Home / মনের জানালা / “কৃষ্ণবতীর কৃষ্ণ অভিজ্ঞতা” পর্ব-২

“কৃষ্ণবতীর কৃষ্ণ অভিজ্ঞতা” পর্ব-২

krisnobotiঘটনা-৫
জীবন কারো জন্য থেমে থাকে না।আমার ক্ষেত্রেও তাই হলো।কিন্তু মাসুদের ব্যাপারটা ভুলতে অনেক সময় লেগেছে।আমার জন্য কোন দুঃখ নেই।বিধাতা যদি কপালে বিয়ে রেখেই থাকেন তাহলে তার ঠিক করা ছেলেটার সাথেই বিয়ে হবে।কিন্তু খুব কষ্ট হল মায়ের জন্য।যেদিন মাসুদ আমাকে না করে দিলো,সেদিন মায়ের ডুকরে কান্না আমি জীবনেও ভুলতে পারব না।সবাই বলে আমি নাকি বাবার মতো হাসিখুশি হয়েছি।কিন্তু আমার হাসিখুশি বাবাটা যেন হতাশ,গোমড়া একটা মুখোশ পরে ফেললো।সকাল বেলা উঠে আমার মুখের দিকে তাকালেই বাবার চোখ থেকে টপটপ দুয়েকফোটা পানি ঝরে পরত।এরকম একটা বিধ্বস্ত পরিবেশে মনে হলো,জন্মটাই আমার যেন আজন্ম পাপ।এরপরও আমার বিয়ের পাত্রি সেজে বসা বন্ধ হয়নি।আত্মীয়স্বজনদের চাপে সপ্তাহ না ঘুরতেই সাজুগুজু করে নতুন নতুন ছেলের সামনে হাজির হতে হতো।কিন্তু বিধাতার দেয়া অতিরিক্ত মেলানিনযুক্ত চামড়ার জন্য পাত্রিনির্বাচন নামক পরীক্ষার প্রাথমিক পরীক্ষায় ফেল করে যেতাম।এসব করতে করতে একেবারে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি।এখন আর শাড়ি পরে পাত্রপক্ষের সামনে যেতে শাড়ি খুলে যাবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগিনা,কিংবা নার্ভাস হয়ে পাত্রপক্ষের সামনে চার্লি চ্যাপলিনের মতো হাটি না।কেউ বললে রোবটের মতো গুটগুট রেডি হয়ে হাজির হয়ে যাই।কলের পুতুলের মতো যা জিজ্ঞেস করা হয় তার উত্তর দেই। এর মধ্যে ঠিক করে ফেললাম আর বিয়ের পথে পা বাড়াবো না।কিন্তু দুর্ভাগ্য আর অপমান পিছু ছাড়েনি।বাবার এক বন্ধু হয়তো আমাকে করুনা করেই আমার জন্য একজন পাত্র ঠিক করলেন।বিপত্নীক পাত্রটি আমার ২১ বছরের বড়।সেইদিন নিজেকে সত্যি সত্যিই ভাঙ্গাকুলার ছাই মনে হচ্ছিল।

ঘটনা-৬

আরও এরকম ঘটনা বলতে চাইলে বলতে পারতাম।কিন্তু এতোকিছুর পরও হতাশাবাদী দলে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করিনি।বিধাতার সৃষ্টিকে কখনো অপমান করার মানে দেখিনি।বিধাতার সৃষ্টির কোন খুঁত নেই,বরং খুত আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির।বিয়ে নিয়ে বোধহয় তখনো কিছু চরম মুহূর্তের কিছু বাকি ছিল।যথারীতি কলের পুতুলের মত ২১তম বারের মত পাত্রপক্ষের সামনে হাজির হলাম।আমার কলেজ বন্ধু আব্দুল্লাহর পীড়াপীড়িতে এবার এই আয়োজন।তখনও পাত্র কি করে সেটা জানিনা।হুট করে অল্প সময়ের বেবধানে এতো কিছুও জানাও সম্ভব ছিল না।জীবনে এই প্রথম আমি পাত্র দেখে চমকে গেলাম।এই ছেলে দেখি আমার মতোই কালো।একটু হাবলু টাইপের চেহারা।পাত্রের প্রোফাইল শুনে চমকে গেলাম।বুয়েট থেকে পাশ করা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার।ছেলেটার সাথে কথা বলতে গিয়ে সহজ-সরলই মনে হলো।অন্য বারের মতোই আমাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল।তবে এবার পার্থক্য ছিল ছেলের মা অতি মিষ্টি ভাষায় আমাকে বুঝিয়ে দিলেন আমি তার ছেলের যোগ্য নই।হাবলু মনে হয় কিছু বলতে চেয়েছিল,কিন্তু পরিস্থিতি দেখে আর সাহস করল না।
ঘটনা-৭

ওইদিন রাতেই সেই হাবলুর ফোন পেয়ে খুব অবাক হলাম।সে আমাকে ফোন করে বলল,পরেরদিন দেখা করতে।বোকা বোকা চেহারার ছেলেটি তার মায়ের অমতে আমাকে বিয়ে করতে চাইল।আমি ওর মায়ের অমতে বিয়ে করতে চাইলাম না।কিন্তু ওর নাছোড়বান্দা মনের কাছে হার মানতেই হল।আমার পরিবারের কারো না করার প্রশ্নই ছিলনা।ঘোর লাগা একটা সময়ের মাঝে হাবলুটার সাথে আমার বিয়ে হয়ে গেল।বিয়ের পরেও সেই ঘোর কাটতে আমার অনেক সময় লেগেছিল।এখনও ব্যাপারটা পুরোপুরি স্বপ্ন কিংবা কল্পনা মনে হয়।ভয় হয় কোনদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখবো বাবা করুন মুখে পাত্রপক্ষের সামনে যাবার জন্য বলছে।

দেখতে দেখতে হাবলুটার সাথে আমার বিয়ের ৩ বছর পূর্ণ হল।হাবলুটার পূর্ণিমা রাতে চাঁদ দেখার খুব শখ।ও যখন চাদের দিকে তাকিয়ে থাকে,আমিও নিঃশব্দে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি।ওর জ্যোৎস্না মাখানো নিস্পাপ মুখের দিকে তাকালে মনে হয়,আসলেই ও একটা হাবলু,নয়তো আমার মতো কালো মেয়ে বেছে নেবে কেন।এরকম যোগ্যতা নিয়ে সে হাজারটা সুন্দরী মেয়ে সে খুঁজে পেতো।তবুও মাঝে মাঝে মনে হয়,হয়তো জীবনের কোন ভাল কাজ করেছিলাম,হয়তো বিধাতার উপর ভরসা হারাইনি বলেই এরকম একটা হাবলু আমার ভালবাসার দেবতা হয়ে ধরা দিয়েছে।আপনারা সবাই আমাদের জন্য দোয়া করবেন।আমার মত যারা এরকম কালো হবার কষ্টে ভুগছেন তাদেরকে বলছি,কখনো বিধাতার উপর ভরসা হারাবেন না।বিধাতার উপর ভরসা করুন দেখবেন বিধাতাই আপনার দায়িত্ব নিয়ে নিবেন।

লিখেছেনঃ mahmud hasan

About Aurthohin

Check Also

ভাত, কাপড়, ভালবাসা

( ভুমিকায় বলে নেই, গল্পের বক্তা চরিত্রটির মত আমিও নারীবাদি নই।আমি মানি নিয়তি নারী পুরুষ …