Home / মনের জানালা / “নীলগিরি ও অন্যান্য” পর্ব-২

“নীলগিরি ও অন্যান্য” পর্ব-২

nilgiri৩.
বাসায় গিয়েই রুদ্র পিসি অন করল ,সিমির আজ স্কাইপিতে বসার কথা ।অলরেডি আধঘন্টা দেরী ।না জানে সিমি কতটা রেগে আছে ।সিমির সাথে পরিচয় সেই ছোটবেলা থেকে ,বাবার বন্ধুর মেয়ে।তখন থেকেই সিমিকে অনেক পছন্দ করে রুদ্র ।বয়সে রুদ্রের থেকে বছর খানেক ছোট হবে ।পাঁচবছর আগে ডিভি লটারিতে সিমিরা সপরিবারে আমেরিকায় চলে যায়,তাই ওদের মাঝে একটা গ্যাপ চলে আসে ।ইদানিং ফেসবুকের মাধ্যমে সম্পর্ক অনেকটাই আগের মত হয়ে আসছে।রুদ্র এতদিন ভয়ে ছিল ,পাছে সিমিকে হারায় ফেলে,ভালোলাগা কখন যে ভালোবাসায় রূপান্তরিত হয়েছে ও নিজেই জানে না।যখন জানতে পারছে সিমি এখনও সিঙ্গেল তখন মনের একটা বোঝা নেমে গেছে রুদ্রের ।মোবাইল টা বাজছে ।পিয়া ফোন দিছে ।
-কীরে পৌছায়ছিস ?
-হুম ।মাত্র ।
-একটা ফোন তো দিবি,না ?
-আমি জানি তুই দিবি ,তাই আর
কথা আর শেষ করতে দিল না পিয়া
-ও জানতি ,না?
পু পু পু ।লাইন কেটে দিছে পাগলীটা ।রুদ্র এর মাঝেও হেসে দিল ।পুরো বিকাল পার করে সন্ধ্যা পর্যন্ত পিয়ার সাথে কাটানোর পরেও তার সাথে ফোনে আবার কথা বলা চাই চাই ।রুদ্র ভাবল একটু পরেই কল দেয় ।এখন দিলেও ধরবে কিনা সন্দেহ ,আবার যদি ধরেও তবে ঘন্টাখানেকের আগে কথা শেষ হবে না ।স্কাইপি অন করে দেখে সিমি আছে।সিমিকে কল দিল ,সিমি ধরেই বলল
-স্যারের সময় হয়েছে তাহলে ।
ভিডিও টা ওপেন হয়ে গেছে ,সিমির মুখে মিটমিটে হাসি ।ওর চেহারা দেখেই রুদ্রের মন ভালো হয়ে গেল একটু বেশীই ।এমন টা নয় যে সিমি ওকে কোন বিষয় নিয়ে জোর করে ,তবু ও একটু দোটানায় থাকে পাছে সিমি কিছু মনে করে ।জবাবে রুদ্র জানালো
-আপনার জন্যে তো সময় আমার অফুরন্ত ম্যাডাম ,আপনি তো সেটা বুঝলেন না ।তা কেমন আছেন আপনি ?
-হয়েছে ,থামো ।আমি ২০ মিনিট ধরে যে তোমার পথপানে চেয়ে অনলাইনে আছি ,তা তোমার অফুরন্ত সময়েরা কই ছিলো ?
মিথ্যে চোখ পাকিয়ে জানতে চাইলো সিমি ।
রুদ্র মনে মনে হাসে আর মুগ্ধ হয়ে ভাবে ,মেয়েটি কী জানে তার সহজ সরল হাসি খুশী চেহারা যে কত মায়াবী আর স্নিগ্ধ !
-পিয়ার সাথে ছিলাম ।ওর সাথে দেখা করে আসতে আসতেই দেরী হয়ে গেল ।
-কেমন আছে পিয়া ?
-আছে ও ওর মত ।আচ্ছা সিমি ,তুমি কী জানো পৃথিবীতে স্বার্থহীন সম্পর্ক কোনটি ?

৪.
সেমিস্টার ফাইনাল শেষ হল অবশেষে ।নীল কত কী প্লান করে রেখেছিল যে পরীক্ষার পর করবে,কিন্তু পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর কোন কিছুতেই আগ্রহ খুঁজে পাচ্ছেনা ।দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর খুব অলস ভঙ্গিতে পিসির সামনে বসল ।নেই কিছু ,তো আছে ফেবু ।লগ ইন করে দেখে কেউ অনলাইনে নেই ।বিরক্তির চরমে পৌঁছালো ।ফ্রেন্ড লিস্টে সাড়ে চারশো জন ,অথচ এই সময়ে সবাই যেন একসাথে পটল তুলতে গেছে।যখন মেজাজ খারাপ করে লগ আউট করতে যাবে ,তখনই চ্যাটে একজন নক করে ।নামটা দেখেই নীলের মন ভালো হয়ে যায় ।আরেহ ,এ তো মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির মতো ব্যাপার ।সাবরিন পিয়া ,মানে রুদ্রের ফ্রেন্ড পিয়া লিখে পাঠিয়েছে
-hi
নীল খুশি মনে রিপ্লাই দিল
– hello
-ki khobor tor?
-ei to !passing boring time
-xm end?
-hmmmmmmmm
এভাবেই শুরু হল নীল আর পিয়ার চ্যাটিং ।বেশীর ভাগ সময়ই আলোচনার বিষয় বস্তু থাকে সমসাময়িক খবরাখবর ।কে কী করছে ,কী ভাবছে ,ভবিষ্যতে কী করা যায় ,এসব মামুলি কথা বার্তা ।নীল রুদ্রের সাথেই পিয়াকে দেখেছে কয়েকবার ,সম্পর্কটা হাই হ্যালো বাই পর্যন্তই ছিল ।নীল কখনই পিয়ার সাথে যেচে কথা বলেনি ,তবু পিয়া সম্পর্কে যা জানার তা মোটামুটি রুদ্রের কাছ থেকে জেনেছে ।সামনাসামনি যখন কথা হয় ,তখন ভাববাচ্যেই কথা চালায় যায় একে অপরের সাথে ।তাই আজ পিয়ার তুই সম্বোধনে নীল কিছুটা আড়ষ্ট বোধ করলেও চালায় যায় । পিয়াকে দেখে মনে হয়না এত কথা জানে মেয়েটি ।দেখলেই মনে হয় পাশের বাসার মেয়েটি যেন আনমনে ছবি আঁকছে কোন ক্যানভাসে ,যে ছবিতে ফুটে উঠছে তার সকল না বলা কথার ফুলঝুড়ি।অথচ রুদ্রের কাছেই জেনেছে মেয়েটির আপন যত খেয়ালি কথামালা ,এলোমেলো ভাবনা ,নবপ্রস্ফুটিত চিন্তা ,মস্তিষ্কের অহেতুক আস্ফালন ইত্যাদি সকল কিছু রুদ্রের নিকট এমন কর বলে,ঠিক যেমন করে পেঁজা মেঘেরা একীভূত হয় দূর দূরান্ত থেকে ।এরপর রুদ্রের মতামত যেন বিদ্যুত চমকিয়ে ধারাপাত ঘটায় এই ছোট্ট পৃথিবীতে ।পিয়ার এই ভাবনাশক্তি নীল কে কেমন অদৃশ্যভাবে আকৃষ্ট করে ।মনে হয় পিয়ার পাশে যেয়ে দাড়াতে ।ভিক্ষা চাইতে ইচ্ছে করে পিয়ার সকল না জানা অনুভূতির ভাবনা কে ।কিন্তু সাহস হয়ে ওঠে না ,পাছে পিয়া ভুল বোঝে ।রুদ্রকে দেখে খুব হিংসা হয় ,ও পিয়ার মত এমন ফ্রেন্ড পেয়েছে ।
যতটুকু নীল জানে ,তাতে পিয়া এখন অব্দি সিঙ্গেল ,আর রুদ্র তো আছে ছোট্ট বেলার প্রেম সিমিকে নিয়ে।সিমি মেয়েটা বডড ভালো ।এ যুগে এমন মেয়ে পাওয়া বিরল বললে ভুল হবে ,বলতে হবে দুষ্কর ।
নীলের এসব ভাবনা শেষ না হতেই রুদ্রের ফোন ।সেমিস্টার শেষে ও ঘুরতে গিয়েছিল মামাবাড়ি । আজ ফিরেছে নিশ্চয় ।নীল কথা বলল প্রায় ৪৭মিনিট ২৬ সেকেন্ড ।কথা শুনে কেমন খালি খালি লাগছিলো ,বুকের ভেতর না মাথার ভেতর,ঠিক বুঝতে পারছিলোনা ।তবে কিছু একটা যে ভুল হচ্ছে এটাই বার বার বোধ হচ্ছিলো।

৫.
বছর পাঁচেক পর রুদ্র -সিমি আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে এসেই নীলের অফিসে হানা দিয়েছে ।রুদ্র এসেই জানায় ওর অনেক দিনের ইচ্ছা দুই বন্ধু বৌ দের কে নিয়ে পাহাড় ছোঁবে।এ কথা শুনে নীল একটু শুকনো হাসি দিল রুদ্রের ছেলেমানুষি দেখে ।এবং বুঝেও গেলো এ কথা রুদ্রের না ,এ ইচ্ছা ও রুদ্রের না ,এ ইচ্ছা পিয়ার ।মেয়েটি পাহাড়ে চলে যেতে চেয়েছিল রুদ্রের সাথে ।চেয়েছিল মেঘের সাথে কথোপকথন ,ঝর্ণার সাথে হাসাহাসি,বাতাসের সাথে ফিসফিসানি ,আলিঙ্গন করতে চেয়েছিল সবুজ কে ,আর হৃদয়ে ধারণ করতে চেয়েছিল আকাশ কে ।কিন্তু কিছুই হয়নি ।রুদ্র পিয়ার ভাবনাশক্তিকে দুমড়িয়ে মুচড়িয়ে সূর্যের তেজে পুড়িয়ে ক্ষতবিক্ষত করে পিয়াকে নীলের কাছে হস্তান্তর করে বলে ,নীল ,আমি জানি তুই আমাকে ধিক্কার দিবি ,আমাকে স্বার্থপর বলবি ,আরো অনেক কিছুই বলবি এবং বলতেও পারিস ।আমার কোন দুঃখ নেই এতে ।কিন্তু পিয়া যে একটা মোহের মধ্যে আছে এটা তোকে মানতেই হবে ।ও আমাকে নিয়ে যে স্বপ্ন দেখেছে তার কোনই ভিত্তি নেই ।আমার পক্ষে সম্ভব না ওর স্বপ্ন পূরণ করা ।আমি জানি তুই পিয়াকে পছন্দ করিস ,ভালোওবাসিস ।তুই পিয়াকে সময় দিলেই পিয়া তোর হয়ে যাবে ।মেয়েটা অনেক সহজ সরল ,তুই ওর পাশে যেয়ে দাড়া ,দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে ।সিমি বলেছিল ,আমাকেই বলতে ,কিন্তু আমি আর পারলাম কই।তাই সিমিই পিয়ার সাথে কথা বলেছে আমাদের ব্যাপারে ।তুই আমার খুব প্রিয় এক বন্ধু ,তাই আমার খুব কাছের বন্ধু কে তোর সাথে জুড়ে দিয়ে বন্ধুত্ব জোরালো করতে চাই ।তুই পিয়ার কাছে যা ।ভালো থাক ।তোকে পেলে আমাকে ভুলে যাবে ,বিশ্বাস ।
কথা গুলো মনে পড়ে নীলের কষ্ট টা আবার বাড়লো ।
মোবাইলে বলা রুদ্রের কথা গুলো এখন ও বাজে নীলের কানে ।একটি মেয়ের ইচ্ছের কী কোনও দামই নেই ।সেদিন নীল পিয়ার কাছে ছুটে গিয়েছিল রুদ্রের তথাকথিত সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে নয় ,দেখতে চেয়েছিল একটি ইচ্ছের মৃত্যুলগ্ন ।দেখেওছিল ।দেখে কষ্টের বোঝা বেড়েছিল বৈকী !কমেনি এক রত্তি ।
শুক্রবারে নীল খুব বেলা করে ঘুম থেকে উঠলো ।হেলেদুলে সাদা পান্জাবী পাজামা পড়ে জুম্মার নামাজ শেষে একটি অরফানেজ এ এলো ।হাতে বিরিয়ানীর প্যাকেট ।বাইরের দেয়ালের অবস্থা একেবারেই যাচ্ছেতাই ,তবু একটা সাইনবোর্ডে সুন্দর ভাবে লেখা নীলগিরি অরফানেজ ।ঢুকতেই বাচ্চা গুলো দৌড়ে বাবা বাবা বলে নীলের বুকে ঝাপিয়ে পড়লো ,নীলও অভ্যস্ত হাতে সবাই বুকে চেপে ধরল ।অন্তু নামের সর্বকনিষ্ঠ বাচ্চাটি মা মা বলে পিয়াকে ডেকে আনলো ।সপ্তাহ শেষে পিয়াকে দেখে নীলের চোখ জুড়ালো ,অনেক কথা গলার কাছে দলা পাকা হয়ে থাকলে ও শুধু একটি কথাই বলতে পারল ,অফিসে রুদ্র এসেছিল সিমিকে নিয়ে ,বললো সবাই মিলে পাহাড় দেখতে যাবে ,তুমি কী যাবে ?
পিয়ার ছোট্ট উত্তর ,না ।বাচ্চারা একা ভয় পাবে ।
বলেই বাচ্চাগুলোকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো ।
নীল জানালার কাছে গিয়ে খরখরা সূর্যকে দেখে মনে মনে রুদ্রকে বলল ,আমি এমন নিষ্প্রাণ পিয়াকে চাইনি রুদ্র ।তুই কেন আমার সাথে এমন করলি ?পিয়াকে ঠকানো উচিত্‍ হয় নি তোর ,একদমই না ।

লিখেছেনঃ মৌন মৌলি

About Kabir Hossain

Check Also

ভাত, কাপড়, ভালবাসা

( ভুমিকায় বলে নেই, গল্পের বক্তা চরিত্রটির মত আমিও নারীবাদি নই।আমি মানি নিয়তি নারী পুরুষ …