Home / মনের জানালা / একটি সমাপ্তি,কিংবা নতুন গল্পের শুরু

একটি সমাপ্তি,কিংবা নতুন গল্পের শুরু

ekti somaptyকাল রাতে ঘুমাতে অনেক দেরি হয়েছে,তাই সকালে আরাম করে ঘুমাচ্ছিলাম,এমন সময় বেয়াদব ফোনটা বেজে উঠল।
:- কে?
:- তোর শ্বশুর।
:- কে ভাই আপনি? ঠিক মত বলেন না কেন????
:- ঘুম থেকে উঠে তুই কি পাগল হয়ে গেলি নাকি,আমাকে চিনতে পারতেসিস না?
:- আরে মিয়া,এত প্যাচাল কেন? ভালয় ভালয় বলেন আপনি কে,নাহলে আমি ফোন রাখলাম।
:-তুই তোর আমাকে চিনতে পারছিসনা?? অপি আমার,এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলি আমাকে?? যা,আমি রাখলাম।
:- জি রাখেন। সালাম।
বলে ফোন রাখলাম আমি। কে যে এত আজাইরা ফোন করে,জীবনটা নষ্ট। আবার ঘুমানর প্রস্তুতি নিচ্ছি,এমন সময় আম্মু হাজির।বলল, “তাড়াতাড়ি ওঠ,তুই না বলেছিলি আজকে তুই রিতু কে বই কিনে দিবি?” “ধুর,আম্মু,আমি ঘুমাচ্ছি,যাওতো,ডিস্টার্ব কোরোনা”। মোবাইল এ কথা বলার সময় ঘুম আসে না,ছোট বোনের জন্য কোন কাজ করতে দিলে তোর ঘুম আসে,তাই না? ওঠ এক্ষুনি,নাহলে আজকে থেকে মোবাইল এ কথা বলা বন্ধ”। প্রচন্ড মেজাজ খারাপ করে বিছানা থেকে নামলাম। শালার আজাইরা ফোন,পুরো সকালটাই মাটি করে দিল। কোথায় সকালে আরামে ঘুম দিব,তা না,যাও রিতুর জন্য বই কিনতে।
বই কিনে দিয়ে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। দিনটাতো মাটি হলই। সেটাকে যদি আর একটু অর্থবহ করা যায়। গিয়েই রোহানের সামনে পরে গেলাম। রোহান,আমার বর্তমান জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। ভার্সিটির প্রথম দিন থেকেই ওকে দেখলেই মনের মধ্যে ড্রাম বাজতে শুরু করে। কিন্তু এখনো সাহস করে ওকে বলা হয় নাই,হয়তবা আমার দুই বছরের সিনিয়র,সেই জন্য। রোহান আমার দিকে মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে চলে গেল। আমি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছি,এমন সময় রাত্রি এসে ডাক দিল,এই অপি……………সাথে সাথে আমার মনে পরল,আমার নামতো অপরাজিতা আহমেদ নিতু,আমাকে সবাই নিতু বলে ডাকে,আমাকে অপি ডাকে খালি দুই জন,এক রাত্রি আর এক জন…………………… হায় হায়,আমাকে আকাশ কল করেছিল????? আর আমি চিনতে পারলাম না,সর্বনাশ!!!!!!!!! আমাকে এইরকম হতভম্ব অবস্থা দেখে রাত্রি বলল,কি হল তোর??? আমি বললাম,সর্বনাশ,আমাকে এখুনি কল করতে হবে। “তুই কি পাগল হয়ে গেলি,এইমাত্র না আসলি”? “আছে দোস্ত,পরে বলছি”। বলে আমি সেখান থেকে সরে আমার কল লগ চেক করতে লাগলাম। এইত,পেয়েছি। কল করলাম।
:- হ্যালো।
:- কেমন আছিস দোস্ত?
:- কে এটা?
:- ফাজলামি করিস না,আমাকে চিনিস না?
:- চিনব না কেন? সকালে এত কষ্ট করে ফোন দিলাম,আর আমাকে অপমান করে ফোন কেটে দিল,হুহ
unsure emoticon

:- মাফ করে দে,আর কোনদিন ভুল হবে না।
:- যা,এবারের মত মাফ।
:- কবে আসলি তুই?
:- এই তো,কয়েকদিন আগে। কালকে সময় দিতে পারবি?
:- কেন রে? কোন কাজ আছে?
:- তোর খালি কাজ! এতদিন পর আসলাম,দেখা করবি না?
:- ও,তাই বল। কোথায়?
:- চায়নিজ গার্ডেন।
:- ওকে।
আজ,অনেক উল্লেখযোগ্য দিন। প্রায় ৬ বছর পর আকাশের সাথে দেখা হবে। আগে এমন অবস্থা ছিল,ওকে একদিন দেখতে না পারলে দিন চলতনা। অনেক যত্ন করে সাজলাম বান্দরটা বলত আমি বলে একদম টমবয়,মেয়েলি কোন কিছুই আমার মধ্যে নেই। দেখি,আজকে কি বলে। রেস্টুরেন্টে বসে আছি,প্রায় ৩০ মিনিট হল। বান্দরটার এখনও কোন খবর নাই। মেজাজ খারাপ করে বসে আছি,এমন সময় পিছন থেকে ডাক শুনলাম, “এই অপি”। তাকিয়ে দেখি বান্দরটা। রাগ করব কি? ওকে এতদিন পরে দেখে এত ভাল লাগলো যে রাগ করতেও ভুলে গেলাম।
:- কেমন আছিস?
:- ভাল। কি খবর কি বাঁদর? আগে বল,আমার নাম্বার পেলি কোথায়?
:- ইচ্ছা থাকলে সবই হয়। তুই তো আমাকে ভুলেই গেসিস,কোন খোজ খবর নাই।
:- আসলে দোস্ত,এত বিজি থাকি,যে টাইমই পাই না।
:- থাক অজুহাত দেওয়া লাগবে না।
:- উঠেছিস কোথায়?
:- মেসে।
:- কি বলিস? আমরা থাকতে মেসে উঠবি? চল বাসায় চল।
আকাশ যেতে চাচ্ছিল না,জোর করে নিয়ে গেলাম। আম্মু ওকে দেখে এত খুশি হল,যে আমারই হিংসা হতে লাগল। আর রিতুতো রীতিমত নাচতে শুরু করল। অনেকদিন পর বাসা্তে এমন খুশির দিন দেখলাম। কথায় কথায় জানলাম আকাশ চাকরী খুজতে এসেছে। বাবারে,বান্দরটা কত বড় হয়ে গেসে!!!!
সেদিনের পর থেকে আকাশের সাথে প্রায়ই দেখা হতো। ২ মাসের মধ্যে একটা চাকরিও পেয়ে গেল জনাব। ভালই যাচ্ছিল দিনগুলো, আমার খুশি আরও বারিয়ে দিতেই যেন,রোহান আমাকে প্রপোস করল। আনন্দে মাটিতে পা পড়ছিল না। কিন্তু আকাশকে বলতেই কেমন যেন মনমরা হয়ে গেল। কিছুই বুঝলাম না। আসলে এত আনন্দে ছিলাম যে পাত্তাই দিলাম না।
সেদিন থেকে আকাশের সাথে আমার দেখা হওয়া কমতে লাগলো। আমি রোহানের সাথে এত ব্যস্ত ছিলাম যে ওকে সময়ই দিতে পারছিলাম না। তাতে যে খুব কষ্টে ছিলাম,তাও না। রোহানকে পেয়ে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়ে গিয়েছিলাম,ওর কথা মনেই ছিল না। দিন ভালই কাটছিল। একদিন রাত্রি আমাকে এসে বলল, “আকাশের খবর জানিস”? আমি বললাম যে, “জানি না”। “ও যে অনেক অসুস্থ,হসপিটালে,তা জানিস”? এইবার আমি সত্যিই অবাক হলাম। কই,আমাকে ও বলল নাযে, তাড়াতাড়ি ঠিকানা নিয়ে হসপিটালে গেলাম। গিয়ে দেখলাম উনি আরাম করে বসে আছেন। আমার দেখে মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। আমি ছুটে গেলাম,আর উনি কিনা পুরাই সুস্থ। রাগের চোটে আমি ওর সাথে দেখা না করেই চলে আসলাম। সেদিন এর পর থেকে আকাশের সাথে কথা বন্ধ। আজব ব্যাপার,ও আর যোগাযোগ এর চেস্টাও করল না। আমিও রাগ করে যোগাযোগ করলাম না। তখন বুঝতে পারিনি,কত বড় ভুল করছি।
স্বপ্নের দুনিয়ায় চলতে চলতে আমি বাস্তবতা ভুলে গিয়েছিলাম। রোহানের প্রেমে এতই অন্ধ ছিলাম,ওর ভালবাসার পিছনের অভিনয় বুঝতে পারিনি। ওর মিস্টি মিস্টি কথায় আমিও অন্যদের মত ভুল করে বসলাম। আমাকে ভুলিয়ে একদিন এক নির্জন জায়গায় নিয়ে গেল। প্রথমে আমি কিছুই বুঝতে পারিনি,কিন্তু যখন বুঝতে পারলাম,সেখান থেকে পালাতে চেস্টা করলাম। তারপর আর কিছু মনে নেই, জ্ঞান হল,নিজেকে হাসপাতালের বিছানায় পেলাম। পাশে আম্মু আব্বু। কিছুই মনে করতে পারছিলাম না,আমি এখানে কেন? সবাইকে জিজ্ঞাসা করেও কোন লাভ হল না। বিকালে আকাশ দেখতে আসলো। এতক্ষন নিজেকে শক্ত করে রেখেছিলাম,আর পারলাম না,কান্নায় ভেঙে পরলাম। ওর কাছ থেকেই জানতে পারলাম,আমি ছাদ থেকে নিচে পড়ে গিয়েছিলাম। আশেপাশের লোকেরা আমার চিৎকার শুনে আমাকে খুজে পায়,৩ দিন জ্ঞান ছিলনা।
অনেকদিন লাগলো সুস্থ হতে। তাও পুরোপুরি সুস্থ হতে পারলাম না। পরে গিয়ে মাথায় আঘাত পাবার জন্য পড়াশুনা ছেড়ে দিতে হল। যারা এতদিন আমার জন্য পাগল ছিল,তাদের কাছে আমি রীতিমত অসহ্য হয়ে উঠলাম। আম্মু আব্বু আমার বিয়ের জন্য চেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু আমার মত একটা অসুস্থ মেয়েকে কে বিয়ে করবে? অনেক চেষ্টার পরও আমার বিয়ে হচ্ছিল না,সবাই প্রায় আশা ছেড়েই দিয়েছিল,এমন সময় আকাশের বাসা থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসলো। আম্মু আব্বু খুবই খুশি হল। আমারও খুশি হওয়ার কথা,কিন্তু হতে পারলাম না,আমার মনে হল আকাশ আমাকে করুনা করছে।
এক শুভ দিনে আমার বিয়েও হয়ে গেল। কিন্তু আকাশকে আমি আর সহজভাবে মেনে নিতে পারছিলাম না,খালি মনে হতো ও আমাকে দয়া করছে। বিয়ের পর আকাশও কেমন বদলে যেতে লাগলো, আমার কাছ থেকে দূরে দূরে থাকে,ঠিকমত কথাও বলে না। এক অসহ্য অভিমান মনের কোনে জমে উঠল। যদি এই ব্যবহারই করবে,তাহলে বিয়ে করার দরকার কি ছিল? তাও চেষ্টা করতে লাগলাম, যদি সব ঠিক করা যায়,কিন্তু কিছুই ঠিক হল না। নিজের ভাগ্যকে মেনে নিয়ে ঠিক করলাম আকাশের ঘারে আর বোঝা হয়ে থাকব না। কাউকে না জানিয়েই ডিভোর্সের আবেদন করলাম।
হয়ত ডিভোর্স হয়েও যেত,এমন সময় একটা ঘটনা আমার জীবনের মর পালটে দিল। একদিন কাপর গুছাতে গুছাতে একটা ডাইরি পেলাম,আকাশের লেখা। পড়বনা পড়বনা করেও পড়তে সুরু করলাম। ডাইরির কিছু লেখাঃ-
“অনেকদিন পর তোকে দেখলাম। কি যে ভাল লাগছে বুঝাতে পারব না। তুই অনেক সুন্দর হয়ে গেছিস,তোকে বলতে চাচ্ছিলাম,কিন্তু লজ্জায় বলতে পারিনি.”
“আমি তোকে অনেক ভালবাসিরে,তোকে বলতে খুব ইচ্ছা করছে,কিন্তু তুই তো আমার নারে অপি,তুই অন্য কাউকে ভালবাসিস। আমার কোন দুঃখ নেই,তুই ভাল থাকলেই আমি খুশি”
“কি করব বুঝতে পারছি না,রোহান ছেলেটা মোটেই ভাল না। তোকে কিভাবে বলব বুঝতে পারছি না,ভাবছি,রাত্রিকে দিয়ে বলাব.”
“তুই অনেক বড় ভুল করছিস রে,কিভাবে বাচাব তোকে????.”
“আজকে তোকে রোহানের সাথে বের হতে দেখেই সন্দেহ হয়েছিল,তখন যদি কিছু করতাম,আজ এই তোর অবস্থা হতো না। আমাকে মাফ করে দিস,আমিই তোর এই অবস্থার জন্য দায়ি”
“আজকে তোর সাথে আমার বিয়ে,জানি বিয়েটা তুই অনিচ্ছায় করছিস,আর ভাবছিস আমি তোকে করুনা করছি। আমি তোকে ভালবাসি,তাই তোকে বিয়ে করছি,এটা তুই এখন বুঝবি না,তাই ঠিক করেছি,তোর উপর কোন জোর দিব না।তুই যখন চাস,আমাকে আপন করে নিস,আমি সারাজীবন তোর পথ চেয়ে থাকব”
“আমি জানিনা তুই কেন ডিভোর্স নিতে চাচ্ছিস,আমি কি এতই খারাপ,যে তুই আমার সাথে থাকতে পারবি না? হয়ত আমি তোর যোগ্য না। প্লিজ আমাকে ছেড়ে যাস না,আমি তোকে ছাড়া বাঁচব না রে”
আর পড়তে পারলাম না। আমার এই বান্দরটা আমাকে এত ভালবাসে? আর আমি কোথায় কোথায় ভালবাসা খুজে বেরাচ্ছিলাম??? হয়ত এই জন্যই বলে,যে জিনিস কাছে থাকে মানুষ তার কদর করে না।

৪ বছর পর…

আমার আর আকাশের একটা ফুটফুটে মেয়ে আছে। আকাশ ওকে এতই ভালবাসে,মাঝে মাঝে মনে হয় আমার ভালবাসা বুঝি কমে গেল। পরক্ষনেই মনে পরে,এই ভালবাসা কোনদিনও কমার না,এমন কি মরনের পরেও নয়, এই কাহিনী আজিবন চলতে থাকবে.

লিখেছেনঃ Holud Pori

About Aurthohin

Check Also

ভাত, কাপড়, ভালবাসা

( ভুমিকায় বলে নেই, গল্পের বক্তা চরিত্রটির মত আমিও নারীবাদি নই।আমি মানি নিয়তি নারী পুরুষ …