Home / মনের জানালা / “কৃষ্ণবতীর কৃষ্ণ অভিজ্ঞতা” পর্ব-১

“কৃষ্ণবতীর কৃষ্ণ অভিজ্ঞতা” পর্ব-১

krisnobotiআমি যদি আপনার নজরে পরি,তাহলে হয়তো আপনি দ্বিতীয়বার আমার দিকে ঘুরে তাকাবেন না।তবে তাই বলে আর দশটা কালো মেয়ের মতো হীনমন্যতায় ভুগবো আর ফেচ ফেচ করে কাঁদবো ওইরকম মেয়ে আমি নই।বিধাতার আর দশটি রঙের মত কালো একটি রঙ মাত্র।সাদাকে আমরা পছন্দ করি সেটা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির জন্যই।আজ যদি আমরা সাদার বদলে কালো ভালবাসতে শুরু করি তবে সাদাই অচ্ছুৎ হয়ে যাবে।মনের নোংরা দিকের মুখোশ হয়ে দাঁড়ায় এই গায়ের রঙটাই।তার সাথে আছে সমাজের লিঙ্গভেদের সীমাবদ্ধতা।ছেলে কালো হলে কালমানিক আর মেয়ে কাল হলে ‘কাইল্লা’…কালো বলে সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে নিগৃহীত হলেও সেটাকে সমাজের দুর্বলতা বলেই ভেবেছি। বয়স্ক হলেই অভিজ্ঞ হওয়া যাবে এটা কিন্তু আমি মানি না।আমার ২৫ বছরের জীবনে এমন কিছু অভিজ্ঞটা করেছি যেটা ৫০ বছরের কেউ সেটা অর্জন করেনি।আজ সেই অভিজ্ঞতাটাই শেয়ার করবো।এই ডিজিটাল যুগে সেটল মেরেজটা কিন্তু বিলুপ্ত হতে চলেছে।হয়তো আমাদের মত যারা কৃষ্ণবতীদের জন্যই এটা টিকে আছে।সেই আদিম পদ্ধতির মত সেজেগুজে পাত্রপক্ষের সামনে হাজির হওয়া আর পাত্রপক্ষের এক গামলা খেয়ে ঢেকুর তুলতে তুলতে পাত্রি দেখা।এটা আমার পছন্দ না হলেও বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে না করতে পারতাম না।

ঘটনা-১
বাবার জরুরী ডাকে ভার্সিটি ক্লাসের মাঝেই বাসায় ছুটে গেলাম।ফুপুর মুখে শুনতে পেলাম বিকালে আমাকে দেখতে আসছে।পাত্রের যোগ্যতা দেখে বাবারতো আনন্দ আর ধরে না।ফুপু আমাকে শাড়ি পরিয়ে দিল।এটাই ছিল জীবনের প্রথম শাড়ি পরা।আমি ভয়ে ভয়ে হাঁটছিলাম,ভয় হচ্ছিল এই বুঝি শাড়ি খুলে পরল।অনেকটা চার্লি চ্যাপলিনের মতো হাটতে হাঁটতে পাত্রপক্ষের সামনে গেলাম।ফুপু কড়া করে বলে দিয়েছিলেন ভুলেও যেন ঘাড় না উঠাই।দশ জোড়া চোখের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে গেলাম।চোখের কোন দিয়ে দেখে যা বুঝলাম তাঁতে পাত্রপক্ষের সবাই আমাকে হতাশ হয়েছেন।আর পাত্র বেহায়ার মতো আর কারো ধার না ধরে নিজেও আমার ভাইভা নেয়া শুরু করলো।আমারতো গায়ে জ্বলুনি শুরু হয়ে গেসে।পাত্রের ভাব দেখে মনে হচ্ছিল দুনিয়ার তাবৎ মেয়ে ওনাকে বিয়ে করার জন্য মুখিয়ে আছে।সবার সামনে সে আমাকে তুমি বলতে লাগলো।তার কথাবার্তাতেই বুঝতে পারছিলাম তার বিয়ের কোন মতলব নাই।আমাকে নিয়ে সে কিছুক্ষন নাটক করতে চাচ্ছে।পিত্তি জালানো হাসি হেসে আমাকে তার দিকে তাকাতে বলল।আমি রাগ সামলাতে না পেরে তার দিকে কটমট করে তাকাতে সে ভীষণ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো।কোন পাত্রি এরকম আসরে এভাবে তাকাবে,সে বোধহয় স্বপ্নেও ভাবেনি।

ঘটনা-২
ওইবারের খুব ভাল মনে আছে।এর মাঝে বেশ কয়েকবার বাধ্য হয়ে পাত্রপক্ষের সামনে গেলাম।আমি বোধহয় জন্মথেকেই একটু পাথর টাইপের।এজন্যই বেশ কয়েকবার পাত্রপক্ষ ফিরিয়ে দেবার পরও হতাশা আমাকে স্পর্শ করেনি।কিন্তু আমাকে নিয়ে বাসায় চিন্তার শেষ ছিল না।বাবার সাথে এই নিয়ে বেশ কবার ঝগড়াও হল।ঈদুল আজহার দুদিন পর পাত্রপক্ষ দেখতে এলো।ছেলেটা বেশ সহজসরলই মনে হল।আমাকে মনে হয় পছন্দই করেছিল।কিন্তু ছেলের আত্মীয়রা আমাকে দেখতে এসে এমন ব্যবহার করলো যে খুব কষ্ট পেলাম।ছেলের বোন নিজে নিগ্রো টাইপ কাল হয়েও এমন ভাবে ঠোঁট উল্টিয়ে কথা বলছিল যেন,মনে হচ্ছিল চড়িয়ে দাঁতগুলো ফেলে দেই।সবচেয়ে খারাপ কাজ করল ছেলের মা।আমার পায়ে একটি জন্মগত আঁচিল ছিল।ওইটা দেখে পাত্রের মা বলল,শরীরের আর কোথাও আছে কিনা।মেজাজ আর ধরে রাখতে পারলাম না।বলে বসলাম,আপনারা কি পাত্রী খুজতে আসছেন নাকি কোরবানির হাতে গরু চয়েজ করতে এসেছেন।আমি কালো বলে জীবনে কখনও দুঃখ করিনি।কিন্তু কেন জানি সেদিন খুব দুঃখ হচ্ছিল।

ঘটনা-৩
আমার জীবনে সবচেয়ে নিখাদ কাল ছেলে দেখেছিলাম আমার পাত্র হিসেবেই।এর থেকে বেশী আর কালো সম্ভব না।ছেলের ফ্যামিলির সবাই আমাকে পছন্দ করেছিল।সেই ছেলে আমাকে দেখে তার দুলাভাইকে ফিসফিস করে বলছিল সে আরও সুন্দরী মেয়ে বিয়ে করতে চায়।তার বাচ্চা বাচ্চা মুখে এই কথা শুনে ভীষণ হাসি পাচ্ছিল।ঘানা,নাইজেরিয়ার লোকজনও বোধহয় এতো কালো হয় না।তখন যদি অনন্ত জলিলের কথা জানতাম,তাইলে হয়তো বলেই বসতাম,আর ইউ পম গানা?পরবর্তীতে ছেলে রাজি হলেও আমার আম্মাজান এই বিয়েতে রাজি হননি।

ঘটনা-৪
এই ঘটনাটা আমি কোনদিন হয়তো ভুলতে পারবো না।মাসুদের হ্যান্ডসাম ছেলে আমার জীবনে কমই দেখেছি।ও ছিল বড়ভাইয়ার ফ্রেন্ডের মামাতো ভাই।ওর বাবা-মা দেশের বাইরে থাকতো।ভাইয়া সবসময় বলতো ওদের মতো রুচিশীল,আধুনিকমনা পরিবার আজকাল কমই আছে।মাসুদ যখন আমাকে দেখতে আসে তখন সাথে ছিল ওর বড়খালা।উনি আমাকে বেশ পছন্দ করলেন।আর মাসুদও তাতে আপত্তি করেননি।ফোনে মাসুদের বাবা কথা শুনে বুঝলাম ছেলের পছন্দের প্রতি তাদের কোনই অমত নেই।পরের একমাস মাসুদের সাথে আমার জীবনের সবচেয়ে স্বপ্নময় দিনগুলো কাটালাম।ছেলেটা আমাকে এতো বুঝত যে তাতে আমি নিজেই অবাক হয়ে যেতাম।তাছাড়া এরকম স্মার্ট একটা ছেলের সাথে নিজেকেই বেমানান লাগতো।কিন্তু বিধাতা তখনও আসল খেলাটা খেলেননি।১ মাস ৪ দিন পর মাসুদের বাবা-মা আমাকে দেখতে এলেন।যাবার সময় ওনাদের হাসিখুশি মুখ খুব আশ্বস্ত লাগছিল।কিন্তু এক সপ্তাহ পর যখন মাসুদের মুখে ওর বাবা মার অপছন্দের কথা শুনে আমার দুনিয়াটা যেন স্তব্দ হয়ে গিয়েছিল।মাসুদও বলল সে বাবা মার অমতে বিয়ে করতে চায় না।সবাই বলতো আমি নাকি হাসিখুশি মেয়ে।কিন্তু ওইদিনের পর আমার হাসি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

লিখেছেনঃ mahmud hasan

About Aurthohin

Check Also

ভাত, কাপড়, ভালবাসা

( ভুমিকায় বলে নেই, গল্পের বক্তা চরিত্রটির মত আমিও নারীবাদি নই।আমি মানি নিয়তি নারী পুরুষ …