Home / মনের জানালা / অপূর্ণতায় পূর্ণতা

অপূর্ণতায় পূর্ণতা

opurnotay purnotaতখন আমি অনেক ছোট যখন আব্বুর ঘাড়ে উঠে পৃথিবী দেখতাম। আব্বুর ঘাড়ে উঠে যতদূর চোখ যেত ততটুকুই ছিল আমার দৃষ্টির সীমানা। এখন আমি নিজ পায়ে দাঁড়াতে শিখেছি। দৃষ্টির সীমানা অনেক বিস্তৃত। পা যেতে চায় না কিন্তু মন নিয়ে যায় এমন অনেক জায়গায়ও আমাকে যেতে হয়। আব্বু আম্মুর অনেক আদরের মেয়ে ছিলাম আমি। কিছু চাওয়ার আগেই পেয়ে যাওয়াটা অভ্যাস ছিল আমার। অন্তরকে পাওয়াটা মনে হয় তেমনিভাবে আমার জন্য মাদকদ্রব্যে পরিনত হয়েছিল।

অন্তরের সাথে পরিচয়ের চার বছর পর একদিন হঠাৎ তার ফোন পেয়ে তার সাথে রাস্তায় দেখা করতে যাই। তখন আমি কলেজ এ পড়ি আর ও অনার্স ফাইনাল ইয়ারে। অনেকটা মলিন দেখাচ্ছিল ওর চেহারাটা। আমাকে দেখে যেন তৃপ্তির একটা নিঃশ্বাস নিল।
অন্তর : কেমন আছিস মায়া?
আমি : এইত ভাইয়া ভালই। আপনার এই অবস্থা কেন? এতো বিমর্ষ দেখাচ্ছেন কেন?!
অন্তর : মায়া, আমি খুব সহজভাবে তোর জটিল মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে গিয়েছি। পঁচিশ বছরের এ জীবনে কোন নারীর প্রতি এতটা টান অনুভব করিনি যতটা তোর উপর করছি। অন্তরের অন্তরে তার মায়ের পর সবচেয়ে দামি স্থানটি এখন তোর দখলে। জানি, সমাজ কখনই আমাদের এক হতে দিবে না। কিন্তু মায়া, তোর ধর্মের প্রতি আমার অনেক শ্রদ্ধা। আমি কখনো তোর ধর্ম পালনে বাঁধা দিব না।
কথা গুলো এক নাগাড়ে বলে সে যেন স্বস্তি পেল। আমি নির্বাক হয়ে অপলক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়েছিলাম। তার মায়াবী চোখ গুলো দেখে দুর্বল হবার আগেই মাথায় কথাটা ধাক্কা দিচ্ছিল যে সে হিন্দু আর আমি মুসলমান। চোখে এক টুকরো পানি নিয়ে তার দিকে না তাকিয়েই উদ্ভ্রান্তের মত বাসায় চলে এসেছিলাম।

কোন কিছুতেই মন বসাতে পারছিলাম না আমি। খালি তার কথাগুলো মনে পড়ত, তার বলা স্বপ্নগুলো চোখে ভাসতো। এভাবে প্রায় এক বছর কেটে যায়। এই এক বছরে তার সাথে ফোনে কথা হয়েছে চারবার। প্রতিবারই আমি চুপ করে কেবল তার বলা কথাগুলি শুনতাম। সে তার জীবনের গল্প বলত, তার এক গুচ্ছ স্বপ্নের কথা আমাকে বলত।

এক বছর পর তাকে ফোন দিয়ে দেখা করতে বললাম। সে যখন দেখা করতে এসেছিল তখন পড়ন্ত বিকেল। তার সামনে গিয়ে তার দুটো হাত ধরে শিশুর মত কেঁদে দেই। আমি তাকে অস্থিরের মত আবদার করে বলি সে যেন আমাকে এই সমাজ থেকে দূরে নিয়ে যায়। আমার এতদিনের ভালবাসার কথা বলি। তার সাথে সারাজীবন কাটানোর ইচ্ছের কথা বলি। সে অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে একটা মলিন হাসি দেয়। আমার গাল বেয়ে পড়া অশ্রুগুলো তার হাত দিয়ে মুছে নেয়। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “তুই তোর সেই পরিবারকে ধোঁকা দিতে চলছিস যাদের তোকে নিয়ে এত স্বপ্ন? ভালবাসার মানুষকে পেতেই হবে এমনতো কোন কথা নেই। আমি তোর দেয়া এই চল্লিশ মিনিট সময়কেই অন্তরে আলিঙ্গন করে সারাজীবন অতিবাহিত করতে পারব”। সব হারানো পাখির মত তার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি। সেদিন আমরা দশমিনিট হাতে হাত রেখে হেঁটেছিলাম। তাকে আমার হাত ছুঁয়ায়ে কথা নিয়েছিলাম সে যেন একটা লক্ষ্মী মেয়ে দেখে বিয়ে করে এবং সুখে থাকে। এটাই ছিল শেষ এক সাথে থাকা, শেষ হাত ধরা।

“চড়ুই” বলে ডাকতো আমাকে। আমি নাকি চড়ুইয়ের মত সারাদিন কিচিরমিচির আর তুরতুর করি। সে চলে যাওয়ার সাথে সাথে চড়ুইয়ের বৈশিষ্ট্য টুকুও সাথে নিয়ে যায়। চড়ুই তো দূরে থাক, মূর্তির মত হয় আমার জীবন ব্যবস্থা।

এক বছর পর আমার বিয়ে ঠিক হয়ে যায়। সমাজের দৃষ্টিতে আমার বিয়ের বয়স হয়ে গিয়েছিল। বাবা মার পছন্দের ছেলের সাথে বিয়ে হয় আমার। বাবা মায়ের হাসিমুখ দেখে বিয়েতে রাজি হয়ে যাই।

অন্তরের স্বপ্ন ছিল তিনটা মেয়ে হবে। তিনটা সন্তান হয় আমার এবং আল্লাহ আমাকে তিন কন্যা সন্তানের জননী করেন। তার স্বপ্ন গুলোকে সুতো দিয়ে মনে গেঁথে নিয়েছিলাম। স্বপ্নগুলোকে সত্যিও করেছিলাম। কিন্তু পাশে সে ছিল না। সে আমাকে ভালবাসতে শিখিয়েছিল। ভালবাসা মানে মানুষকে আনন্দ দেয়া। ভালবাসার মানুষকে পাওয়ার জন্য আরও দশটা মানুষকে কষ্ট দেয়া ভালবাসার ধর্ম না। সে আমাকে তার সবটুকু উজাড় করে ভালবেসেছিল।

কেন যেন মনে হয় আমাকে ছুঁয়ে দেয়া কথাটুকু সে রাখতে পারেনি।।

লিখেছেনঃ Fabiha Nisa

About uddin rokon

Check Also

ভাত, কাপড়, ভালবাসা

( ভুমিকায় বলে নেই, গল্পের বক্তা চরিত্রটির মত আমিও নারীবাদি নই।আমি মানি নিয়তি নারী পুরুষ …