতে পারেনি কেয়ার অনুরোধ।থিয়েটার শেষে বের হতেই গেটের কাছেই কেয়ার সাথে দেখা।বলে,আপনার জন্যই অপেক্ষা করছি।কেমন দেখলেন আমাদের নাটক?মন্দ না।তুমিতো সুন্দর অভিনয় করতে পারো।সব সময় পারি না।তার মানে?যেমন আপনার সঙ্গে যখন কথা বলি তখন অভিনয় আসে না!তুমি বোধহয় ভুল করছ কেয়া।আমি এখনো কারো জন্যে অপেক্ষা করছি।বলে ভালই করেছেন।না হলে আরো বড় ভুল করে ফেলতাম।রিসেপশনের ফোন বেজে উঠে।কেয়া ফোন ধরে আকাশকে বলে,স্যার আপনার টেলিফোন আমেরিকা থেকে।নদীই ফোন করেছে।আকাশ ফোন ধরেই অনুযোগ করে,এতো দিন পরে মনে হলো?সময় করতে পারি না।কবে আসবে?আপাতত দেশে ফেরার ইচ্ছে নেই।কেন?আমি এখানেই সেটেলড হয়েছি।তোমাকে জানানো হয় নি ঈশান নামে একটা ছেলেকে বিয়ে করেছি।ছেলেটা ইঞ্জিনিয়ার।আমরা একই সঙ্গে কাজ করি।তোমার প্রতি আমি কৃতঞ্জ।সাময়িক কষ্ট পেলেও সময়ে হয়তো সবই ভুলে যাবে।আকাশ কিছু না বলেই রিসিভারটা রেখে দেয়।কেয়া জিঞ্জেস করে,স্যার ওখানে আপনার কে আছে?কেউ নেই।তা হলে যে টেলিফোন এলো?ভুলে করেছে।ভুলে যাওয়ার জন্যে সৌজ্যতার খাতিরে একবার হলেও করে।ও প্রসঙ্গ থাক।আজকে তোমাকে নিয়ে লাঞ্চ করবো-রাজী?কেয়া একটু অবাক হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে,সেটা কি ভুল হবে না?না।তুমি তো আর আমেরিকা চলে যাওনি।ধরা ছোয়ার মাঝে আছ।এত সহজে ভুল হবে না।কেয়া কিছু একটা বুঝে নিয়েছে।আকাশের প্রস্তাবে সে রাজী হয়ে যায়। *

লিখেছেনঃ Mazharul Islam Tusar

About Aurthohin

Check Also

ভাত, কাপড়, ভালবাসা

( ভুমিকায় বলে নেই, গল্পের বক্তা চরিত্রটির মত আমিও নারীবাদি নই।আমি মানি নিয়তি নারী পুরুষ …